যে জীবন লড়াই করার, মোকাবিলার...

ড. জোবাইদা নাসরীন
১৫ নভেম্বর ২০১৬, ১২:৪২আপডেট : ১৫ নভেম্বর ২০১৬, ১২:৫৩

জোবাইদা নাসরীন 'দুনদুভি বেজে ওঠে দ্রিমদ্রিম রবে
সাঁওতাল পল্লীতে উৎসব হবে...'
এদেশে প্রতিনিয়তই উৎসবের তরিকা তৈরি হয়। উৎসব করে পুরো চাঁদ, অর্ধ চাঁদ দেখার ধুম পড়ে। কিন্তু চাঁদ-ভৈরবের লড়াকু ভিটায় বাহাই উৎসবে আজ আর সাঁওতাল পল্লীতে দুনদুভি বেজে ওঠে না। বরং সাওতাল পল্লীতে আজ শোনা যায় গুলির শব্দ, রাষ্ট্রের গুলি চিনে নেয় সাঁওতাল যুবকের বুক, যারা ভূমি রক্ষায় জীবন দেয়। তাদের ভিটায় দেখা যায় আগুন, মর্গে পড়ে থাকে সাঁওতাল যুবকের লাশ। পুলিশ মাথা দুলিয়ে বলে - কে মেরেছে? কে মেরেছে? কাউকে যে দেখেনি তারা, কে আগুন লাগিয়েছে তাও তারা জানে না। অথচ সেই ভিডিও ফেসবুক ঘুরে সবার বুকে স্থায়ী হয়েছে। কিন্তু লাশ দেখেছে পুলিশ, আর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সাঁওতালদের হাতকড়া পরিয়ে পাহারা দিচ্ছে। 'সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি'র জিকির তোলা এই রাষ্ট্রে এইভাবেই সংখ্যালঘুকে বুঝিয়ে দেওয়া হয় এটি তাদের দেশ নয়। তারই প্রমাণ হিসেবে দেবী কালির ভাঙা মাথা গড়াগড়ি করে নাসিরনগরে আর উত্তরের জেলা গাইবান্ধায় চলছে সাওতাল বধ মহড়া। অথচ এই সাঁওতালরাই এদেশে প্রথম তৈরি করেছিল ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন। সিপাহী বিদ্রোহকে বাংলার প্রথম ব্রিটিশ বিরোধী বিদ্রোহ বলে জাতীয়তাবাদী ইতিহাসের নির্মাণ খারিজ করছে সিধু কানাই এর লড়াইকে। আর সেই জাতীয়তাবাদী দেমাগের উত্তাপে আজও ভূমিহীন সাঁওতালরা, যারা স্বপ্ন দেখেছিল এদেশের জমিন সবার জন্য সমান হবে, স্বাধীন দেশের মানচিত্রের সবার সমান ভাগ থাকবে। কিন্তু বার বার রাষ্ট্র কিংবা ক্ষমতার আঘাতে তারা ছিটকে পড়ে, তাদের দেশান্তরী হতে বাধ্য করা হয়। আর এই দেশান্তরীদের সংখ্যা রাষ্ট্র কখনই আমাদের জানতে দেয় না।

নাসিরনগরের ঘটনা তখনও হজম হয়নি, তবে আমেরিকার নির্বাচন তখন মনের উত্তেজনা, আর তখনই গাইবান্ধার এই ঘটনা। এ এক নিপীড়নের চলমানতা, একের পর এক নিপীড়ন চলতেই থাকে রামু, নাসিরনগর, পাবর্ত্য চট্টগ্রাম, গাইবান্ধা, কাল আপনার বাড়ি, পরশু আমার বাড়ি। গাইবান্ধার ঘটনা বহুদূর সাতড়ে যাওয়ার পরও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে হিলারির পরাজয় এবং ট্রাম্পের জয়ের খবর এবং বিশ্লেষণে যেন ডুবেছিল বাংলাদেশ, অথচ সেই তখন, সে-ই বিদীর্ণ করা সময়টিতে সাঁওতাল কৃষক শ্যামল হেমব্রম, মঙ্গল মার্ডি এবং রমেশ টুডুর চলে গেছে রাজা-মহারাজাদের এক দুর্দান্ত দাপটে। শ্যামল শব হয়ে আরও কিছু রাত কাটিয়েছে মর্গে, শরীর ভেংচিয়ে দেখা দিয়েছিল বুলেট। ভয়ে তার স্বজনেরা লাশের কাছে-পাশে যেতে পারেনি, এমনই সব ভয়-ভুতুড়ে সময়, মহিমাগঞ্জের সাঁওতালদের বেঁচে চলা জীবনটিকে কোথায় লুকাবে তার হিসেবের সময়। তবুও রাষ্ট্র দম্ভে বলে 'কিছুই ঘটেনি, খতিয়ে দেখা হবে', বালার মতো বেড়ি পড়ে যে মার খায় তার হাতে। কত রকমের রাষ্ট্রীয় খুচরা তামাশা! মিডিয়ায়ও ছিল নীরবতা, সাঁওতালি পাড়ার ভেঙে যাওয়া, ভাঙ্গিয়ে দেওয়া জীবনের চেয়ে তাদের কাছে যে হিলারি-ট্রাম্পের জয় পরাজয় গুরুত্বপূর্ণ-জীবন সংবাদ এখন পচন পরিক্রমায় চক্রে নির্বাসিত, তাকে যেন তুলে আনা মহা কঠিন।

৬ নভেম্বর ঘটনা ঘটলেও এখন পর্যন্ত এই ঘটনার কোনও বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি হয়নি। গ্রামে আগুন লাগানোর ভিডিও ফুটেজের মতো গুরুত্বপূর্ণ দলিলও এখন জনপরিসরে জায়গা করে নিয়েছে। কিন্তু পুলিশ বলছে তারা জানে না কে বা কারা আগুন লাগিয়েছে। এখন বরং মামলা হয়েছে সাওতালদের বিরুদ্ধে। এখনও এলাকায় আতঙ্ক। বাস করার মতো তাদের আশ্রয় নেই। নিরপত্তাহীনতা এখন তাদের সঙ্গী। অন্যদিকে তাদের পুড়ে যাওয়া বাড়িঘরে ঘর সংসার করছে কাঁটা তারের বেড়া। উচ্ছেদের পর সেই জমিতে শব্দ করে চলছে 'আধুনিক' ট্রাক্টর। মানুষকে পাহারা না দিলেও জমির পাহারায় আছে পুলিশ। মানুষের চেয়ে মূল্য বেশি ভূমির।

এক হাজার আটশ বিয়াল্লিশ দশমিক তিরিশ একর জমি মহিমাগঞ্জ সুগার মিলের জন্য অধিগ্রহণ করেছিলেন পাকিস্তান সরকার। তবে এখন এলাকাটিকে সবাই সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্ম হিসেবেই পরিচিত। এই অধিগ্রহণ ছিটকে দিয়েছিল ২০টিরও অধিক গ্রামের মানুষকে যাদের বেশিরভাগই সাঁওতাল। ভূমি অধিগ্রহণের কারণ ছিল আখ চাষ এবং তা থেকে উৎপাদন। কিন্তু শর্তের আরেকটি ছিল, চিনি উৎপাদন না হলে তা মালিককে ফেরত দিতে হবে। কিন্তু ২০০৪ সালে সেই চিনি উৎপাদন বন্ধ হয় এবং পরে বিভিন্ন সময়ে অনিয়মিতভাবেই চালু রাখা হয়। নিয়ম অনুযায়ী এই জমি সাঁওতালদের ফেরত দেওয়ার কথা। কিন্তু সেটি না দিয়ে চিনিকল কর্তৃপক্ষ ক্ষমতাবান প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছে ইজারা দেয় এবং তারা অধিগ্রহণ চুক্তিকে তোয়াক্কা না করে সেখান তামাক, আলু, ভুট্টা চাষ শুরু করে। সেই জমির অধিকার ফেরত পাওয়ার দাবিতে যে আন্দোলন গড়ে তোলেন সাঁওতালরা তারই ফলশ্রুতি তাদের হত্যা। সবাই জানে কারা, কেন এইসব ঘটায়। শুধু রাষ্ট্র জানে না, সরকার জানে না।

ভূমির লড়াই যে সাঁওতালরা শুরু করেছিল আজ থেকে দু'শো বছর আগে, সেই ভূমির অধিকার এখনও তারা পায়নি। এই ভূমি অধিকার রক্ষা করতে গিয়ে প্রতিবাদ করাতে আজ থেকে এক যুগ আগে হত্যা করা হয়েছিল গারো নারী গিদিতা রেমাকে, উত্তরবঙ্গেই প্রাণ দিতে হয়েছিল আলফ্রেড সরেনকে, গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল চলেশ রিছিলকে। এই ভূমির লড়াইয়ে আজ এদেশে প্রাণ দিতে হয় প্রান্তিক মানুষের, অথচ এরাই হলো ভূমির মানুষ, যাদের সঙ্গে ভূমির সবচেয়ে গভীর সম্পর্ক।

তবুও আশার জায়গা, মানুষ শত নিপীড়নের মাঝেই রুখে দাঁড়াবার চেষ্টা করে, তার মতো করেই প্রতিবাদ, প্রতিরোধ তৈরি করে, জীবনকে মোকাবিলায় জড়ায়। তাইতো শ্যামল, রমেশ এবং মঙ্গলরাই জীবন দিয়েই প্রমাণ করে, জীবন জয়ী হয়, অনিবার্যভাবেই হয়।

লেখক: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ইমেইল: [email protected]

 

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
সর্বশেষসর্বাধিক