এখনও নতুন বিনিয়োগে নামছেন না ব্যবসায়ীরা, ভেতরে কী ভয়

গোলাম মওলা
২২ মে ২০২৬, ০৮:৩২আপডেট : ২২ মে ২০২৬, ১৫:৩৩

দেশের অর্থনীতিতে এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের একটি নাম— বিনিয়োগে স্থবিরতা। নতুন শিল্প স্থাপন, ব্যবসা সম্প্রসারণ কিংবা বড় প্রকল্পে অর্থ লগ্নির ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের মধ্যে স্পষ্ট অনাগ্রহ দেখা যাচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় নতুন বিনিয়োগের চেয়ে বিদ্যমান শিল্প ও ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এক সময় যে ব্যবসায়ীরা নতুন কারখানা স্থাপন, উৎপাদন বৃদ্ধি কিংবা রফতানি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করতেন, তাদের বড় একটি অংশ এখন অপেক্ষার অবস্থানে চলে গেছেন। অনেক শিল্পগোষ্ঠী সম্প্রসারণ পরিকল্পনা স্থগিত করেছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা আরও বেশি।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বিনিয়োগে এই ভীতি শুধু ব্যবসায়ীদের মানসিক সংকট নয়; বরং এটি দেশের অর্থনীতির ভেতরের দুর্বলতার প্রতিফলন। কারণ বেসরকারি বিনিয়োগ কমে গেলে কর্মসংস্থান, উৎপাদন, রফতানি ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি— সবকিছুতেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

উচ্চ সুদহার এখন সবচেয়ে বড় আতঙ্ক

বর্তমানে ব্যবসায়ীদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার। অনেক ক্ষেত্রে শিল্পঋণের সুদ ১৪ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, এত বেশি সুদে ঋণ নিয়ে নতুন শিল্প স্থাপন করলে লাভের চেয়ে ঝুঁকিই বেশি থাকে।

শিল্প খাতে কাঁচামালের দাম বেড়েছে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যয় বেড়েছে, পরিবহন খরচও বেড়েছে। একইসঙ্গে বাজারে বিক্রি কমেছে। ফলে নতুন বিনিয়োগ থেকে কাঙ্ক্ষিত মুনাফা পাওয়া নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

একজন শিল্প উদ্যোক্তা বলেন, এখন ঋণ নিয়ে নতুন বিনিয়োগ মানে অনেকটাই ঝুঁকির মধ্যে হাঁটা। ব্যবসা করে লাভের নিশ্চয়তা নেই, কিন্তু সুদ পরিশোধ করতেই হবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, উচ্চ সুদহার বিনিয়োগের স্বাভাবিক প্রবাহকে থামিয়ে দিয়েছে। কারণ বিনিয়োগকারীরা এখন দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের বদলে ঝুঁকি এড়িয়ে চলার কৌশল নিচ্ছেন।

গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে উৎপাদন নিয়ে শঙ্কা

শিল্প উদ্যোক্তাদের অন্যতম বড় অভিযোগ হলো গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা। নতুন শিল্পে গ্যাস সংযোগ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। কোথাও সংযোগ মিললেও পর্যাপ্ত চাপ পাওয়া যাচ্ছে না।

রফতানিমুখী শিল্প মালিকরা বলছেন, গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এতে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে সময়মতো পণ্য সরবরাহ কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম কয়েক দফা বাড়ানো হলেও সরবরাহ পরিস্থিতির প্রত্যাশিত উন্নতি হয়নি। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, কিন্তু উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ছে না।

একজন তৈরি পোশাক শিল্প মালিক বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নিশ্চয়তা ছাড়া কেউ নতুন কারখানায় বিনিয়োগ করতে চাইবে না। উৎপাদন বন্ধ থাকলে শুধু ক্ষতিই বাড়বে।

ডলার সংকট ও আমদানি ব্যয়ে বাড়তি চাপ

দেশে ডলার বাজারের অস্থিরতা পুরোপুরি কাটেনি। শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, এখন এলসি খোলা আগের তুলনায় কঠিন। ব্যাংকগুলো আমদানিতে বেশি সতর্কতা অবলম্বন করছে।

বিশেষ করে যেসব শিল্প আমদানিনির্ভর কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল, তারা বেশি চাপে রয়েছে। ডলারের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।

ব্যবসায়ীদের মতে, একজন উদ্যোক্তা নতুন বিনিয়োগের আগে বাজার ও মুদ্রা পরিস্থিতির স্থিতিশীলতা দেখতে চান। কিন্তু বর্তমানে ডলার বাজারে এখনও অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।

করনীতি ও নীতিগত অস্থিরতায় আস্থাহীনতা

ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করছেন, কর ও শুল্ক কাঠামোতে ঘন ঘন পরিবর্তন বিনিয়োগ পরিবেশকে দুর্বল করছে। বাজেটের বাইরে হঠাৎ সিদ্ধান্ত, নতুন কর আরোপ কিংবা আমদানি পর্যায়ে শুল্ক পরিবর্তনের কারণে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

তাদের মতে, শিল্পনীতি, রাজস্বনীতি এবং বাণিজ্যনীতির মধ্যে সমন্বয়ের অভাবও বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

একজন ব্যবসায়ী নেতা বলেন, একটি শিল্পে বিনিয়োগ মানে ১০ থেকে ১৫ বছরের পরিকল্পনা। কিন্তু নীতিগত স্থিতিশীলতা না থাকলে কেউ বড় বিনিয়োগে যাবে কেন?

বাজারে চাহিদা কমে যাওয়াও বড় কারণ

উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। ফলে অভ্যন্তরীণ বাজারে পণ্যের চাহিদা আগের তুলনায় কমেছে।

খুচরা বাজার, নির্মাণ খাত, ভোগ্যপণ্য শিল্প এবং মাঝারি শিল্পে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। কোথাও কোথাও কর্মী ছাঁটাইও শুরু হয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজারে চাহিদা না বাড়লে নতুন বিনিয়োগের পরিবেশও তৈরি হবে না। কারণ উদ্যোক্তারা তখনই নতুন শিল্পে বিনিয়োগ করেন, যখন ভবিষ্যৎ বাজার নিয়ে তাদের মধ্যে আস্থা তৈরি হয়।

ব্যাংক খাতের দুর্বলতাও বাড়াচ্ছে ভয়

খেলাপি ঋণের উচ্চ হার এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। অনেক ব্যাংক এখন নতুন ঋণ অনুমোদনে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ব্যাংকগুলো এখন তুলনামূলক নিরাপদ খাতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। ফলে উৎপাদন ও শিল্প খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাচ্ছে। এতে নতুন বিনিয়োগের গতি আরও কমে এসেছে।

বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও সতর্ক

দেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগও প্রত্যাশা অনুযায়ী বাড়ছে না। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সাধারণত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নীতিগত ধারাবাহিকতা, অবকাঠামোগত সুবিধা এবং মুনাফা স্থানান্তরের নিশ্চয়তাকে গুরুত্ব দেন।

কিন্তু বর্তমানে ডলার সংকট, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও সতর্কতা দেখা যাচ্ছে।

কেন এটি বড় উদ্বেগ

অর্থনীতিবিদদের মতে, বিনিয়োগ কমে যাওয়া মানে ভবিষ্যতে নতুন কর্মসংস্থান কমে যাওয়া। নতুন শিল্প না এলে তরুণদের চাকরির সুযোগও সীমিত হয়ে পড়বে। একই সঙ্গে উৎপাদন ও রফতানির গতি কমে গেলে সামগ্রিক অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি হতে পারে।

তাদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো ব্যবসায়ীদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনা। এজন্য প্রয়োজন– সুদহার সহনীয় পর্যায়ে নামানো; গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা; ডলার বাজার স্থিতিশীল রাখা; করনীতিতে পূর্বানুমানযোগ্যতা তৈরি করা; ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা ও বিনিয়োগবান্ধব দীর্ঘমেয়াদি নীতি নিশ্চিত করা।

বিশ্লেষকদের মতে, কেবল প্রণোদনা ঘোষণা করলেই বিনিয়োগ বাড়বে না। ব্যবসায়ীদের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে আস্থা তৈরি করতে না পারলে অর্থনীতিতে স্থবিরতা আরও গভীর হতে পারে।

বর্তমান বাস্তবতায় দেশের অধিকাংশ উদ্যোক্তা এখন অপেক্ষা করছেন, অর্থনীতির অনিশ্চয়তা কত দ্রুত কাটে এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা কতটা ফিরে আসে। সেই উত্তরই নির্ধারণ করবে দেশে নতুন বিনিয়োগের আগামী গতি।

/আরকে/
সম্পর্কিত
বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে কেন এত উদ্বেগ আইএমএফের 
আমদানি-রফতানি কমেছে: কোন পথে যাচ্ছে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য?
টানা তিন প্রান্তিকে কমেছে জিডিপি প্রবৃদ্ধি, জানুয়ারি-মার্চে নেমেছে ২.২২ শতাংশে
সর্বশেষ খবর
বিএনপি শুধু গণভোটকে অস্বীকার নয়, তাদের ৩১ দফা অঙ্গীকারও মানছে না: আখতার হোসেন
বিএনপি শুধু গণভোটকে অস্বীকার নয়, তাদের ৩১ দফা অঙ্গীকারও মানছে না: আখতার হোসেন
যমজ দুই বোনের সাফল্য দেখে গর্বিত বাবা-মা, খুশি শিক্ষকরা
যমজ দুই বোনের সাফল্য দেখে গর্বিত বাবা-মা, খুশি শিক্ষকরা
খাল খনন শেষে ৬৪ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দিলেন ইউএনও
খাল খনন শেষে ৬৪ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দিলেন ইউএনও
‘দুই দিন ধরে খাইনি, ভাত নিয়ে আসো’ বলার পর অসুস্থ যুবককে পিটিয়ে হত্যা
‘দুই দিন ধরে খাইনি, ভাত নিয়ে আসো’ বলার পর অসুস্থ যুবককে পিটিয়ে হত্যা
সর্বাধিক পঠিত
এমপির ‘দ্বিতীয় বিয়ে’ নানান প্রশ্ন, দ্বিতীয় স্ত্রী ও শ্বশুরের বক্তব্যে অমিল
এমপির ‘দ্বিতীয় বিয়ে’ নানান প্রশ্ন, দ্বিতীয় স্ত্রী ও শ্বশুরের বক্তব্যে অমিল
জামায়াত এমপির ভিডিও ভাইরাল, জানা গেলো আসল ঘটনা 
জামায়াত এমপির ভিডিও ভাইরাল, জানা গেলো আসল ঘটনা 
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বড় পরিবর্তনের পথে ইসি
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বড় পরিবর্তনের পথে ইসি
দলীয় এমপির ভিডিও ভাইরাল ইস্যুতে যা বললো জামায়াত
দলীয় এমপির ভিডিও ভাইরাল ইস্যুতে যা বললো জামায়াত
শিক্ষার্থীদের রেলপথ অবরোধের মুখে টিটিই বরখাস্ত, ৮ ঘণ্টা পর ট্রেন চলাচল শুরু
শিক্ষার্থীদের রেলপথ অবরোধের মুখে টিটিই বরখাস্ত, ৮ ঘণ্টা পর ট্রেন চলাচল শুরু