বাংলাদেশের ম্যালেরিয়া নির্মূল লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন কতদূর?

ড. কবিরুল বাশার
২৫ এপ্রিল ২০২৩, ১২:৫১আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০২৩, ১৬:২৪

প্রতি বছর ২৫ এপ্রিল বিশ্ব ম্যালেরিয়া দিবস হিসেবে উদযাপিত হয়ে থাকে। ২০২৩ সালে এই দিবসটি প্রতিপাদ্য হলো– “Time to deliver zero malaria: invest, innovate, implement.” (বিনিয়োগ, উদ্ভাবন, বাস্তবায়নের মাধ্যমে শূন্য ম্যালেরিয়া অর্জন)। বিশ্বের মানুষকে ম্যালেরিয়ার বাহক ও ম্যালেরিয়া রোগ সম্পর্কে সচেতন করা এবং ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য এ দিবসটি পালিত হয়ে থাকে। 

মশাবাহিত রোগ ম্যালেরিয়া জনস্বাস্থ্যের অন্যতম শত্রু। পৃথিবীতে ২০২১ সালে এটি ৬,১৯,০০০ মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছিল, যাদের মধ্যে প্রায় ৯৬% আফ্রিকায়। মশাপ্রবণ পরিবেশে এটি সারস-কোভ-২-এর ওমিক্রনের তুলনায় ৬-২০ গুণ বেশি ছড়িয়ে পড়ে। ১৬০০-এর দশকে এই রোগটি আমেরিকার মধ্য ছড়িয়ে পড়ে এবং উত্তরে আর্কটিক উপকূল পর্যন্ত এবং পূর্বে জাপান পর্যন্ত পৌঁছেছিল। কিন্তু আমরা এখন রোগ নির্মূলের দিকে অগ্রগতির পর ম্যালেরিয়াজনিত অসুস্থতা এবং মৃত্যু থেকে প্রতি বছর কমে আসছে।

বাংলাদেশেও মশাবাহিত রোগের মধ্যে অন্যতম হলো ম্যালেরিয়া। অ্যানোফিলিস মশার সাতটি প্রজাতি বাংলাদেশে ম্যালেরিয়া রোগ ছড়ায়।  এরমধ্যে চারটি প্রজাতিকে প্রধান বাহক বলা হয়। বাংলাদেশের পার্বত্য জেলা এবং বর্ডার এরিয়ার মোট ১৩ জেলায় ৭২টি উপজেলায় ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। ২০০০ সালের পর সবচেয়ে বেশি ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব দেখা যায় ২০০৮ সালে। ২০০৮ সালে ৮৪ হাজার ৬৯০ জন মানুষ ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয় এবং ১৫৪ জন মারা যায়। ২০১৯ সালে বাংলাদেশে এই সংখ্যাটি কমে রোগী হয় ১৭ হাজার ২২৫ জনে। ২০২২ সালে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ১৮ হাজার ১৯৫ জন লোক চিকিৎসা নিয়েছে এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে ১৪ জন লোক মারা গেছেন। ম্যালেরিয়ার বাহক অ্যানোফিলিস মশা গ্রীষ্ম-বর্ষায় বেশি জন্মায় এবং এই সময়ে রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি হয়। 

বাংলাদেশের তিনটি পার্বত্য জেলা বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে ম্যালেরিয়া রোগের প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে বেশি। এই তিনটি জেলার মধ্যে বান্দরবান জেলার তিনটি উপজেলা লামা, আলীকদম ও থানছি সবচেয়ে বেশি ম্যালেরিয়া ঝুঁকিতে। আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের থেকে ম্যালেরিয়া নির্মূলের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এবং গ্লোবাল ফান্ডের আর্থিক সহায়তায় জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচি বছরব্যাপী কাজ করে যাচ্ছে। 

ম্যালেরিয়া রোগের পাশাপাশি পৃথিবীতে অনেক সংক্রামক রোগ পুনরায় আবির্ভূত হচ্ছে এবং হবে। আদিকাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত সংক্রামক রোগ মানবজাতির জন্য হুমকি হয়ে আসছে। প্রাচীনকালে বাইবেলের প্লেগ এবং এথেন্সের প্লেগ থেকে শুরু করে মধ্যযুগের ব্ল্যাকডেথ, ১৯১৮ সালের ‘স্প্যানিশ ফ্লু’ মহামারি এবং অতি সম্প্রতি ডায়রিয়া ও এইচআইভি/এইডস, ডেঙ্গু,  জিকা, চিকুনগুনিয়া মহামারি, সংক্রামক রোগগুলো ক্রমাগতভাবে উত্থিত এবং পুনরুত্থিত হয়েছে। এই রোগগুলোর পুনরুত্থান রোগের প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে সব অনুমানকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। 

বাংলাদেশ তো বটেই, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বেশ কিছু রোগ জনস্বাস্থ্যের প্রধান সমস্যা। কিছু কিছু রোগ সাম্প্রতিক সময়ে বড় সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ভৌগোলিক এবং অর্থনৈতিক পটভূমি কিছু রোগের বিস্তার এবং সংক্রমণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং রোগের প্যাথফিজিওলজি ভালোভাবে না জানার কারণে কিছু কিছু রোগ পুনরায় ফিরে আসছে। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আবহাওয়া, নাগরিকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা কম এবং জীবনযাত্রার মান নিম্ন হওয়ায় বাংলাদেশের মতো মধ্যম এবং নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে সংক্রামক রোগের প্রকোপ বেড়ে চলেছে। 

লেশম্যানিয়াসিস, ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, ইত্যাদি রোগ বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্যের প্রধান উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং বহু মানুষের অসুস্থতা এবং মৃত্যুর কারণে হুমকির হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্লেগ পুনরায় আবির্ভূত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ, এটি ভারতীয় উপমহাদেশে হয়েছিল, যা মানুষের অসুস্থতা, মৃত্যু এবং বাণিজ্য ঘাটতিতে বিশাল প্রভাব ফেলেছিল। আমাদের দেশে লেপ্টোস্পাইরোসিস ধরা পড়েনি শুধুমাত্র সচেতনতার অভাবে।

নতুন এবং পুনরুত্থিত জীবাণু হুমকি বিশ্বব্যাপী জনস্বাস্থ্য এবং সংক্রামক রোগ গবেষণা সম্প্রদায়কে চ্যালেঞ্জ করে চলেছে, নতুন উদীয়মান প্যাথোজেন, যেমন, গুরুতর তীব্র শ্বাসযন্ত্রের সিন্ড্রোম-সম্পর্কিত করোনাভাইরাস (SARS-CoV), হেনিপাভাইরাস (হেন্দ্রা এবং নিপা), এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস এবং অতি সম্প্রতি সোয়াইন ফ্লু (H1N1) মহামারিতে বিবর্তনের হুমকির সঙ্গে মানুষের অসুস্থতা ও মৃত্যুর কারণ হয়েছে। গত এক দশক ধরে মাইকোব্যাকটেরিয়াম যক্ষ্মা রোগের মতো সাধারণ জীবাণুর স্ট্রেনগুলো ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে, যা একসময় এর বিরুদ্ধে কার্যকর ছিল। এই ধরনের অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল-প্রতিরোধী অণুজীব, প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে, যেটি জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি। নতুন উদ্ভাবনী চিকিৎসা পদ্ধতি, ভ্যাকসিন এবং অন্যান্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে নতুন অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল এজেন্টগুলো নিয়ন্ত্রণের জন্য গবেষণা করা প্রয়োজন। 

সম্প্রতি বাংলাদেশে চিকুনগুনিয়ার প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। এটি একটি বড় হুমকি এবং বাংলাদেশে একটি প্রধান জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ঢাকা, ঢাকা জেলার দোহার ও নবাবগঞ্জ এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জেও চিকুনগুনিয়া জ্বরের প্রাদুর্ভাব পাওয়া গেছে। ২০১৭ সালে ঢাকাতে এটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। 

পুনরুত্থিত সংক্রামক রোগগুলো মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে অন্যান্য সংক্রামক রোগগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও গত এক দশকে সংক্রামক রোগের কারণে বার্ষিক মৃত্যু এবং জীবন হারানোর হার কমেছে। তবে বিশ্বব্যাপী সংক্রামক রোগের প্রভাব যথেষ্ট রয়ে গেছে। সামগ্রিকভাবে, সংক্রামক রোগ বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ হিসেবে রয়ে গেছে।

গবেষক, বিজ্ঞানী ও ওষুধ তৈরি প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলেই সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম হলো ভ্যাকসিন আবিষ্কার। মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি এবং জীবনযাত্রার মানের উন্নয়ন, এই অগ্রগতির আরেকটি কারণ। তবে এখনও অনেক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। মিউটেশন এবং বিবর্তনের মাধ্যমে ভাইরাস পরিবর্তিত  হয়ে দিন দিন অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে। 

আমরা ধরে নিতে পারি জীবাণুর অসাধারণ অভিযোজন ক্ষমতা কখনও শেষ হবে না। সফলভাবে এই জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করতে আমাদের জোরালোভাবে মৌলিক গবেষণা জোরদার করতে হবে। গবেষণার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে প্রস্তুতি রাখতে হবে যেন যেকোনও ধরনের রোগ আক্রমণকে মোকাবিলা করা যায়। 

ম্যালেরিয়া সমস্যাকে সমাধান করতে পারে এমন কোনও একক হাতিয়ার বর্তমানে নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাই এ বিষয়ে বিনিয়োগ এবং উদ্ভাবনের আহ্বান জানাচ্ছে, যা ম্যালেরিয়া সমস্যা সমাধানে নতুন দিগন্তের সূচনা করবে। এ বছরের প্রতিপাদ্যে ম্যালেরিয়া বাহক মশা নিয়ন্ত্রণে আধুনিক প্রযুক্তি ও নতুন ওষুধ উদ্ভাবনের ওপরে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। 

বাংলাদেশের ম্যালেরিয়া নির্মূল লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে গেলে পার্বত্য জেলা বান্দরবানের তিনটি দুর্গম উপজেলার প্রতিটি ঘরে ঘরে ম্যালেরিয়ার সচেতনতা এবং চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে হবে। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে ম্যালেরিয়া আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগী জুম চাষি ও কাঠুরে। এই পেশার লোকজন দিনে বা রাতে পাহাড়ি জঙ্গলে কাজ করে বলে তারা আক্রান্তের ঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি। কীটনাশকযুক্ত মশারি দিয়ে এই পেশার লোকদের রক্ষা করা কঠিন। এরা যেন মশার কামড়ের মাধ্যমে ম্যালেরিয়া আক্রান্ত হতে না পারে সেই জন্য আধুনিক এবং নতুন কৌশল এবং তার বাস্তবায়ন করতে হবে। সেই ক্ষেত্রে তাদের মশা প্রতিরোধী ক্রিম, লোশন বা পোশাকের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। 

আজ ১৬তম বিশ্ব ম্যালেরিয়া দিবস এবং এই অঞ্চলের মানুষের জীবনমান এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে ম্যালেরিয়ার বিধ্বংসী প্রভাবের থেকে নিজেদের রক্ষার উপযুক্ত সময়। সরকার, দাতা সংস্থা, স্বাস্থ্য অধিদফতর, এনজিও, গবেষক ও নাগরিকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে ম্যালেরিয়া নির্মূল করা সম্ভব । 

লেখক: অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ; প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

ইমেইল: [email protected]  

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
সর্বশেষসর্বাধিক