জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা দিবস আজজ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে স্বনির্ভরতা জরুরি

Send
সঞ্চিতা সীতু
প্রকাশিত : ০০:৫০, আগস্ট ০৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০০:৫০, আগস্ট ০৯, ২০২০

জ্বালানি নিরাপত্তায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম আত্মনির্ভরশীল হওয়ার পথ দেখিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সরকারগুলো বঙ্গবন্ধুর নীতি থেকে সরে এসেছিল। বঙ্গবন্ধু বিদেশিদের কাছ থেকে গ্যাস ক্ষেত্র কিনে নিয়েছিলেন। অন্যদিকে এখন বাড়ছে আমদানি আর বিদেশ নির্ভরতা।এই প্রেক্ষাপটে আজ রবিবার (৯ আগস্ট) পালিত হতে যাচ্ছে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা দিবস।
সপরিবারে নিহত হওয়ার মাত্র ছয় দিন আগে ১৯৭৫ সালের ৯ আগস্ট বহুজাতিক কোম্পানি শেল ওয়েলের কাছ থেকে চার দশমিক ৫ মিলিয়ন পাউন্ডে তিতাস, রশিদপুর, হবিগঞ্জ, বাখরাবাদ এবং কৈলাসটিলা গ্যাস ক্ষেত্র কিনে নেন বঙ্গবন্ধু। এতে ক্ষেত্রগুলোতে রাষ্ট্রীয় মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়। দেশের জ্বালানি খাতে এই সিদ্ধান্তকে সবচেয়ে দূরদর্শী সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে প্রতিবছর ৯ আগস্ট জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা দিবস পালন করা হয়। সেই ধারাবাহিকতায় এবারও দিবসটি পালন করতে যাচ্ছে সরকার। এবছর জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘মুজিববর্ষের অঙ্গীকার, সাশ্রয়ী জ্বালানির প্রাধিকার।’
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে ২০১০ সালের ১২ আগস্ট এক পরিপত্রে ৯ আগস্টকে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকে প্রতিবছর এই দিন সরকার জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা দিবস হিসেবে পালন করে আসছে।
শেল ওয়েলের কাছ থেকে যে ৯টি গ্যাসক্ষেত্র কেনা হয়েছিল সেগুলো থেকেই বেশিরভাগ গ্যাসের যোগান আসে। বহুজাতিক কোম্পানির তেল গ্যাস অনুসন্ধানের আগ পর্যন্ত এই ক্ষেত্রগুলো থেকেই দেশের গ্যাসের পুরো চাহিদা মিটতো। কিন্তু এরপর রাষ্ট্রীয় অনুসন্ধান উত্তোলন কোথাও এমন দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বঙ্গবন্ধু জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে সার্বিক চিন্তা করেছিলেন। তিনি মূলত জ্বালানি স্বনির্ভরতা চেয়েছিলেন। ১৯৭৩ সালে আমরা যে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতাম তার তিন ভাগের এক ভাগ চলে যেতো জ্বালানি তেল কিনতেই। কারণ আমরা পুরোপুরি তেলে উপর নির্ভরশীল ছিলাম। ওই সময় আরব এমবার্গোর কারণে তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে দুই ডলার থেকে ১৪ ডলার হয়ে যায়। এই অবস্থায় বঙ্গবন্ধু পেট্রোলিয়াম অ্যাক্ট করেন। অ্যাক্ট করে দেশের স্থলভাগে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেন। বিদেশিদের ডেকে এনে অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেন। পেট্রোবাংলা গঠন করেন। আরও বেশ কিছু সংস্কার কাজ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় গ্যাসক্ষেত্রগুলোও কিনে নেন তিনি। আজও আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তার কথাই ভাবতে হবে। স্বনির্ভরতার উদ্যোগ নিতে হবে। এজন্য অফশোর এবং অনশোরে গ্যাস অনুসন্ধান কাজ জোরদার করতে হবে। যদিও এখন পরিস্থিতি ভালে নয়। তারপরও সে অনুযায়ী কাজ এগিয়ে রাখতে হবে।
তামিম বলেন, জ্বালানি খাতে ২০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা করার কোনও অর্থ নাই। কারণ প্রতিবছরই জ্বালানির পরিবর্তন ঘটছে। পরিবর্তনশীলতার এই সময়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা না করে স্বল্প ও মধ্যমেয়াদী পরিকল্পনা করা দরকার। আগামী ৫ বছর আমাদের কী পরিমাণ চাহিদা হতে পারে তা নিখুঁতভাবে নিরূপণ করতে হবে। প্রতিবছর সেই পরিকল্পনা আবার আপডেট করতে হবে প্রয়োজন অনুযায়ী। ডাটা ট্র্যাকিং, মনিটরিং সেল করা জরুরি। এ কাজগুলো গুছিয়ে করা গেলে আগামী ৪/৫ বছরের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। তিনি বলেন, তেল গ্যাস অনুসন্ধান যেমন করতে হবে তেমনি বিদ্যুতের ক্ষেত্রেও উৎপাদন ও বিতরণের পাশাপাশি সঞ্চালনায় আরও মনোযোগ দিতে হবে। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো অনুমোদনের ক্ষেত্রে আলাদা একটি কমিটিও করা যেতে পারে। সে কমিটি সবার চাহিদা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
এদিকে বর্তমান জ্বালানি সরবরাহের বিষয়ে পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, গত জানুয়ারিতে দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে গড়ে তিন হাজার ১৬৭ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো। এরমধ্যে ৫৯২ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি এবং দুই হাজার ৫৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট বাকি দুই হাজার ৫৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট দেশীয় গ্যাস। অন্যদিকে ২৮ জুলাই গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে তিন হাজার ১১৯ মিলিয়ন ঘনফুট। এখানে এলএনজি ৫৮৬ মিলিয়ন ঘনফুট আর দেশীয় গ্যাস দুই হাজার ৫৩৩ মিলিয়ন ঘনফুট। দেশে ২০১৬ এবং ২০১৭ সালে সর্বোচ্চ দুই হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে দুই হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট দেশীয় গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে। ক্রমান্বয়ে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমতে শুরু করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমতে থাকলেও সেটা বৃদ্ধির কোনও উদ্যোগ নেয়নি পেট্রোবাংলা। দেশের স্থলভাগে কয়েকটি খনন প্রক্রিয়া ব্যর্থ হওয়ার পর দেশের অভ্যন্তরে আর খনন কাজ চালায়নি বাপেক্স। আর সাগরে অনেক দিন থেকেই সব ধরনের কাজ থমকে আছে। অন্যদিকে চলতি বছর সাগরে নতুন পিএসসি আহ্বান কথা ছিল। কিন্তু চলতি বছর করোনার প্রভাবে নতুন পিএসসি আহ্বান না করার অনুরোধ জানিয়েছে আন্তর্জাতিক তেল গ্যাস কোম্পানিগুলো। এছাড়া দেশে একমাত্র কয়লাখনি বড়পুকুরিয়া ছাড়া আর কোথাও থেকে কয়লা উত্তোলন করা হচ্ছে না। উল্টো কয়লা উত্তোলন না করার ঘোষণা দিয়েছে সরকার।
এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ভূতত্ত্ববিদ বদরুল ইমাম বলেন, বঙ্গবন্ধু আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তায় স্বনির্ভরতার কথা চিন্তা করেছিলেন। নিজের সম্পদ নিজের কাছে রেখে নিজে ব্যবহার করবো। কিন্তু এরপর কোনও সরকারই আর সেই স্বনির্ভরতার দিকে যায় নি। পরনির্ভরশীলতায় আমরা এখন অভ্যস্ত। আমরা বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে কয়লা আমদানি করার পরিকল্পনা করেছি। নিজেদের গ্যাস বাদ দিয়ে এলএনজি আমদানি করছি। বাপেক্সকে দিয়ে কাজ করানোর পরিবর্তে বিদেশি কোম্পানিকে কাজ দিচ্ছি। মোট কথা আমাদের এই পরনির্ভরশীলতা কাটিয়ে উঠতে হবে। নইলে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না।

/এসএনএস/এমআর/

লাইভ

টপ