ইরানিরা এসে মুঘলদের রাজদরবারে আমলা বাহিনীর নেতৃত্ব দেয়। সেই আড়াইশ’ বছর ধরেই ফারসি ভাষা না জানার কারণে ফারসি আমলারা ভারতীয়দের রাজকাজে অংশ নেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে। এরপর ব্রিটিশ আমলে সরকার ও প্রশাসনে কাজ করতে পারেনি বাঙালি মুসলমান। কারণ, তাদের ছিল ইংরেজি শিক্ষা ও দক্ষতার অভাব। যেসব কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি ওঠে তার মধ্যে এটিও ছিল অন্যতম।
ব্রিটিশরা ভারত ছেড়ে যাওয়ার সময় ধর্মের দোহাই দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় পাকিস্তান। তবে বাঙালিদের রাষ্ট্রের উন্নয়ন অংশীদারিত্ব থেকে দূরে রাখার আয়োজন করে পাকিস্তানিরা। রাষ্ট্রের শাসনে ও প্রশাসনে মাতৃভাষা বাংলাকে অক্ষম ও অকার্যকর করে রাখার নীলনকশা করে তারা। মাতৃভাষা রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যবহার না হলে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক উন্নয়নের দাবি স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা যাবে না। ফলে, দাবি দুর্বল হয়ে পড়বে এমন ছক কষেছিল পাকিস্তানিরা।
একটি অসৎ উদ্দেশ্য নিয়েই বাংলা ভাষাকে ফাঁদে ফেলার কৌশলে ফের বাঙালিকে পেছনে ফেলে রাখার পরিকল্পনা করে পাকিস্তানিরা। কিন্তু সফল ভাষা আন্দোলন সে উদ্দেশ্যকে ব্যর্থ করে দেয়।
ভাষা আন্দোলনের অনন্য সফলতা একটি সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক আন্দোলনের বীজ বপন করে। সেই বীজের বৃক্ষই আজকের বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা এবং বিশ্ব দরবারে ইমার্জিং টাইগার বা এশীয় অর্থনীতির ‘উদীয়মান বাঘ’। সুতরাং নিছক বাংলায় কথা বলার দাবিতেই হয়েছিল ভাষা আন্দোলন, বিষয়টি কিন্তু এমন ছিল না। রাষ্ট্রযন্ত্রে বাঙালির মালিকানা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম, সম্মান প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এবং দীর্ঘমেয়াদে সমৃদ্ধ জাতি প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের সূচনা ছিল সেটি।
প্রশ্ন জাগে একবিংশ শতাব্দীতে এসে ভাষা বিজয়ের দিবসটি কি শুধুই কি একটি উদযাপনে আবদ্ধ করে ফেলেছি আমরা? ভাষার উপযুক্ত ব্যবহার, অর্থনীতি, প্রযুক্তিসহ দৈনন্দিন জীবন সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রয়োজন মেটানোর জন্য ভাষা হিসেবে সম্পূর্ণ সক্ষম করতে পেরেছি? আমাদের সংবিধানে লেখা আছে, বাংলা হবে আমাদের রাষ্ট্রভাষা। এটুকুই কি সব? এই সংক্ষিপ্ত ঘোষণাই কি ভাষার অর্থনৈতিক, প্রাযুক্তিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবহার এবং সার্থকতা নিশ্চিত করতে যথেষ্ট? মোটেই তা না।
যে দেশের, মানুষ রক্ত দিয়ে ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করেছে সেই রাষ্ট্রে এখনও জাতীয় ভাষানীতি তৈরিই হয়নি। ভাষার কার্যকর ও প্রায়োগিক ব্যবহার পরিকল্পনাও তৈরি করা যায়নি। কেন? এখন তো মধ্য এশিয়া থেকে এসে ক্ষমতা নেওয়া মুঘলরা নেই, সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপার থেকে আসা ব্রিটিশরাও এখন নেই, এমনকি উর্দুভাষী পাকিস্তানিরাও চলে গেছে।
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে একসময় সূর্য অস্ত যেত না তাই ইংরেজি হয়ে ওঠে বিশ্বভাষা। এরপর বর্তমান বিশ্বের রাজনৈতিক এবং সামরিক মোড়ল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান ভাষা ইংরেজি হওয়ার কারণেই ইংরেজির দাপট স্থায়ী হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র অর্থনীতি কয়েক দশক ধরেই বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতি হয়ে আছে সেটিও ইংরেজির মুকুট ধরে রাখতে সহায়ক হয়েছে।
এখন বিশ্বের আরেক বড় অর্থনীতির দেশ চীন। যারা ইংরেজিকে উপেক্ষা করছে না তবে তাদের ভাষার মর্যাদা ধরে রেখেছে। তাদের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করার জন্য অন্য ভাষাভাষীরাও আজকাল চীনা ভাষা শিখছে। এশিয়ার অর্থনৈতিক শক্তি জাপান ও কোরিয়া এবং ইউরোপে জার্মানি, ফ্রান্সও তাদের নিজেদের ভাষার অর্থনৈতিক, প্রাযুক্তিক ব্যবহারের সক্ষমতা উন্নয়ন করে মর্যাদা ধরে রেখেছে। আমরা তো কখনোই শুনিনি বা দেখিনি অন্য দেশ থেকে এ দেশে বাণিজ্য বা চাকরি করতে আসার আগে বাংলা শিখে আসে! কেন আমরা এতটা পিছিয়ে? কেন আমরা বাংলাকে মর্যাদার আসনে বসাতে পারিনি?
বাংলাদেশের অর্থনীতি বিশ্বে ৩৯তম এবং দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয়, এই দেশ এখন বিশ্বের ৭ম দ্রুত উন্নয়নশীল দেশ। তবে এখনই বিশ্বে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক শক্তি প্রভাব বিবেচনা করে বিশ্বের সবাই বাংলা শেখার প্রয়োজন বোধ করবে তা ভেবে ফেলার কারণ নেই। তবে আমরা যেন আমাদের ভাষার মর্যাদা দিতে শিখি। আমরা যেন আমাদের দেশে বাণিজ্য করতে আসা বা চাকরি করতে আসা কাউকে বাংলা শিখতে উদ্বুদ্ধ করি। নিয়োগদাতা হয়েও বাংলাদেশিদের যেন ইংরেজি ভাষা, বা চীনা ভাষা শিখে তাদের সঙ্গে কথা না বলতে হয়।
তবে বাংলা ভাষা বিজয়ের দিন বা ২১শে ফেব্রুয়ারি বিশ্ব মাতৃভাষা দিবস। এটি বাংলা ভাষার ব্যবহারিক আন্তর্জাতিকায়নের একটি বড় প্রয়োজনীয়তা তৈরি করেছে। বাংলাদেশ বাংলা ভাষার অভিভাবক, তাই এ দেশের ওপরই এটি বাস্তবায়নের দায়িত্বও পড়েছে।
বাংলা বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম ভাষা। বাংলাদেশ বিশ্বের ৬০টিরও বেশি দেশের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বাণিজ্য করে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রফতানিকারক দেশ বাংলাদেশ। বাংলাদেশি ৭০ লাখেরও বেশি শ্রমশক্তি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে আছে। জাতিসংঘ শান্তি মিশনে বিভিন্ন দেশে সর্বাধিক সৈন্য প্রেরণকারী দেশ। তাই বাংলা ভাষার ব্যবহারিক আন্তর্জাতিকায়ন কোনও স্বপ্ন নয়, এটি প্রয়োজন হয়ে উঠছে। বাংলা ভাষার অভিভাবক বাংলাদেশকেই সে প্রয়োজন মেটানোর দায়িত্ব পালন করতে হবে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলা ভাষা শিক্ষা কার্যক্রমে উৎসাহ দেওয়া, সাংস্কৃতিক সম্পর্ক উন্নয়নে কর্মসূচিতে বিভিন্ন দেশে বাংলা শিক্ষা কার্যক্রমে উৎসাহ দিতে পারে আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এতে সহযোগী হতে পারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
বাংলা ভাষার ব্যবহারিক আন্তর্জাতিকায়ন বাংলাকে হয়তো ইংরেজির মতো বিশ্বভাষা করে ফেলতে পারবে না, তবে এতে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং হবে এবং বিশ্বদরবারে আমাদের জাতীয় মর্যাদা বাড়াবে। এতে বৈদেশিক বাণিজ্য এবং রাষ্ট্রসমূহের সঙ্গে আমাদের বহুমুখী অর্থনৈতিক সম্পর্কেও মূল্য সংযোজন হবে।
লেখক: অর্থনৈতিক সংবাদ ও অনুষ্ঠান উপস্থাপক, একাত্তর টিভি




