সুযোগ পেলেই বাড়ানো হয় চালের দাম, নেপথ্যে কারা?

Send
শফিকুল ইসলাম
প্রকাশিত : ১৯:৩০, জুন ২৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৮:৪৯, জুন ২৭, ২০২০

 

চালের ব্যবসাবাজারে আবারও চালের দাম বাড়তে শুরু করেছে। করোনাভাইরাস আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার শুরুতেই চাল বিক্রি বেড়ে যায়, এতে দাম বাড়ে। এ মাসের ১১ তারিখে জাতীয় সংসদে উত্থাপিত ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য চাল, আটা, আলু, পেঁয়াজ, রসুনের স্থানীয় পর্যায়ে সরবরাহের ক্ষেত্রে উৎসে আয়কর কমানো হয়েছে। এর ফলে এসব পণ্যের দাম কমার কথা থাকলেও বেড়েছে সব ধরনের চালের দাম; যা অব্যাহত রয়েছে। পর্যালোচনায় দেখা গেছে, দেশের যেকোনও দুর্যোগের সময় সুযোগ নিয়ে বাড়ানো হয় চালের দাম। কিন্তু কেউ এর দায় স্বীকার করে না।

চালের মূল্য বৃদ্ধি প্রসঙ্গে এবার ব্যবসায়ীরা বলছেন, ধানের দাম বেড়েছে, তাই চালের দামও বাড়ছে। আবার অনেকে বলছেন, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় রেড জোন ঘোষণা করে সেখানে লকডাউন দেওয়া হচ্ছে— এই ঘোষণায়ও বেড়েছে চালের দাম। এক্ষেত্রে আড়তদাররা পাইকারি ব্যবসায়ীদের এবং পাইকারি ব্যবসায়ীরা খুচরা ব্যবসায়ীদের ওপর দায় চাপাচ্ছেন।

রাজধানীর বাজারগুলোয় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে প্রতিকেজি মোটা চালের দাম ৪০ থেকে ৪২ টাকা, আর চিকন চাল নাজিরশাইল ও মিনিকেটের কেজি ৬০ টাকা। কিছু দিন আগেও মোটা চালের দাম ছিল ৩৮ টাকা। ৪০ থেকে ৪২ টাকা কেজি বিক্রি হওয়া মাঝারি মানের চালের দাম বেড়ে হয়েছে ৪৫ থেকে ৫০ টাকা। চিকন চালের দাম বেড়ে প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৫৬ থেকে ৬২ টাকা, যা আগে ছিল ৫৪ থেকে ৫৮ টাকা।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)-এর তথ্য মতে, গত কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে মোটা চালের মধ্যে প্রতি কেজি স্বর্ণজাতের চালের দাম বেড়েছে দুই দশমিক ৪৭ শতাংশ। মাঝারি আকারের চালের মধ্যে প্রতি কেজি পাইজাম চালের দাম বেড়েছে চার দশমিক ১৭ শতাংশ। সরু চালের মধ্যে নাজিরশাইল ও মিনিকেট চালের দাম বেড়েছে কেজিতে পাঁচ দশমিক ১৭ শতাংশ।

এছাড়া রাজধানীর বাইরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাজারগুলোয় এখন প্রতি মণ ধানের দাম ৮০০ টাকা থেকে ৯০০ টাকার মধ্যে রয়েছে; যা গত বছর ৬৫০ টাকা থেকে ৭৫০ টাকার মধ্যে ছিল। আমন ও বোরোর বাম্পার ফলনের পরও ধানের দাম বাড়লো কেন— এমন প্রশ্নের জবাবে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, বাজারে নতুন করে চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকেও কেনা হচ্ছে চাল ও ধান। তাই স্বাভাবিক নিয়মেই বেড়েছে ধানের দাম।

এদিকে খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সরকার বোরো সংগ্রহের ক্ষেত্রে চলতি মৌসুমে একজন কৃষকের কাছ থেকে সর্বোচ্চ তিন টন থেকে বাড়িয়ে ছয় টন করে ধান কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গত ১৪ জুন ‘অভ্যন্তরীণ খাদ্যশস্য সংগ্রহ নীতিমালা ২০১৭’ সংশোধন করে এ পরিমাণ নির্ধারণ করা হয় এবং এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে খাদ্য অধিদফতরের মহাপরিচালকের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘অভ্যন্তরীণ খাদ্যশস্য সংগ্রহ নীতিমালা ২০১৭’-এর ৯(খ) অনুচ্ছেদে একজন কৃষকের কাছ থেকে খাদ্যশস্য ক্রয়ের বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে— ‘অধিক সংখ্যক কৃষককে সুযোগ প্রদানের লক্ষ্যে উপজেলা কমিটি একজন কৃষকের নিকট থেকে সর্বনিম্ন তিন বস্তা পরিমাণ অর্থাৎ ১২০ কেজি ধান ও ১৫০ কেজি গম এবং সর্বোচ্চ তিন মেট্রিক টন পর্যন্ত ধান/গম সংগ্রহ করতে পারবে। নির্ধারিত পরিমাণ ধান/গম একজন কৃষক কিস্তিতে বিক্রি করতে পারবেন। তবে কোনও কিস্তি তিন বস্তার কম হবে না।’

বর্তমান বোরো সংগ্রহ মৌসুমের ক্ষেত্রে উল্লিখিত অনুচ্ছেদে বর্ণিত আছে, 'ধান ক্রয়ের ঊর্ধ্বসীমা তিন মেট্রিক টনের পরিবর্তে ছয় মেট্রিক টন নির্ধারণ করা হলো।' এক্ষেত্রে মাঝারি ও উচ্চ ধরনের কৃষকের প্রকৃত তালিকার মধ্য থেকে লটারির মাধ্যমে নির্বাচিত কৃষকের কাছ থেকে সর্বোচ্চ ছয় মেট্রিক টন গম সংগ্রহ করা যাবে। তবে কোনোক্রমেই ব্যবসায়ী /ফড়িয়া বা মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করা যাবে না বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

চলতি বোরো মৌসুমে সরকারিভাবে আট লাখ টন ধান এবং ১০ লাখ টন সিদ্ধ চাল এবং দেড় লাখ টন আতপ চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত ২৭ মে থেকে বোরো চাল কেনা শুরু হয়েছে। ধান-চাল সংগ্রহ শেষ হবে ৩১ আগস্ট।

সরকারের খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এ বছর ২৬ টাকা কেজি দরে ধান, ৩৬ টাকা কেজি দরে সিদ্ধ চাল এবং ৩৫ টাকা কেজি দরে আতপ চাল কেনা হচ্ছে।

এদিকে কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ৪৭ লাখ ৪৯ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ করা হয়েছে। এরমধ্যে ৯ লাখ হেক্টরে হাইব্রিড, ৩৮ লাখ ২০ হাজার হেক্টরে উফশী এবং ২৯ হাজার হেক্টর জমিতে স্থানীয় জাতের বোরো ধান আবাদ করা হয়। যদিও চলতি বোরো মৌসুমে দেশে মোট ৪৮ লাখ ৬০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল।

পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, আগের তিন বছরে ধারাবাহিকভাবে বোরোর বাম্পার ফলন হয়েছে। আর এবারের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা গত বছরের কাছাকাছিই রয়েছে। গত বছর উৎপাদন ছিল হেক্টরপ্রতি ৪ দশমিক ১৫ টন করে মোট দুই কোটি তিন লাখ ৮৮ হাজার টন।

এ প্রসঙ্গে জানতে বাংলাদেশ অটো মেজর হাসকিং মিলস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক লায়েক আলী বলেন, ‘মোকামে কোনও ধরনের চালের দামই বাড়েনি। চিকন চাল আমরা ৫০ টাকার নিচে বিক্রি করছি। মোটা চালের দামও বাড়েনি। খুচরা বাজারে যত গণ্ডগোল হচ্ছে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজধানীর বাবুবাজার-বাদামতলী চাল আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন বলেন, 'পাইকারি পর্যায়ে চালের দাম বাড়েনি। আমরা আগের দামেই চাল বিক্রি করছি। বাজারে চালের সরবরাহ প্রচুর। কোথাও কোনও সংকট নেই।'

এ প্রসঙ্গে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেন, কোনও কারণই নেই বাজারে চালের দাম বাড়ার। এবার বোরোর বাম্পার ফলন হয়েছে। আমরাও কৃষকদের কাছ থেকে ভালো দামে সরাসরি ধান ও চাল কিনছি। কেউ যদি চালের বাজারে কোনও রকমের কারসাজি করে, তাহলে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবো।'

/আইএ/এমওএফ/

লাইভ

টপ