করোনাকালের অনিশ্চয়তায় শুরু ‘সাইড বিজনেস’

Send
উদিসা ইসলাম
প্রকাশিত : ২৩:৪০, জুলাই ২১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০০:৪৮, জুলাই ২২, ২০২০

করোনাভাইরাস মহামারিতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘসময় কাজ না থাকা এবং আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ ব্যবসা সংক্রান্ত যোগাযোগ বন্ধের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে কর্মীদের বেতনের ওপর। বেসরকারি সংস্থাগুলোতে খরচ কমাতে একদিকে চলছে ছাঁটাই, আরেকদিকে আছে বেতন কমানোর প্রবণতা। এসব অনিশ্চয়তার সামনে পড়ে গবেষক থেকে শুরু করে সাংবাদিক ও উন্নয়নকর্মীরা চাকরির পাশাপাশি খুলছেন অনলাইন ব্যবসা। নতুন উদ্যোক্তারা বলছেন, যেকোনও সময় চাকরি চলে গেলে টিকে থাকতে এই ব্যবসা কাজে লাগতে পারে। তাদের বিশ্বাস, আগেভাগে শুরু করলে বিপদে মানসিক চাপটা কম থাকবে।
চাকরির পাশাপাশি স্বাস্থ্যসম্মত খাবার ও পোশাকের ব্যবসায় বেশি সম্পৃক্ত হচ্ছেন অনেকে। বলাবাহুল্য, কোভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবে ঘরে বসে অনলাইন মার্কেটপ্লেসে খাবার ও পোশাকের অর্ডার সংখ্যাই বেশি। বিশেষ করে বাসায় বানানো খাবার বিক্রির উদ্যোগ নিতেই বেশি দেখা যাচ্ছে। 

সাংবাদিক দম্পতি লাইজুল ইসলাম ও ফারাহ সম্প্রতি খাবারের ব্যবসা শুরু করেছেন। বাজার থেকে রান্না পর্যন্ত সবই নিজেরা করে ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন তারা। অনলাইনে এত খাবারের দোকানের ভিড়ে কম দামে তাজা খাবার সরবরাহের দিক দিয়ে নিজেদের আলাদা দাবি করেছেন দু’জনে।
এমন উদ্যোগ প্রসঙ্গে লাইজুল বলেন, ‘ব্যয়ের চেয়ে আয় কমে গেছে। চাকরি নিয়ে এখন কোনও নিশ্চয়তা দেখছি না। সব মিলিয়ে দুশ্চিন্তার বৃত্তে যেন আটকে না পড়ি সেটাই চেয়েছি আমরা। যেহেতু আমার বাসায় মা ভালো রান্না করেন, তাই ভাবলাম খাবারের ব্যবসা করবো। বেতন ও চাকরির অনিশ্চয়তাই মূলত ব্যবসায় নামতে উদ্বুদ্ধ করেছে আমাদের।’
লাইজুল-ফারাহ দম্পতি মনে করেন, ‘এখন খরচ কমাতে অনেকেই পরিবারকে গ্রামের বাড়ি পাঠিয়ে নিজে ব্যাচেলর জীবনযাপন শুরু করেছেন। তাদের স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের অসুবিধায় পড়াটাই স্বাভাবিক। তাছাড়া করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে বেশিরভাগের বাসায় কাজের সহকারী নেই। এসব ভেবে আমরা সেবা দেওয়ার কথা ভেবেছি। করোনা রোগী যারা আছেন, তাদের সুস্থতার জন্য যেসব পথ্য দরকার, সেটাও আমরা দিতে চাই।’

গত ২ জুন থেকে ‘সেফ ফুড’ ব্যানারে তাজা খাবার দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে ব্যবসায় এসেছেন বায়েজিদ শিকদার। তিনি পেশায় ফ্রিল্যান্স গবেষক। তার কথায়, “অনেকদিন ধরে এ নিয়ে আগ্রহ ছিল আমার। নিরাপদ খাবারের প্রতিই সবার মনোযোগ। সেটা শতভাগ নিশ্চিত করতে পারলে বাজারে অন্যদের অতিক্রম করে যাওয়া সম্ভব। যাদের মান বজায় থাকবে, তারা টিকে যাবে। ব্যক্তিগতভাবে আমি কেমন মানের খাবার প্রত্যাশা করি, সেটা প্রস্তুত করে আমার চেনা নেটওয়ার্ক কাজে লাগিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছি। এটি আমার মূল পেশার পাশাপাশি এখন ‘সাইড বিজনেস’ বলতে পারেন।”

মঙ্গলবার (২১ জুলাই) আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে ফোর’স কিচেন। প্রতিষ্ঠানটির দুই স্বত্বাধিকারীর একজন মুশফিক আহমেদ। তার দৃষ্টিতে, ‘বাইরে রেস্তোরাঁর খাবার খাওয়ার আগ্রহ মানুষের আছে। কিন্তু করোনার কারণে এখন তা সম্ভব নয়। তাই অনেকদিন ধরেই ভাবছিলাম এ নিয়ে কিছু করবো। এবার সেটি বাস্তবায়ন করেছি।’
তবে পুরনো উদ্যোক্তা ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নিজেদের মেধা ও সৃজনশীলতার অনুসন্ধান বা চর্চা না করে অন্যকে অনুকরণ করলে বেশিদূর এগোনো যায় না। ব্যবসার শুরুতে এটা মাথায় না রাখলে পুঁজি শঙ্কার মুখে পড়তে পারে।
ব্যবসা উদ্যোগকে ক্যারিয়ার হিসেবে গ্রহণে যুবসমাজের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হওয়াকে দেশের অর্থনীতির জন্য আশাব্যঞ্জক মনে করেন গুটিপা প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী তাসলিমা মিজি। তবে প্রতিষ্ঠিত এই উদ্যোক্তার ভাষ্য, ‘লক্ষ করা যাচ্ছে, অনেকেই ব্যবসা শুরু করতে গিয়ে ট্রেন্ডের দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন। অন্যকে অনুকরণ করলে বেশিদূর যাওয়া যায় না। প্রত্যেক উদ্যোক্তার নিজস্ব সৃজনশীলতা আছে, তাই নিজেদের মেধা ও সৃজনশীলতার চর্চা প্রয়োজন। বাজারে সেই ব্যবসাই দাঁড়াতে পারে যেটা শত শত পণ্যের ভিড়ে আলাদা পরিচয় নিয়ে ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে থাকে।’

মিজির সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন অর্থনীতিবিদ নাজনীন আহমেদ। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যেকোনও ক্ষেত্রে একটা প্রবণতা দেখা যায়– আগে যা আছে সেটাকে অনুসরণ করা। একজনের দেখাদেখি অন্যরাও সেই একই কাজ শুরু করে দেয়। তাতে সৃজনশীলতার প্রকাশ ঘটে না। উদ্যোক্তা হতে হলে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহের দিকটি মাথায় রাখতে হবে। এমন কিছু বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া দরকার, যা অন্যরা দিচ্ছে না। অভিনব ব্যাপার যার মধ্যে প্রবল, তার টিকে থাকার সম্ভাবনাও বেশি। তা না হলে এ ধরনের উদ্যোগ ব্যর্থতায় রূপ নেয়।’

/জেএইচ/এমওএফ/

লাইভ

টপ