X
সোমবার, ০৪ জুলাই ২০২২
১৯ আষাঢ় ১৪২৯

এক হাত পরীর, অন্য হাত কার?

আপডেট : ২৪ আগস্ট ২০২১, ১৬:৫৪

রেজানুর রহমান তবু ভালো একজন শিল্পীর জন্য আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গন কিছুটা হলেও সরব হয়েছে। ধরা যাক পরীমণি গ্রেফতার হয়নি। তাহলে সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে নিয়ে কি এতটা আলোচনা হতো? যেখানেই যাই সেখানেই পরীমণিকে নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা শুনি। মুখরোচক গল্পের ডালপালা যেন বেড়েই চলছে। এতদিন যারা পরীমণির এতটুকু সঙ্গ পাবার জন্য মুখিয়ে থাকতেন, একটু ছোঁয়া পেলেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ট্যাটাস দিতেন, ভাবটা এমন পরীমণির সঙ্গে দেখা হওয়া মানেই বিরাট একটা সৌভাগ্য... আজ তারাই পরীমণিকে এড়িয়ে চলছেন!

কারও কারও কাছে পরীমণি যেন একটা ভীতিকর নাম! প্রচার  মাধ্যমেই দেখলাম পরীমণির সঙ্গে যাদের যোগাযোগ ছিল, পরীর সঙ্গে যাদের অন্তরঙ্গ ছবি আছে তাদের নাকি ভয়ভীতিও দেখানো হচ্ছে। ফোন করে নাকি বলা হচ্ছে ‘কিছু মালপানি ছাড়েন। তা না হলে পরীর সঙ্গে আপনার অবৈধ সম্পর্ক ফাঁস করে দেবো!’ ফলে লাজলজ্জা ও অপমানের ভয়ে সমাজের উচ্চবিত্তদের অনেকে নাকি আতঙ্কগ্রস্ত জীবনযাপন করছেন। পরীমণি এখন সবার কাছে মুখরোচক গল্প! ঘৃণা, বিদ্বেষেরও গল্প। পরীমণি ভয় ছড়ানো নাম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরীমণিকে ঘিরে অশ্লীল অশোভন মন্তব্যের পাহাড় জমেছে। ভাবটা এমন, একা একটি মেয়েই যেন আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে কলঙ্কিত, বিতর্কিত করেছে। পরীমণি 'রাতের রানি'। রানি থাকলে রাজাদের কথাও আসে। রাজা ছাড়া রানির গল্প জমে না। কিন্তু পরীমণির গল্পে শুধুই রানিকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা!

বুঝলেন, রানিটা ভালো না, তার চরিত্র খারাপ, উজির নাজির পাইক পেয়াদা সবাইকে সে নষ্ট করেছে। রানি একাই সবাইকে নষ্ট করলো। রাজা, উজির, নাজির, পাইক পেয়াদা কারও কোনও দোষ নেই। রানি খারাপ। আর সবাই ভালো।

যেখানেই যাই একটাই আলোচনা শুনি। ভাই পরীমণির শেষ পর্যন্ত কী হবে? এক আড্ডায় একজন বয়স্ক ব্যক্তি আমাকে দেখে অতি উৎসাহী হয়ে এগিয়ে এলেন। ভাই, বলেন তো পরীমণির লেটেস্ট খবর কী? মেয়েটার দুই একটা ফিল্মের নাম বলেন তো! আজকাল বাংলা সিনেমা দেখি না। তাই জানিও না কে নায়ক কে নায়িকা। হঠাৎ দেখি পরীমণির নামের একজন নায়িকাকে নিয়ে বেশ হইচই হচ্ছে। উনি কি ভাই আমাদের দেশের সিনেমার বড় নায়িকা? চেহারাটা কিন্তু ফার্স্টক্লাস। ভাই আমাকে একটা কথার জবাব দেন তো, চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি নাকি পরীমণিকে বয়কট করেছে? এইটা কিন্তু ভাই ঠিক হয়নি।  পরীমণি যদি কোনও দোষ করেই থাকে তার দায়িত্ব কি ভাই আপনাদের শোবিজ না কি যেন বলে... তার ওপর বর্তায় না?

ভদ্রলোক প্রায় এক নিশ্বাসে প্রশ্নগুলো করলেন। কিন্তু তার প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব তো আমার কাছে নেই। তবে এই প্রশ্নগুলো আমারও। ধরে নিলাম পরীমণি খারাপ। কিন্তু গ্রেফতারের আগে তো ভালো ছিল। পরীমণি সিনেমার নায়িকা। আমাদের দেশে সেই অর্থে সিনেমা নেই বললেই তো চলে। সিনেমা নেই মানে তো নায়ক নায়িকার আয়-রোজগারের উৎসও নেই। অথচ পরীমণির জীবনযাত্রা অনেকটা রাজরানির মতোই। আগে পেয়াদা। পিছেও পেয়াদা। পরীমণির কী চাই?

শুধু মুখে বলার অপেক্ষা। কখনও কখনও ইশারাই যথেষ্ট। আলাউদ্দীনের দৈত্য এসে হাজির হতো! এই দৈত্যকে কে বা কারা পাঠাতো? পরীমণির এক বা একাধিক দৈত্য ছিল বলেই না তিনি এত শান শওকতের মালিক হয়েছেন। পরীমণি কারাগারে, দৈত্যরা কি তাহলে পার পেয়ে যাবে?

ইতোমধ্যে তিন দফা রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে পরীমণিকে। কাশিমপুর মহিলা কারাগার থেকে ঢাকার আদালতে আনা হচ্ছে। কড়া পুলিশ পাহারা। প্রচারমাধ্যমের হুমড়ি খাওয়া তোড়জোড়। নায়িকাকে দেখার প্রতিযোগিতায় শামিল হচ্ছেন সম্মানিত আইনজীবীরাও। মাননীয় আদালত এ ব্যাপারে বক্তব্যও দিয়েছেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে পরীমণি এখন নিষিদ্ধ সংবাদের অংশ। প্রকাশ্যে ঘৃণা তার প্রতি। আড়ালে তার প্রতি গভীর আগ্রহ। এই আগ্রহ যত না মেয়েটির প্রতি মায়ার, তার চেয়ে বেশি কামাতুর সৌন্দর্য দেখার। ‘আহারে! এত সুন্দরী একটি মেয়ে। তার আজ একি দশা?

যেখানেই যাই সেখানেই একটি প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। ভাই পরীমণি কি এখনও দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন? তার আগেই কেন চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলো? আবার এ ধরনের প্রশ্নও অনেকে করছেন, পরীমণির অর্থ, বিত্তবৈভব এবং মাদক সম্পর্কিত নানান প্রশ্ন উঠেছে। এক হাতে কি তালি বাজে? ধরা যাক পরীমণির একটি হাত। অন্য হাতগুলো কার?

দিন যত যাচ্ছে পরীমণির ব্যাপারে সাধারণ মানুষের মনে ততই নানান প্রশ্নের উদ্রেক হচ্ছে। সবার মনে কমন একটাই প্রশ্ন- পরীমণিরা যদি রাতের রানি হয় তাহলে রাতের রাজারা কে বা কারা? রাতের রানির বিচার হলে রাতের রাজাদেরও বিচার হওয়া দরকার।

বাংলা ট্রিবিউনেই একটি খবর দেখলাম। এর আগে অনৈতিক, বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে বিশিষ্ট অভিনেতা ডিপজল, আহমেদ শরীফ ও নায়ক রুবেলের বিরুদ্ধেও  নাকি আদালতে মামলা হয়েছে। কারাগার বাস করেছেন কেউ কেউ। কিন্তু তাদের ব্যাপারে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি কোনও ব্যবস্থা নেওয়া তো দূরের কথা, কোনও সভায় এ নিয়ে আলোচনাও করেনি। তাহলে পরীমণির ব্যাপারে এত তড়িঘড়ি ব্যবস্থা কেন? এ ধরনের প্রশ্নও বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে।

লেখার শুরুতে যে কথাটি উল্লেখ করেছিলাম শেষেও আবার পুনর্ব্যক্ত করতে চাই। পরীমণির আলোচনা না থাকলে সত্যি সত্যি মনে হতো এই দেশে নাটক, গান, চলচ্চিত্র কিছুই নাই। পরীমণির সুবাদেই না কিছুটা হলেও বিষয়গুলো আলোচিত হচ্ছে। আমরা কথায় কথায় বলি, শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিকাশের ওপরই একটি দেশের উন্নয়ন-অগ্রযাত্রা মর্যাদাবান হয়। কিন্তু দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এখন ঘরবন্দি। সংস্কৃতির দুয়ারও বন্ধ। জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে সবকিছু খুলেছে। শুধু খোলেনি স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় আর সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। এর জবাব কী?

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক- আনন্দ আলো।

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
ফের হ্যাঙ্গারে সংঘর্ষ, বিমানের দুই উড়োজাহাজে ক্ষতিগ্রস্ত
ফের হ্যাঙ্গারে সংঘর্ষ, বিমানের দুই উড়োজাহাজে ক্ষতিগ্রস্ত
রেষারেষিতে চাপা দেওয়ার ঘটনায় বাসচালক আটক
রেষারেষিতে চাপা দেওয়ার ঘটনায় বাসচালক আটক
নারায়ণগঞ্জে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্নকালে হামলা, দোষীদের আইনের আওতায় আনা হবে
নারায়ণগঞ্জে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্নকালে হামলা, দোষীদের আইনের আওতায় আনা হবে
আগ্রাসী ব্যাটিংয়ে শুরু ওয়েস্ট ইন্ডিজের
আগ্রাসী ব্যাটিংয়ে শুরু ওয়েস্ট ইন্ডিজের
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ