টেকসই উন্নয়ন ও বৈশ্বিক বিনিয়োগ: বাংলাদেশের করণীয়

ড. সুলতান মাহমুদ রানা
১০ আগস্ট ২০২৫, ২১:০২আপডেট : ১০ আগস্ট ২০২৫, ২১:০২

বিশ্ব আজ এক অভূতপূর্ব সংকটের মুখোমুখি। অর্থনৈতিক বৈষম্য ক্রমেই বাড়ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত তীব্র হচ্ছে। আর উন্নয়নশীল দেশগুলোকে টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিতে যে বিপুল সম্পদের প্রয়োজন, তা সরকারগুলো একা মেটাতে পারছে না। অ্যারিস্টটল একসময় বলেছিলেন, “দারিদ্র্যই বিপ্লব ও অপরাধের উৎস।” আজকের পৃথিবী তার বাস্তব প্রমাণ। বৈষম্য ও বঞ্চনা রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা বাড়ায়, সংঘাত ও হতাশার জন্ম দেয়। ইতিহাস বারবার এই শিক্ষা দিয়েছে।

বর্তমান বিশ্বে উন্নয়নশীল দেশগুলোর টেকসই উন্নয়ন অর্জনের জন্য প্রতি বছর প্রায় ৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার দরকার। কিন্তু শুধু সরকারি সম্পদ দিয়ে তা মেটানো সম্ভব নয়। কোভিড-১৯ মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মতো ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং জলবায়ু বিপর্যয় ২০১৫ থেকে ২০২৫-এর মধ্যে বৈশ্বিক অগ্রগতিকে উল্টো পথে ঠেলে দিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালে উন্নয়নশীল দেশে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (FDI) ছিল মাত্র ৪৩৫ বিলিয়ন ডলার, ২০০৫ সালের পর যা সর্বনিম্ন। এটি ওই দেশগুলোর গড় জিডিপির মাত্র ২.৩%।

এই ঘাটতি পূরণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এখন আর কেবল নৈতিক দায় নয়, বরং কৌশলগত প্রয়োজন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) ‘Global Gateway’ উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে একটি বড় উদাহরণ। এই কর্মসূচি সরকারি তহবিল, দীর্ঘমেয়াদি ঋণ এবং অনুদানের মাধ্যমে ঝুঁকি হ্রাস করে বেসরকারি মূলধনকে উন্নয়ন প্রকল্পে বিনিয়োগে উৎসাহিত করছে। যেমন, ‘Better Futures Programme’- এর অধীনে ইউরোপীয় কমিশন ও আন্তর্জাতিক ফাইন্যান্স করপোরেশনেরর মধ্যে ২৯১ মিলিয়ন ইউরোর গ্যারান্টি চুক্তি হয়েছে, যা এক বিলিয়নের বেশি বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করবে।

সম্প্রতি ইইউ ও ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক ৫ বিলিয়ন ইউরোর নতুন ফ্লেক্সিবল গ্যারান্টি ঘোষণা করেছে, যা ১০ বিলিয়ন ইউরো পর্যন্ত বিনিয়োগ আনলক করতে সক্ষম হবে। এর সুবিধা শুধু বড় প্রকল্পেই নয়, বরং স্থানীয় ও ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানগুলোও সরাসরি পাবে। আফ্রিকায় ইতোমধ্যে ‘Team Europe’ ৯৯টি প্রকল্প চালু করেছে- বুজ শক্তি, ডিজিটাল যোগাযোগ, স্বাস্থ্য ও হাইড্রোজেন উদ্ভাবনকে কেন্দ্র করে। এই প্রকল্পগুলো ২০ বিলিয়ন ইউরোর বেশি বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি পেয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ‘Blue Raman’  সাবমেরিন ক্যাবল প্রকল্প ইউরোপ-ভারত-আফ্রিকা ডিজিটাল সংযোগে ৪০০ মিলিয়ন ইউরো বিনিয়োগ করছে। একই সঙ্গে ‘Investing in Young Businesses in Africa’ নামের ৪ বিলিয়ন ইউরোর একটি কর্মসূচি তরুণ ও নারী উদ্যোক্তাদের সহায়তা দিচ্ছে।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য এই ধারা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল বা মালদ্বীপ- সব দেশই জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাবের মধ্যে রয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড় এবং উপকূলীয় ভূমি হারানো আগামী দশকে বিশাল অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করবে। শুধু অবকাঠামো ও পুনর্বাসনেই নয়, কৃষি, জ্বালানি ও শিল্প খাতেও টেকসই বিনিয়োগ অপরিহার্য হয়ে উঠবে।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে ৪০ শতাংশ নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদনের লক্ষ্য ঘোষণা করেছে। কিন্তু বাস্তবায়নে বিশাল অর্থনৈতিক ঘাটতি রয়েছে। সরকারি বাজেট সীমিত, আর আন্তর্জাতিক অনুদান বা রেয়াতি ঋণও চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নয়। এখানে ইউরোপের ‘Global Gateway’ ধরনের অংশীদারত্ব বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয় হতে পারে। যেমন, যদি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, স্টার্টআপ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে বিদেশি বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা যায়, তাহলে শুধু উন্নয়নই নয়, কর্মসংস্থানও বাড়বে।

বাংলাদেশের জন্য করণীয় হিসেবে যে বিষয়গুলো গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে, সেগুলো হলো- (১) বিদেশি বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের জন্য কর সুবিধা, সহজ শুল্কনীতি ও দ্রুত অনুমোদন ব্যবস্থা তৈরি করা; (২) ইউরোপের মতো গ্যারান্টি বা বিমা তহবিল তৈরি করে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা; (৩) নবায়নযোগ্য জ্বালানি, স্মার্ট কৃষি ও উপকূলীয় অবকাঠামোকে মূল ফোকাস করার ব্যবস্থা গ্রহণ; এবং (৪) BIMSTEC  এবং SAARC-এর মতো আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মে যৌথ বিনিয়োগ প্রকল্পের সুযোগ তৈরি করা।

বাংলাদেশ যদি এখন থেকেই বেসরকারি মূলধন আকর্ষণ ও ঝুঁকি ভাগাভাগির কৌশল তৈরি করে, তাহলে ভবিষ্যতে এই ধরনের আন্তর্জাতিক তহবিল থেকে বড় সুবিধা নেওয়া সম্ভব হবে বলে ধারণা করা যায়। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বিশ্বব্যাপী বৈষম্য, জলবায়ু বিপর্যয় ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। উন্নয়নশীল দেশগুলোকে এখন বুঝতে হবে, টেকসই উন্নয়ন আর কেবল জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয় নয়, এটি বৈশ্বিক কৌশলগত চাহিদা। বাংলাদেশ যদি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বেসরকারি মূলধনকে কাজে লাগাতে পারে, তবে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের মাঝেও দেশের জন্য এক নতুন উন্নয়নের দিগন্ত উন্মোচিত হবে।

লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

[email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
বিএসইসির চেয়ারম্যান রাশেদ মাকসুদ ও ৪ কমিশনারের পদত্যাগ
বিএসইসির চেয়ারম্যান রাশেদ মাকসুদ ও ৪ কমিশনারের পদত্যাগ
দাম বৃদ্ধির একদিন পরই লাইফলাইন গ্রাহকদের জন্য রিভিউ আবেদন
দাম বৃদ্ধির একদিন পরই লাইফলাইন গ্রাহকদের জন্য রিভিউ আবেদন
ফোনালাপ ফাঁসের পর বদলি করা হলো জেল সুপারকে
ফোনালাপ ফাঁসের পর বদলি করা হলো জেল সুপারকে
সর্বশেষসর্বাধিক