সরকার কাজ করে, আমরা কাজের মূল্যায়ন করি। এই মূল্যায়নের নাম সমালোচনা। সরকার শুনতে চায় প্রশংসা। আমরা সাধারণত যা করি না। করার উপলক্ষ খুঁজে পাই না। সরকার নাখোশ হয়। সূর্যের চেয়ে বালি গরম। কোনও প্রবাদই অসত্য নয়। কিছু ‘বালি’ জাতীয় প্রাণী চরিত্রহননের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয়। সিপি গ্যাং নামক গালিবাজ-অশ্লীল সংগঠনের জন্ম হয়। শহীদ মিনারে নিষিদ্ধ করা হয়। নাবালকদের শিশুসুলভ কর্মকাণ্ড দেখি। সারা দেশের মানুষ দেখেন। ক্ষুব্ধ হন। মানুষের ক্ষুব্ধতাকে মূল্য দেওয়ার মতো অবস্থায় সরকার নেই। চরিত্রহননের অংশ হিসেবে অসত্য ছবি ‘পদ-পদবিধারী’ কর্তারাও শেয়ার করেন। তাতে ‘হেফাজতি’ মানসিকতা প্রকাশ পায়। তারপরও কাজ যা সেটাই করি, করার চেষ্টা করি। একমাত্র বোকারাই তা করেন। এবং আমি বোকা নাম্বার ওয়ান। তা না হলে সমালোচনা করার দরকারটা কী? শুভানুধ্যায়ীরা প্রতিনিয়তই এ প্রশ্ন করেন। উত্তর দিতে পারি না বা দেই না। উত্তর যে নেই, তা নয়।
বাংলাদেশ নামক দেশটির আমি একজন মালিক, আপনিও। দেশের সব মানুষ এই দেশের মালিক। সবাই সমান অংশীদার, কেউ কম-বেশি নয়। সংবিধান জনগণকে দেশের মালিকানা দিয়েছে। সেই দেশ, দেশের সম্পদ রক্ষা করার দায়িত্ব পালন করেন, যারা দেশ পরিচালনা করেন তারা। পরিচালনাকারীরা সঠিকভাবে পরিচালনা করছেন কিনা, করতে পারছেন কিনা- তা দেখার দায়িত্ব মালিকদের। দেশের সম্পদ পাহারা দেওয়া, পরিচালনাকারীদের মনিটরিং করা মালিকদের কর্তব্য। খুব ক্ষুদ্র একজন মানুষ হিসেবে সেই কাজটি করি, করার চেষ্টা করি। ক্ষুদ্র একজন মানুষ হিসেবে তা পবিত্র কর্তব্য মনে করি।
ভূমিকা শেষ, সরকারের কাজ, আলোচনা-সমালোচনা প্রসঙ্গে কিছু কথা বলি।
আরও পড়তে পারেন: জড়িত ৫২ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের খোঁজ নিচ্ছে সরকার
১. সরকারের অধিকাংশ কাজের কঠোর সমালোচক হয়েও প্রশংসা করি মানবতাবিরোদী অপরাধের বিচারের। আমরা যে দেশের মালিকানা পেয়েছি, সেই মালিকানা প্রতিষ্ঠার জন্যে রক্ত দিতে হয়েছে। ভয়াবহ রকমের ত্যাগ স্বীকার করেছেন মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্ম, শিশু-নারী-যুবক-বৃদ্ধ। সেই রক্ত ঝরানো পাকিস্তানিদের পাশে দাঁড়িয়ে, হত্যা এবং নারীর প্রতি অসম্মান করেছিল নিজামীরা। নিজামীরা ঐতিহাসিক মানবতাবিরোধী অপরাধী। তাদের বিচারের মধ্য দিয়ে ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করছেন শেখ হাসিনা সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ দিতেই হবে, প্রশংসা করতেই হবে। এই কাজটির জন্যে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন শেখ হাসিনা।
২. যে সময় নিজামীর রায় কার্যকর হচ্ছে, সেই সময়ে পৃথিবীর গণমাধ্যমের সংবাদ হয়ে আসছে ‘পানামা পেপারস’। যে প্রধানমন্ত্রী মানবতাবিরোধী অপরাদীদের বিচার করার মতো সাহস হৃদয়ে ধারণ করেন, নিজের জীবন বিপন্ন করার মতো সাহস দেখাতে পারেন, সৌদি-মার্কিন চাপ অগ্রাহ্য করতে পারেন- সেই প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার নাম ‘পানামা পেপারস’-এ স্থান পেতে পারে না। এমন ব্যক্তিকে উপদেষ্টা করতে পারেন না। পানামা পেপারসে তাদেরই নাম আছে, যারা দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার করেছেন। এই সম্পদ তারা আয় করেছেন অবৈধ উপায়ে। কিছু অর্থ ব্যবসা করে আয় করলেও, কর না দিয়ে পাচার করায় তা অবৈধ হয়ে গেছে।
এদেশের কিছু ব্যবসায়ী বৈধভাবে বিদেশে বিনিয়োগ করার সুযোগ চাইছেন বেশ কয়েক বছর ধরে। যেমন চার থেকে পাঁচটি ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানি আমেরিকায় ফ্যাক্টরি করতে চায়। এর জন্যে দেশ থেকে অর্থ নিতে হবে। বৈদেশিক মুদ্রা পাচারের আশঙ্কায় সরকার অনুমতি দেয় না। সরকারের আশঙ্কা একেবারে অমূলক নয়। বৈধভাবে টাকা বিদেশে নিতে না পারলেও অবৈধভাবে ‘রাজনীতি সংশ্লিষ্ট’ ব্যক্তিরা টাকা পাচার করছে। জনগণের সম্পদ পাচারকারী হিসেবে যিনি অভিযুক্ত তিনি কেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হবেন? তাকে কেন প্রধানমন্ত্রী উপদেষ্টা বানাবেন? নাম আসার পরেও কেন তিনি পদে থাকবেন? পানামা পেপারসে যেসব দেশের ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের নাম এসেছে, অনেক দেশই তদন্তের ঘোষণা দিয়েছে। কেউ কেউ পদত্যাগও করেছেন।
আরও পড়তে পারেন: আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে নিজামীর ফাঁসির খবর
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, তার স্ত্রী, অন্যান্য ব্যবসায়ী যাদের নাম এসেছে তাদের বিষয়ে তদন্ত হবে না? প্রতিষ্ঠানগুলোর তদন্ত হবে না?
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মানে- দুর্নীতিমুক্ত সমাজ ব্যবস্থা, সুশাসন।
ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য নিরূপণ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণকারী সরকারের উপদেষ্টা গরিব মানুষের সম্পদ পাচার করতে পারে না। করলে তার তদন্ত-বিচার করাটা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অংশ। দেশের মালিক জনগণ নিশ্চয়ই তাদের সম্পদ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দেখতে চায়।
৩. তারেক রহমানের বিরুদ্ধে অর্থ পাচার মামলার চলমান বিচার পরিণতি লাভ করুক। দেশের মানুষকে জানানো হোক টাকা পাচারের প্রকৃত তথ্য। কোকোর পাচার করা অর্থ ফেরত আনা হয়েছে, সাধুবাদ জানাই। এরশাদের অবৈধ সম্পদের নতুন করে অনুসন্ধান শুরু করা হোক। আরও কিছু বিষয়ে সরকারের কাজ দেখতে চাই, বক্তব্য জানতে চাই-
ক. এক বছরে পাচার হয়ে গেলে ৭৬ হাজার কোটি টাকা। কেন, কিভাবে পাচার হয়ে গেল? কারা পাচার করলো? ‘বর্তমানে জনগণের আয় বেড়েছে প্রচুর, তাই অর্থ পাচারও হচ্ছে প্রচুর’- অর্থমন্ত্রীর এই ‘বোগাস’ ‘রাবিশ’ বক্তব্য নিশ্চয়ই দেশের মানুষ শুনতে চায় না। কারণ সাধারণ জনগণ টাকা পাচার করেনি, পাচার করেছে ক্ষমতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী-রাজনীতিবিদরা। ভারতের আনন্দবাজার সংবাদ প্রকাশ করেছে, বাংলাদেশে থেকে গত ১০ বছরে প্রায় ৪৯ হাজার ১৩ কোটি ডলার পাচার হয়েছে। টাকার অঙ্কে যা ৩৯ লাখ কোটি টাকার মতো। গড়ে প্রতি বছর প্রায় ৪ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। যা জাতীয় জিডিপির প্রায় এক পঞ্চমাংশ। ১০ বছরের মধ্যে এই সরকারের সময়কালই প্রায় ৮ বছর। ব্যর্থ রাষ্ট্র পাকিস্তান বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে অত্যন্ত আপত্তিকর কথা বলে। আমরা ঘৃণার সঙ্গে তা প্রত্যাখ্যান করি। ভারত আমাদের বন্ধু। বর্তমান সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক অত্যন্ত হৃদ্যতাপূর্ণ।
আনন্দবাজার পত্রিকার অবস্থানও শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে নয়। সেই আনন্দবাজার যখন টাকা পাচারের সংবাদ প্রকাশ করে, সরকার নিশ্চুপ থাকে- সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরির অবকাশ থাকে না। দেশের মালিক জনগণ কি অর্থ-সম্পদ পাচারের বিষয়ে সরকারের অবস্থান জানার সুযোগ পাবে? নিশ্চয়ই মালিক জনগণের সেই অধিকার আছে। তদন্ত-বিচার-শান্তি চাওয়ার দাবি জানানোর অধিকার আছে। শেখ হাসিনা সরকারের দায়িত্ব জনগণকে পরিষ্কারভাবে সব বিষয় অবহিত করা।
৪. মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় দৃঢ়তার প্রকাশ। বুদ্ধিজীবী হত্যাকারীর মূল পরিকল্পনাকারী নিজামীর বিচার করতে পারা, অনেক বড় ইতিবাচক ঘটনা। সমাজের সর্বত্রই সেই আইনের শাসনের প্রতিফলন প্রত্যাশিত।
আরও পড়তে পারেন: এক নজরে তালিকায় থাকা বাংলাদেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান
পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া আইনের শাসনেরই অঙ্গ। রাজনীতিবিদ ব্যবসায়ী যেই হোক, সম্পদ পাচারকারীরা দেশের শত্রু। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেই হবে। দেশের মালিক জনগণ শত্রুদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দেখতে চায়। ‘অমুক দেশের রাজনীতিবিদ-ব্যবসায়ীদের নামও পানামা পেপারসে আছে’- এ জাতীয় কথা শুনতে চায় না। অভিযোগ আসায় কোন দেশের প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন, কোন কোন দেশ পাচারকারীদের বিষয়টি তদন্ত করছে- সেই দৃষ্টান্ত বাংলাদেশও অনুসরণ করুক তা দেখতে চায়।
৫. যুদ্ধাপরাধের বিচারের মধ্য দিয়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হচ্ছে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর হচ্ছে। এর প্রেক্ষিতে কথা আসবে, কোথায় আইনের শাসন? নিয়মিত বিরতিতে হত্যাকাণ্ড ঘটছে, তদন্ত হচ্ছে না, বিচার হচ্ছে না। এই কথা তো অসত্য নয়। যুদ্ধাপরাধের বিচার হচ্ছে, আগামীকাল থেকে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে- বিষয়টি তেমন নয়। আমরা তা প্রত্যাশাও করছি না।
এখনকার হত্যাকাণ্ড, সামাজিক-রাজনৈতিক অনাচার-দুর্নীতির বিচার অবশ্যই হতে হবে, করতে হবে। এই দাবি, সমালোচনা আমরা করতেই থাকবো- যত প্রতিকূলতাই মোকাবিলা করতে হোক না কেন। যেমনভাবে কঠিন প্রতিকূলতার মুখেও কথা বলেছি মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের পক্ষে। এখনকার হত্যাকাণ্ডগুলোর বিচার হচ্ছে না, দুর্নীতি-অনিয়ম চলছে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ধ্বংস হয়ে গেছে, সুতরাং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা যাবে না- এমন কূ-যুক্তি গ্রাহ্য হতে পারে না।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলছে, চলবে। এর জন্যে সরকারকে অভিনন্দন জানাবো। এখনকার হত্যা-অনিয়ম-নিপীড়ন নির্যাতনের বিরুদ্ধেও সোচ্চার থাকতে হবে। যুদ্ধাপরাধের বিচার করছে বলে সরকারের অন্যান্য কর্মের সমালোচনা করা যাবে না, এটা যৌক্তিক কথা নয়। হত্যা-অনিয়মের বিচার হচ্ছে না বলে যুদ্ধাপরাধের বিচার করা যাবে না- এটাও যৌক্তিক নয়।
সব অপকর্মের বিচার হতে হবে, বিচারের দাবিতে সোচ্চার থাকতে হবে- এটাই মালিক নাগরিকের কর্তব্য।
লেখক: সম্পাদক, সাপ্তাহিক



