‘পাঠাও’ নিয়ে উদ্বেগ কেন?

আমীন আল রশীদ
২৭ জুলাই ২০১৭, ১৬:৩৯আপডেট : ২৭ জুলাই ২০১৭, ১৬:৪৫

আমীন আল রশীদ ঢাকা শহরে যারা পাবলিক বাস বা গণপরিবহনে যাতায়াত করেন তারা জানেন এর ঝক্কি। ঢাকায় এত বছরেও একটা জনবান্ধব গণপরিবহন পদ্ধতি চালু করা যায়নি। গণপরিবহন মালিক-শ্রমিকদের নৈরাজ্যের কাছে সাধারণ মানুষ যে কতটা জিম্মি, তা ভুক্তভোগীরা প্রতিদিন টের পান।
সড়কমন্ত্রীর বারবার ঘোষণা আর হুঁশিয়ারির পরও ঢাকা শহরে কোনও সিএনজি অটোরিকশাই যে মিটারে যায় না এবং চালকরা যেভাবে নাগরিকদের দুর্বলতার সুযোগ নেন, তা সবার জানা। আবার বেশি ভাড়া চাওয়া বা মিটারে যেতে না চাওয়ার পেছনে সিএনজি অটোরিকসা চালকদের যুক্তিও ফেলনা নয়। সব মিলিয়ে পুরো গণপরিবহন ব্যবস্থায় একটা চরম বিশৃঙ্খলা চলে আসছে বছরের পর বছর ধরে।
এরকম বাস্তবতায় এই মহানগরীতে কিছুটা আশার আলো জ্বেলেছে মোবাইল ফোনের অ্যাপভিত্তিক দুটি পরিবহন সেবা। একটি আন্তর্জাতিকভাবেই স্বীকৃত উবার–– যেখানে নিবন্ধনকারী যেকোনও সময় যেকোনও স্থান থেকে অর্ডার করলে তার কাছে হাজির হবে প্রাইভেট কার। একসাথে তিন চারজন কোথাও যেতে চাইলে (ঢাকার মধ্যে) এর চেয়ে ভালো, সাশ্রয়ী এবং আরামদায়ক বাহন আর হয় না। কিন্তু বাংলাদেশে ‘উবার’ যেহেতু এখনও আইনি কাঠামোয় আসেনি, তাই এ নিয়ে সরকারের সাথে কর্তৃপক্ষের একটা টানাপড়েন আছে। তারপরও এখন পর্যন্ত এটি চলছে। কিন্তু সম্প্রতি বিপত্তি বেঁধেছে ‘পাঠাও’ নিয়ে।

এটিও মোবাইল ফোনের অ্যাপভিত্তিক দেশীয় প্রযুক্তি। যেখানে ব্যক্তিগতভাবে মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীরা তার মোটরবাইকটিকে নিবন্ধিত করছেন এবং যেকোনও নাগরিক ওই অ্যাপে নিবন্ধন করে উবারের মতো যেকোনও জায়গায় বসে অর্ডার করলে তার সামনে হাজির হয়ে যাচ্ছে। দ্রুততম সময়ে কোথাও যাওয়ার জন্য এর চেয়ে ভালো পদ্ধতি হয় না। তবে এখানে কেবল একজনই চড়তে পারেন এবং সাথে ভারি ব্যাগ না থাকলে সুবিধা হয়।

ব্যক্তিগতভাবে আমি ঢাকা শহরের সেই অল্প কিছু সৌভাগ্যবান মানুষের একজন যাকে গণপরিবহনের এই ‘হ্যাপা’ পোহাতে হয় না। বাসা থেকে হেঁটেই অফিসে যাতায়াত করতে পারি। রোদ বা বৃষ্টি থাকলে বড়জোর রিকসা। কিন্তু অফিসের বাইরেও প্রচুর ব্যক্তিগত কাজ থাকে। পারিবারিক ও সামাজিক যোগাযোগের বিষয় থাকে। সেসব কাজে এখন আমার কাছে এই ‘উবার’ এবং ‘পাঠাও’ একটা বড় আশীর্বাদ।

কয়েকদিন আগে কোনও কারণে সকাল থেকেই ঢাকার রাস্তায় ভয়াবহ জ্যাম তৈরি হয়। বিভিন্ন অনলাইন সংবাদপত্র এ নিয়ে খবরও প্রকাশ করে। অথচ ওইদিন আমার সেগুনবাগিচা, শাহবাগ এবং সন্ধ্যায় গুলশান ২ নম্বরে জরুরি কাজ ছিল। খুবই আতঙ্কিত হয়ে পড়লাম। তখন অর্ডার করলাম ‘পাঠাও’। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে হাজির। গ্রিনরোড থেকে ১৪ মিনিটে সেগুনবাগিচা, সেখান থেকে ১০ মিনিটে শাহবাগ এবং শাহবাগ থেকে আধা ঘণ্টারও কম সময়ে গুলশান ২। এর মধ্যে আবার তিনটা রাইডে ছিল ডিসকাউন্ট। সব মিলিয়ে আমার খরচ হলো দুইশো টাকারও কম। ঢাকা শহরে এটা একসময় ভাবা যেত? এই পথেই যদি আমি সিএনজি অটোরিকসায় যাতায়াত করতাম, প্রথমত সব জায়গায় আমি সময়মতো পৌঁছাতেই পারতাম না। ভাড়া লাগতো কয়েকগুণ। কিন্তু সেই খরচ ও পথের বিলম্ব দূর করে দিয়েছে একটিমাত্র অ্যাপ। কিন্তু সংবাদপত্রে খবর দেখছি সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) অনুমোদন ছাড়াই অবৈধ পরিবহন ব্যবসা করছে এমন অভিযোগে পাঠাও-এর মোটরসাইকেল দেখলেই মামলা করছে পুলিশ।

গত বছরের আগস্ট থেকে ঢাকার রাস্তায় এই সেবা চালু হলেও সম্প্রতি হঠাৎ করেই এর বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হয়েছে। ফলে মামলার ভয়ে এখন ‘পাঠাও’ রাইড দেওয়ার সময় চালকরা যাত্রীদের ‘পুলিশ ধরলে পাঠাওয়ের কথা বলা যাবে না’ বলে সতর্ক করে দিচ্ছেন। তবে এরপরেও প্রায় প্রতিদিনই পাঠাও মোটরসাইকেলের বিরুদ্ধে মামলা করছে পুলিশ। তার মানে ‘পাঠাও’-এর ভবিষ্যত এখন অনিশ্চিত।

কথায় বলে, ‘ভাত দেওয়ার মুরদ নেই কিল মারার গোঁসাই’। মানে আপনি একদিকে গণপরিবহন ব্যবস্থা একট সিস্টেমের মধ্যে আনতে পারবেন না, নাগরিকের চলাচল আরামদায়ক করতে পারছেন না, অথচ তারা নিজেদের প্রয়োজনে কোনও একটা উপায় বের করলে সেটা বন্ধ করে দেবেন।

বিআরটিএ কর্তৃপক্ষের দাবি, মোটরসাইকেল নিবন্ধন দেওয়া হয় শুধু ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য। এটাকে বাণিজ্যিক বাহন হিসেবে ব্যবহারের কোনও সুযোগ নেই। কেউ যদি মোটরবাইক ভাড়ায় চালায়, তাহলে সেটা বেআইনি কাজ। ঠিকাছে মানলাম, তাহলে এটাকে আইনের আওতায় আনুন। নাগরিকরা তো সুবিধা পাচ্ছে এ সেবায়।   

কথা হলো উবার কিংবা পাঠাওয়ের মতো সেবা চালুর পেছনে প্রধানত দায়ী এই মহানগরীতে কোনও জনবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থা না থাকা। এখানে রাষ্ট্রও তার দায় এড়াতে পারে না। যদি সব রুটে পর্যাপ্ত পাবলিক বাস থাকত, যদি সেগুলোর ভাড়া নিয়ে কোনও নৈরাজ্য না থাকত এবং যদি সত্যিই বিআরটি-এর মতো প্রতিষ্ঠান গণপরিবহনে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পারত, তাহলে ‘উবার’ বা ‘পাঠাও’ তো দূরে থাক, মানুষ ঋণ করে প্রাইভেটকারও কিনত না।

ঢাকা শহরে প্রতিদিন এত প্রাইভেটকার কেন নামে? খোঁজ নিলে দেখা যাবে, এসব গাড়ির অধিকাংশের মালিকই আসলে মধ্যবিত্ত যাদের প্রাইভেট কারে চড়ার কথা নয়। কিন্তু তারা ধারকর্য করে গাড়ি কিনছেন ভালো গণপরিবহন না থাকায়।

এই শহরে যেদিন এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত মেট্রোরেল চলাচল করবে, বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) চালু হবে, সরকারি বেসরকারি গাড়িগুলো একটার পর একটা স্টপেজে এসে থামবে এবং ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থা একটা নিয়মের মধ্যে আসবে- তখন মানুষের ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে প্রাইভেট কার কেনার প্রবনতাও বন্ধ হবে।

কিন্তু যতদিন না সেটা হচ্ছে, ততদিন ‘উবার’ ও ‘পাঠাও’ চলতে দিলে সমস্যা কোথায়? এটাকে নিয়ম বা আইনি কাঠামোর মধ্যে আনাই বরং নাগরিকের জন্য সুবিধা হবে। সেটা যত দ্রুত হয় ততই মঙ্গল।

গত বছরের ডিসেম্বরে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের অবশ্য ঢাকায় এক অনুষ্ঠান বলেছিলেন, ‘উবার’ নিয়ে শিগগিরই তারা একটি যৌক্তিক সমাধানে পৌঁছাবেন। এখানে জনগণের স্বার্থ বিবেচনায় রাখারও আশ্বাস তিনি দিয়েছিলেন। সুতরাং সেটি খুব দ্রুত হবে এবং ‘পাঠাও’-এর মোটরসাইকেল ধরপাকড় বন্ধ হবে, এটি আমাদের প্রত্যাশা। সেইসাথে ‘উবার’ বা ‘পাঠাও’য়ে সেবা নিতে গিয়ে যাতে কোনও যাত্রী হয়রানির শিকার না হন, সেটি দেখার জন্যও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিশেষ করে ট্রাফিক সার্জেন্টদের আন্তরিক হতে হবে। মামলা না দিয়ে বরং নাগরিকরা যাতে নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে, সেটি নিশ্চিত করার নামই দায়িত্বশীলতা।

লেখক: সাংবাদিক

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
কুমিরের আক্রমণে সন্তানের মৃত্যুর পর ফজিলাকে খুঁজে পেলো পরিবার
কুমিরের আক্রমণে সন্তানের মৃত্যুর পর ফজিলাকে খুঁজে পেলো পরিবার
ট্রাফিক আইন সবার জন্য সমান, পুলিশ সদস্য হলেও ব্যবস্থা: ডিএমপি কমিশনার
ট্রাফিক আইন সবার জন্য সমান, পুলিশ সদস্য হলেও ব্যবস্থা: ডিএমপি কমিশনার
ফ্রিল্যান্সারদের আয় থেকে সাড়ে ৭ শতাংশ কর কাটা নিয়ে যা বলছে এনবিআর 
ফ্রিল্যান্সারদের আয় থেকে সাড়ে ৭ শতাংশ কর কাটা নিয়ে যা বলছে এনবিআর 
কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয়ে ৭.৫% কর নেওয়ার অভিযোগ, স্পষ্ট করার দাবি সারজিসের
কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয়ে ৭.৫% কর নেওয়ার অভিযোগ, স্পষ্ট করার দাবি সারজিসের
সর্বশেষসর্বাধিক