ব্রেকিং নিউজের যুগে ভরসা ‘অনলাইন’

রুমীন ফারহানা
১৫ মে ২০১৭, ১৩:২৫আপডেট : ১৫ মে ২০১৭, ১৩:২৬

রুমীন ফারহানা সকালে নাশতার টেবিলে ধোঁয়া ওঠা এক কাপ চা আর সাথে তাজা খবরে ভরা বাংলা বা ইংরেজি পত্রিকা- এই ছিল শিক্ষিত, সচেতন, মধ্যবিত্ত প্রায় প্রতিটি পরিবারের রোজ সকালের চিরচেনা ছবি। এমনকি ভাগাভাগিও হয়ে যেত পত্রিকাটির পরিবারের সদস্যদের মধ্যে। হয়তো দেশ আর রাজনীতির খবরে ভরা পাতাটি কর্তার হাতে, রান্নার কড়চা গিন্নীর, ফ্যাশন আর সাজসজ্জার পাতা কন্যার দখলে আর খেলার খবর পরিবারের ছেলেটির হাতে। খুবই পুরুষতান্ত্রিক আর একপেশে শোনাতে পারে কথাটি; তবে বেশির ভাগ পরিবারে ঘটনাটা কিন্তু ছিল এমনই। দিনের শেষে সব পাতা ঠিকঠাক মিলিয়ে আবার তাকে আস্ত পত্রিকার চেহারা দেওয়া ছিল রীতিমত কষ্টসাধ্য ব্যাপার। এমন দৃশ্যের সাক্ষী হয়েই আমাদের বেড়ে ওঠা। এখন সময় বদলেছে। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে কিছুটা হলেও বদলেছে আমাদের প্রতিদিনকার সকালবেলার চিত্র।
তাজা খবর এখন আর কেবল দিনের একটি সময়ের মধ্যে আটকে নেই। এখন ২৪ ঘণ্টাই তাজা খবর। যখনই ঘটনা তখনই খবর। জীবনের দৌড়ে প্রতিটি মুহূর্ত আপ টু ডেট থাকতে চায় সবাই। এটা ব্রেকিং নিউজের যুগ, নিম্ন মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত- প্রায় সব পরিবারের সদস্যদের হাতে হাতে পৌঁছে গেছে স্মার্ট ফোন, সাথে ইন্টারনেট, থ্রিজিসহ নানা আধুনিক উপকরণ। কাগজের জায়গা ক্রমেই দখল করে নিচ্ছে মোবাইল বা ট্যাবের স্ক্রিন।
প্রতি মুহূর্তের সব খবর এখন হাতের মুঠোয়। অনলাইন পত্রিকার যুগে বাস করছি আমরা। টিভির স্ক্রলে হয়তো ব্রেকিং নিউজ যায় প্রতি ঘণ্টায়। কিন্তু আমরা যারা পথে যেতে যেতে, অফিসের কাজের ফাঁকে, দীর্ঘ সময় জ্যামে আটকে থেকে কিংবা নিছক অবসরের বিনোদনের মধ্যেও চাই খবর, প্রতি মুহূর্ত তাদের একটাই ভরসা ‘অনলাইন নিউজ পোর্টাল’। অনলাইন পত্রিকার উপযোগিতা স্বীকার করে প্রায় সকল নামকরা জাতীয় দৈনিক পত্রিকা প্রতি সকালে কাগজ প্রকাশের পাশাপাশি প্রতি মুহূর্ত তাদের সাইটে আপলোড করছে নিত্যনতুন নানান খবর।

সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যম যেমন ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রামের এ স্বর্ণযুগে অনলাইনে ছাপা হওয়া খবর আবার মুহূর্তের মধ্যে ছডিয়ে পড়ছে লাখো হাতে। বড় বড় মিডিয়া হাউসগুলো নানা হিসাব-নিকাশের ফেরে পড়ে অনেক ক্ষেত্রেই সেলফ সেন্সরশিপের শিকার হয়। কোটি টাকার ইনভেস্টমেন্ট, বিজ্ঞাপন বন্ধের ঝুঁকি, পত্রিকা বন্ধ করে দিলে কয়েক শ’ সংবাদকর্মীর জীবন-জীবিকা অনিশ্চিত হয়ে পড়া, সম্পাদকের ওপর মামলা, হামলার সংস্কৃতি- এসবই কাজ করে সেলফ সেন্সরশিপের পেছনে। অনলাইন পত্রিকার ক্ষেত্রে এসব হিসাব কাজ করলেও তা অন্তত ছাপার কাগজ থেকে কিছুটা হলেও কম ঝুঁকিতে থাকে। কারণ ছাপাখানা ঘুরে আসা পত্রিকার তুলনায় অনলাইন পত্রিকার বাজেট, জনবল, বিজ্ঞাপন নির্ভরতা অনেকটাই কম। যদিও জনপ্রিয় অনলাইন পত্রিকা শীর্ষ নিউজ বন্ধ করাসহ এর সম্পাদকের ওপর নেমে আসা রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের খড়গ আমরা দেখেছি। বন্ধ হয়ে গেছে বেশ কিছু অনলাইন পত্রিকা। তবে অনলাইন পত্রিকার সহজলভ্যতা, প্রতি মুহূর্তের আপডেট, হাতের মুঠোয় থাকবার সুবিধা, একসাথে প্রায় বিনা খরচে সকল পত্রিকা দেখার সুযোগ, গুরুত্বপূর্ণ খবর শুধু লিংক দিয়েই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সাহায্যে মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে দেবার ক্ষমতা অনলাইন পত্রিকাকে নিয়ে গেছে জনপ্রিয়তার শীর্ষে। কিছু পত্রিকা হয়তো সমালোচিত হয়েছে ক্রমাগত ভুল বা মিথ্যা তথ্য প্রকাশের জন্য, কিন্তু দিনের শেষে আমি মনে করি এর বিচারের ভার পাঠকের হাতেই ছেড়ে দেয়া উচিত। পাঠকই বিচার করবে কোন পত্রিকাটি সে পড়বে, কোনটির ওপর আস্থা রাখবে আর কোনটিকেই বা সে বাদ দেবে।

রাজনৈতিক মেরুকরণে দ্বিধাবিভক্ত বাংলাদেশে রাজনীতি এবং সাংবদিকতার ভেদরেখা এখন অনেক বেশি অস্পষ্ট হয়ে উঠেছে বলে মনে করছে অনেকে। মুক্ত সাংবাদিকতার পক্ষে আন্দোলন চালিয়ে আসা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংগঠন কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস বা সিপিজে ২০১৩ সালের তথ্যের ভিত্তিতে সাংবাদিকতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ নয়টি দেশের যে তালিকা করেছে, তাতে বাংলাদেশের অবস্থান ছয় নম্বরে।

সাংবাদিক মাহফুজ আনাম, শফিক রেহমান, মাহমুদুর রহমান, শওকত মাহমুদ, আবদুস সালামসহ আরও অনেকের ওপর নেমে আসা রাষ্ট্রীয় খড়গ ভীতসন্ত্রস্ত আর সাবধান করে তুলেছে অনেক নির্ভীক গণমাধ্যম কর্মীকেও। পত্রিকার সংখ্যা বাড়ছে, আসছে নিত্যনতুন টিভি চ্যানেল। কিন্তু যে নিরপেক্ষতা, বস্তুনিষ্ঠতা, অনুসন্ধানী রিপোর্ট মানুষ আশা করে,  তার ক্ষেত্রে কতটা সফল হয়েছে গণমাধ্যম, তা হয়তো কিছুটা বিচার-বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

তবে এটাও সত্য যে, আমরা গণমাধ্যমকে যতই দোষারোপ করি না কেন তাদের সেলফ সেন্সরশিপের জন্য, রাজনৈতিকভাবে একটি দলের পক্ষপাতিত্বের জন্য, কিন্তু একটি বিষয় বোধ করি সবারই বোঝা উচিত- এই স্বৈরতান্ত্রিক, ফ্যাসিস্ট সরকারের তীব্র চাপের ভেতর থেকেও যেটুকু খবর আমরা পাই, তা কিন্তু এই গণমাধ্যমের কল্যাণেই। কিছু সাংবাদিক ব্যক্তিগত লোভ-লালসা, হিসাব-নিকাশ থেকে কাজ করতেই পারে। কিন্তু সার্বিক অর্থে গণমাধ্যমের ভূমিকা কিছুতেই অস্বীকার করবার নয়।

লেখক: আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ

 

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
সর্বশেষসর্বাধিক