আমেরিকায় সমাজতন্ত্রের পূর্বাভাস

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
২৬ জুলাই ২০১৮, ১৪:৫২আপডেট : ২৬ জুলাই ২০১৮, ১৬:২৩

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী আমেরিকায় নির্মম এক দাস ব্যবস্থা চালু ছিল। অমানবিক এ ব্যবস্থা রহিত করতে গিয়ে প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন গৃহযুদ্ধের কবলে পড়েছিলেন। তিনি দাস ব্যবস্থা রহিত করে ছেড়েছিলেন আবার গৃহযুদ্ধ মোকাবিলা করে আমেরিকার ঐক্যও সুদৃঢ় করেছিলেন। মানুষ কোনও নতুন ব্যবস্থাকে সহজে মানতে চায় না। অথচ নতুন ব্যবস্থাটাই হচ্ছে সময়ের দাবি। ওই ব্যবস্থা ছাড়া সমাজ স্থবির হয়ে যাবে।
দাস ব্যবস্থার পরে সামন্ত ব্যবস্থার উদ্ভব হয়েছিল। সামন্ত ব্যবস্থা ক্ষয়ে গেলে তার স্থান দখল করে নিয়েছিল পুঁজিবাদী ব্যবস্থা। এখন আমেরিকার সমাজে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার চূড়ান্ত বিকাশ হয়েছে। এখন আমেরিকার ৯৯ শতাংশ পুঁজির মালিক ওয়ালস্ট্রিটওয়ালারা, অথচ তারা হচ্ছে আমেরিকার এক শতাংশ মানুষ। সামন্ত ব্যবস্থাকে ভেঙে পুঁজিবাদকে হটিয়ে অন্য ব্যবস্থা আসবে, নয়তো আমেরিকার সমাজ আরেক হানাহানি অথবা গৃহযুদ্ধের সম্মুখীন হবে।
বল দেখিয়ে, বুদ্ধি খাটিয়ে আর কতদিন পুঁজিবাদ টিকে থাকবে! আমেরিকায় এক শতাংশ মানুষ ৯৯ শতাংশ মানুষকে সুদীর্ঘকালব্যাপী পিছু হটিয়েছে। এখন তাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকেছে। সুতরাং প্রতিঘাত এখন প্রত্যাশিত। অকুপাই ওয়ালস্ট্রিট-এর আওয়াজ উঠেছিল। ২০০৮ সালের এ প্রতীকী আওয়াজটা এখন ঝড় সৃষ্টির পূর্বাভাস দিচ্ছে।

কমিউনিস্টরা বা সমাজতন্ত্রীরা এখন আর কোনোখানে ক্ষমতায় নেই। তাদের পতন হয়েছে। এ পতন ঠেকানো যায়নি। এ ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে কোনও গবেষণা হয়নি। রাষ্ট্রগুলো তার প্রয়োজনও অনুভব করেনি। সোজা তারা ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার দিকে পা বাড়িয়ে ধনতান্ত্রিক পদ্ধতিটাকেই গ্রহণ করেছে। অথচ এখন দেখা যাচ্ছে শীর্ষ ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার দেশ খোদ আমেরিকায় ধীরে ধীরে সমাজতন্ত্রের আওয়াজ উঠছে।

এখন যুক্তরাষ্ট্রের ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা সে দেশের ৯৯ শতাংশ মানুষকে সুখি করতে পারেনি। বরং তাদের অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তুলেছে। গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্রেট দলীয় প্রাইমারি নির্বাচনে প্রার্থী সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স নির্বাচনি প্রচারণায় সমাজতন্ত্রের আওয়াজ তুলেছিলেন এবং আমেরিকার যুব সমাজের উল্লেখযোগ্য একটা অংশ তার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল। তারা নিজেরা নিজের মধ্য থেকে চাঁদা সংগ্রহ করে তার নির্বাচনি প্রচারণা চালিয়ে ছিল।

কিন্তু প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের কারণে বার্নি স্যান্ডার্স শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন যুদ্ধে জিততে পারেননি। ডেমোক্রেট পার্টির মনোনয়ন পেয়েছিলেন হিলারি ক্লিনটন। হিলারি ক্লিনটন ছিলেন ওয়ালস্ট্রিটেরই দালাল। আর রিপাবলিকান পার্টির শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন পেয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি তো নিজেই ওয়ালস্ট্রিটের লোক। অবশ্য তখন তিনি ওয়ালস্ট্রিটের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। ট্রাম্প নির্বাচনের সময় ভালো হোক মন্দ হোক একটা কর্মসূচি পেশ করেছিলেন এবং বলেছিলেন তিনি আমেরিকাকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নেবেন।

আর ডেমোক্রেটের প্রার্থী হিলারির কোনও কর্মসূচি ছিল না। কর্মসূচি ছাড়া সমাবেশ করে তালিয়া বাজিয়ে গ্র্যান্ড রিপাবলিককে পরাজিত করা তো সম্ভব নয়। সর্বোপরি ডেমোক্রেটরা ছিল অ্যান্টি ইনকামবেন্সি ফ্যাক্টরের মুখোমুখি। তার ওপর হিলারি ছিলেন মহিলা প্রার্থী। আমেরিকার ভোটারেরা মহিলাকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত কখনও করেনি। যা হোক শেষ পর্যন্ত হিলারি পরাজিত হয়েছেন। আর ট্রাম্প নির্বাচিত হয়েছেন।

ডেমোক্রেট দলীয় প্রাইমারিতে প্রার্থী সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স শেষ দিন পর্যন্ত প্রাইমারিতে হিলারির সঙ্গে নির্বাচনি যুদ্ধে লড়েছিলেন। আমেরিকান ভোটারদের কাছে পুঁজিবাদের অনাচার থেকে রক্ষার হাতিয়ার হিসাবে সমাজতন্ত্রকে বেছে নেওয়ার জন্য বার্নি স্যান্ডার্সের আবেদন ‘সমাজতন্ত্র’ নামক শব্দটিকে সাধারণ আমেরিকানদের কাছে পরিচিতিদান করেছিল। তিনি বলতেন পুঁজিবাদের দুর্বলতা কাঠামোগত। সুতরাং কোনও চক্রাকার বিবর্তনের মাঝে কোনও ব্যবস্থা প্রত্যাশা করা যায় না। অকুপাই ওয়ালস্ট্রিট ও বার্নি স্যান্ডার্স যে আমেরিকানদের কাছে কোনও আবেদন রাখতে পারেনি তা নয়। সাত আট বছরের মাঝে দেখা যাচ্ছে আমেরিকার ভোটারদের চিন্তার মাঝে ধীরে ধীরে মৌলিকভাবে একটা চেতনা বিকাশের সূচনা হচ্ছে।

আমেরিকাতে এখন মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে। কংগ্রেসম্যান, রাজ্যবিধান সভার সদস্য যাদের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে তাদের শূন্য আসনে নির্বাচন হবে। এখন দেখা যাচ্ছে কয়েক ডজন প্রার্থী সমাজতন্ত্রের কথা বলে মনোনয়নের প্রাইমারিতে জিতে গেছে। তারা অবশ্য ডেমোক্রেট দলেরই মনোনয়ন প্রত্যাশী। কেউ কেউ বলছে আমরা স্যোশাল ডেমোক্রেট। সবচেয়ে আশ্চার্যের বিষয় হলো, নিউইয়র্ক কেন্দ্রের যেখানে ডেমোক্রেট দলের নামিদামি নেতা জোসেফ ক্রাউলি গত ২০ বছরব্যাপী নির্বাচিত হচ্ছেন, তাকে মনোনয়নের বাছাই পর্বের নির্বাচনে ২৮ বছর বয়সের আলেকসান্দ্রিয়া ওকাসিও নামের এক মহিলা পরাজিত করেছেন।

জোসেফ ক্রাউলি এ নির্বাচনে খরচ করেছেন ১৯ লক্ষ ডলার। আর আলেকসান্দ্রিয়া ওকাসিও দরিদ্র মহিলা। এক পান্থশালায় কাজ করেন। তিনি নির্বাচনের খরচ ব্যবস্থা করেছেন ফেসবুক এবং টুইটারের মাধ্যমে ৫/১০ ডলার করে। তিনি হেঁটে হেঁটে মানুষকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন নির্বাচিত হলে বঞ্চিত মানুষের জন্য লড়াই করবেন। মানুষ ২০ বছরব্যাপী ক্রাউলিকে নির্বাচিত করলেও এবার এ দরিদ্র মহিলাটির প্রতিই আস্থা স্থাপন করেছেন।

আমি ‘লড়াই করবো’—সম্ভবত এ শব্দটাই মানুষকে আলেকসান্দ্রিয়া ওকাসিওকে ভোট দিতে অনুপ্রাণিত করেছে। এ কেন্দ্রটি ডেমোক্রেটদের কেন্দ্র। সুতরাং বলা যায় আলেকসান্দ্রিয়া ওকাসিও নির্বাচিত হবেন। বহু বছরব্যাপী এ কেন্দ্রে ডেমোক্রেটরাই নির্বাচিত হন। এতদিন কোনও সংকোচবোধ না করেই সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স সমাজতন্ত্রের কথা বলতেন। এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে আরও বেশ কিছু জনপ্রতিনিধি সমাজতন্ত্রের কথা বলতে সম্ভবত বের হয়ে আসবেন। হয়তবা আমেরিকার বুকে সাম্যবাদের আন্দোলন ধীরে ধীরে গড়ে উঠবে।

আমেরিকায় ধনবাদ কোনও উপকারে আসছে না নিম্ন শ্রেণির মানুষের জন্য। সুতরাং আন্দোলনটা হয়তো বেগবান হবে। ডেমোক্রেট প্রার্থী হিসেবে আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও ছাড়াও সামালি, সরা ইনামোরাটো, এলিজাবেথ ফিড়লারও প্রাইমারিতে জিতেছেন এবং এমন এমন এলাকা থেকে জিতেছেন যে এলাকাগুলো ডেমোক্রেটদের এলাকা হিসেবে পরিচিত। চূড়ান্ত নির্বাচনে তারা জিতে যাবে এ কথা দৃঢ়ভাবে বলা যায়।

এখন আমেরিকায় যারা সমাজতন্ত্রের কথা বলছেন তাদের নিশ্চয়ই জানা আছে বিশ্বের একটা এলাকায় এ সমাজতন্ত্রবাদ উৎখাত হয়েছে। আবার দেখা যাচ্ছে ধনবাদও আমেরিকান সমাজে সবার জন্য সুখকর হয়নি। সমাজবাদীরা যেমন দৌড়ে ধনবাদে ফিরে আসলো, আমেরিকার সমাজবাদীরাও ধনবাদ ফেলে দৌড়ে সমাজবাদে গেলে হবে না। উভয় মতবাদের সবকিছুই পরিত্যজ্য নয় আবার সবকিছুই গ্রহণের উপযোগীও নয়। সুতরাং আমেরিকার স্থপতিদের মতো সবকিছু চুলচেরা আলোচনা করে গ্রহণ বর্জনের সীমারেখা স্থির করতে হবে।

ব্যাপক অসন্তোষ থেকে বাঁচার জন্য আপাতত রুজভেল্টের পথে হাঁটা ছাড়া কোনও উপায় আছে বলে মনে হয় না। সমাজবাদ কালকে আসবে না তবে ধনবাদে যে পচন লেগেছে তা নিরেট সত্য। প্রতিরোধ গড়ে ওঠার আগেই ধনবাদীদের উচিত বৈষম্য যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা। তাহলে সমাজ নিরুপদ্রব থাকবে। ডেমোক্রেট আর রিপাবলিকান এ দুই পার্টিরই আমেরিকায় প্রাধান্য বেশি। ডেমোক্রেটরা প্রগতিশীল ছিল, তারা সময়ের তালে পরিবর্তন আনতে দ্বিধা করতো তা কিন্তু গত কয়েক দশক ধরে তারাও রিপাবলিকানদের মতো আচরণে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে।

তাই মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রাইমারিতে মনোনয়নের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রগতিবাদী এ চার মহিলার বিজয় দেখে ডেমোক্রেট নেতৃবৃন্দ ও এস্টাবলিসমেন্টের হুঁশ ফিরে পাওয়া উচিত। ধনীদের কর কমিয়ে ঋণের বোঝা বাড়ানো দায়িত্বহীন কাজ। ঘাটতি কমানোর বোঝা কখনও গরিবের পিঠে চাপানো উচিত নয়। ধনীদের জন্য কোনও কর নেই। আইন নেই, গরিবের কোনও নিরাপত্তা বেষ্টনী নেই। ধনীদের সম্পদ রক্ষা এবং প্রতিরক্ষার দিকে নজর দেওয়া ছাড়া সরকারের কোনও কাজ নেই। অনুরূপ করে একটা সমাজ তো টিকে থাকতে পারে না।

এ চার মহিলার বিজয় যদি ডেমোক্রেটিক পার্টির এস্টাবলিসমেন্টকে নাড়া না দেয় তাহলে পার্টি পিছিয়ে পড়বে। ধনীদের স্বার্থের ঐতিহাসিক পাহারাদার হিসেবে তো গ্র্যান্ড রিপাবলিক রয়েছে। ডেমোক্রেটদের সেখানে কাজ কী?

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

[email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
সর্বশেষসর্বাধিক