X
সোমবার, ১৫ আগস্ট ২০২২
৩১ শ্রাবণ ১৪২৯

দেশের যেসব খাতে যুদ্ধের প্রভাব পড়ছে

গোলাম মওলা
১১ মার্চ ২০২২, ১০:০০আপডেট : ১১ মার্চ ২০২২, ১৫:৪৭

রাশিয়া গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে সেনা অভিযান শুরু পর থেকে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। এর খেসারত দিচ্ছে বাংলাদেশও। দেশের রফতানিকারকরা ইতোমধ্যে সংকটে পড়েছেন। ব্যবসায়ী ও ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, একদিকে যেমন ঋণপত্র খুলতে সমস্যা হচ্ছে, অপরদিকে রাশিয়ার বাজারে পোশাকের চাহিদায় ধস নেমেছে। এছাড়া বাংলাদেশে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি দেখা দিয়েছে। আমদানি-রফতানি তথা বৈদেশিক বাণিজ্যের ওপরেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলো একজোট হয়ে রাশিয়ার ওপর নানামুখী নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পর বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ দুই ধরনের প্রভাব পড়েছে। এর মধ্যে একটি নিষেধাজ্ঞা— ‘সুইফট লেনদেন’ ব্যবস্থা থেকে রাশিয়ার ব্যাংকগুলোকে বের করে দেওয়া হয়েছে। এ জন্য বাংলাদেশের রফতানিকারকরা পণ্য রফতানি করেও সময়মতো বিল পাচ্ছেন না। রফতানিকারকরা বলছেন, রাশিয়ার তৈরি পোশাকের বাজার প্রায় ৪ হাজার কোটি ডলারের। এই বাজারে বাংলাদেশের হিস্যা বাড়াতে নানামুখী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতির কারণে সেটি কিছুটা হলেও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

রফতানি খাতে দুশ্চিন্তা

রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন বাংলাদেশের পণ্য রফতানিকারকরা, বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকরা। কারণ, এই যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে তৈরি পোশাক রফতানিতে।

জানা গেছে, রাশিয়ায় নিজেদের পণ্য বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছে বিশ্বখ্যাত পোশাকের খুচরা বিক্রেতা ব্র্যান্ড এইচঅ্যান্ডএম। শুধু তাই নয়, রাশিয়ায় পাঠানোর জন্য বাংলাদেশের কারখানাগুলোতে চলমান ক্রয়াদেশ স্থগিত করেছে ব্র্যান্ডটির এ দেশীয় কার্যালয়।

পোশাকশিল্পের মালিকরা জানিয়েছেন, রাশিয়ায় পোশাক রফতানি করে এমন কিছু কারখানা সমস্যায় পড়েছে। যদিও মোট পোশাক রফতানির মাত্র দেড় শতাংশ যায় রাশিয়ায়। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) ২ হাজার ৩৯৯ কোটি ডলারের পোশাক রফতানি হয়েছে। এর মধ্যে রাশিয়ায় গেছে ৪২ কোটি ডলারের পোশাক।

এ প্রসঙ্গে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, ‘আমাদের কাছে বিজিএমইএ’র সাত সদস্য প্রতিষ্ঠান আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে— রাশিয়ায় পোশাক রফতানি করে তাদের মোট ৪০ লাখ ডলার আটকে গেছে।’

এ প্রসঙ্গে বিকেএমইএ’র সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, ‘যুদ্ধের কারণে ইতোমধ্যে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এতে তৈরি পোশাকসহ সব ধরনের পণ্যের ওপরই কমবেশি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।’

বাংলাদেশের দ্রব্যমূল্য বাড়াচ্ছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ

রাশিয়া ও ইউক্রেনের চলমান যুদ্ধের কারণে এরই মধ্যে বাংলাদেশসহ বিশ্ববাজারে তেল-গ্যাস, গম, ভুট্টা, সরিষা, মসুর ডালের দাম বেড়েছে। কারণ এসব পণ্য ইউক্রেন-রাশিয়া থেকে আমদানি করা হয়। অভিযোগ উঠেছে, যুদ্ধের অজুহাতে দেশীয় ব্যবসায়ীরা এরই মধ্যে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দাম বাড়িয়েছে। ভোগ্যপণ্যের পাশাপাশি পোশাক ও বস্ত্র খাতের জন্য তুলাসহ বেশকিছু কাঁচামাল আমদানি করা হয় দেশ দুটি থেকে। ফলে যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের ক্ষতির শঙ্কায় রয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএ’র পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল  বলেন,  ‘ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধে এরই মধ্যে স্থানীয় বাজারে  জিনিসের দাম বৃদ্ধি পাওয়া শুরু হয়েছে। নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে পোশাক খাতেও। রাশিয়ায় বর্তমানে আমাদের সরাসরি সাড়ে ৬শ’ মিলিয়ন ডলারের পোশাক রফতানি হয়। এই বাজার বাড়ানো বড় সম্ভাবনাময়। কিন্তু যুদ্ধে সবকিছু গোলমাল হয়ে যাচ্ছে।’

দুই দেশে হুমকির মুখে বাণিজ্য

তৈরি পোশাক ছাড়াও বাংলাদেশ থেকে রাশিয়ায় প্লাস্টিক, চামড়া, জুতা, সিরামিক, খেলনা, ম্যাট্রেস, হিমায়িত খাদ্য, পাট ইত্যাদি রফতানি হয়। আর ইউক্রেনে পোশাকের বাইরে রফতানি হয় ওষুধ, প্লাস্টিক, জুতা, ম্যাট্রেস, খেলনাসহ বিভিন্ন পণ্য।

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত ২০২০-২১ অর্থবছরে ৩ হাজার ১৪৫ কোটি ডলারের পোশাক রফতানি করে বাংলাদেশ। এর মধ্যে রাশিয়ায় রফতানি হয়েছে ৫৯ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক, দেশীয় মুদ্রায় যা ৫ হাজার ৭৪ কোটি টাকার সমান। অপরদিকে ইউক্রেনে রফতানি হয়েছে ১ কোটি ১৭ লাখ ডলারের, বা ১০০ কোটি টাকার তৈরি পোশাক। রফতানি ছাড়াও ২০২০-২১ অর্থবছরে রাশিয়ার কাছ থেকে ৪৮ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের গমের বড় উৎস রাশিয়া। দেশটি থেকে ভুট্টাও আসে। কিন্তু ইউক্রেনের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের ঘটনায় রাশিয়ার বেশকয়েকটি ব্যাংক বৈশ্বিক অর্থ লেনদেনের মাধ্যম সুইফটের নিষেধাজ্ঞায় পড়ায় বাংলাদেশের সঙ্গে রাশিয়ার বাণিজ্য ও বিনিয়োগ হুমকির মুখে পড়েছে।

এ নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘায়িত হলে দেশটির সঙ্গে আর্থিক লেনদেন চালু রাখাই কঠিন হতে পারে। তবে সুইফটের বিকল্প হিসেবে রাশিয়ার সঙ্গে ‘কারেন্সি সোয়াপ’ পদ্ধতিতে লেনদেন নিষ্পত্তির প্রস্তাব বিবেচনা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম  বলেন, ‘‘রাশিয়ার যেসব ব্যাংক সুইফটের নিষেধাজ্ঞায় পড়েছে কেবল তাদের সঙ্গে লেনদেন করা যাবে না। তবে সুইফটের বিকল্প হিসেবে রাশিয়ার সঙ্গে ‘কারেন্সি সোয়াপ’ পদ্ধতিতে লেনদেন নিষ্পত্তির একটি প্রস্তাব যাচাই-বাছাই করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার চাইলে এটি কার্যকর করতে পারে।’’

সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তাফা কামাল সাংবাদিকদের বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার সঙ্গে আর্থিক লেনদেনে যদি সমস্যা হয়, সে ক্ষেত্রে আমরা বিকল্প লেনদেন পদ্ধতি খুঁজে বের করবো।

কী হবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের

রাশিয়ার আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় পাবনায় অবস্থিত রূপপুর প্রকল্পের বাস্তবায়ন অনেকটাই এগিয়েছে। এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের মাধ্যমে ২০২৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হওয়ার কথা। ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পে ৯১ হাজার কোটি টাকা ঋণ দিচ্ছে রাশিয়া।

এদিকে রাশিয়ার ১২টি ও বেলারুশের ২টি ব্যাংককে সুইফট থেকে তালিকাচ্যুত করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞা ১২ মার্চ কার্যকর হবে। এ গুলোর মধ্যে একটি ব্যাংকের মাধ্যমে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অর্থ লেনদেন হতো। ব্যাংক ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ফরেন ইকোনমিক অ্যাফেয়ার্স (ভিইবি) নামের রাশিয়ার ওই ব্যাংকটি কয়েকদিন আগে বাংলাদেশ ব্যাংককে সুইফট ব্যবস্থার মাধ্যমে পাঠানো একটি বার্তায় আপাতত তাদের সঙ্গে লেনদেন করতে নিষেধ করেছে। নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা অন্যান্য ব্যাংকের কাছ থেকেও বাংলাদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে এমন বার্তা এসেছে।

এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘সুইফটের নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ব্যাংকগুলোর সঙ্গে আমাদের যত আমদানি ও রফতানি ঋণপত্র আছে, সবই আটকে যাবে। রাশিয়া বিশ্ব লেনদেন-ব্যবস্থা থেকে পুরোপুরি তালিকাচ্যুত হলে রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পও আটকে যেতে পারে।’

/এপিএইচ/
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
পারমাণবিক কেন্দ্রে বিপর্যয়ের ঝুঁকি ‘প্রতিদিন বাড়ছে’: ইউক্রেন
পারমাণবিক কেন্দ্রে বিপর্যয়ের ঝুঁকি ‘প্রতিদিন বাড়ছে’: ইউক্রেন
১১ ঘণ্টা পর মিটারগেজ লাইনে ট্রেন চলাচল শুরু
গাজীপুরে বগি লাইনচ্যুত১১ ঘণ্টা পর মিটারগেজ লাইনে ট্রেন চলাচল শুরু
কীভাবে হয়েছিল প্রতিবাদ?
কীভাবে হয়েছিল প্রতিবাদ?
কমিশন গঠন করে বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্রকারীদের বিচার দাবি ডিএনসিসি মেয়রের
কমিশন গঠন করে বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্রকারীদের বিচার দাবি ডিএনসিসি মেয়রের
এ বিভাগের সর্বশেষ
ফিকে হয়ে আসছে ঢাকাই বেনারসির চাকচিক্য
ফিকে হয়ে আসছে ঢাকাই বেনারসির চাকচিক্য
যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রফতানি বেড়েছে ৬০ ভাগের বেশি
যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রফতানি বেড়েছে ৬০ ভাগের বেশি
বিজিএমইএ’র সাসটেইনেবল অ্যাওয়ার্ড প্রবর্তন
বিজিএমইএ’র সাসটেইনেবল অ্যাওয়ার্ড প্রবর্তন
ইডিএফ থেকে ঋণ নেওয়ার সময় বাড়লো
ইডিএফ থেকে ঋণ নেওয়ার সময় বাড়লো
চীনের তুলার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, সতর্ক বাংলাদেশ
চীনের তুলার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, সতর্ক বাংলাদেশ