বাংলাদেশে গত দুই দশকে পানি, স্যানিটেশন এবং স্বাস্থ্যবিধি (ওয়াশ) খাতে অভাবনীয় অগ্রগতি হয়েছে। মৌলিক পানীয় জলের প্রায় সর্বজনীন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। এই সাফল্য বাংলাদেশকে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গেছে। তবে এই অগ্রগতির চিত্রটি সর্বত্র সমান নয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে দুর্গম (হার্ড-টু-রিচ) এলাকাগুলোতে ওয়াশ পরিষেবা এখনও যথেষ্ট পিছিয়ে রয়েছে। ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা, চরম দারিদ্র্য, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং সামাজিক বঞ্চনার মতো কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতাগুলো এসব এলাকার মানুষের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
দুর্গম বলতে শুধু দুর্গম পথ বা যোগাযোগহীনতাই নয়, যেসকল এলাকায় প্রতিকূল ভূতাত্ত্বিক অবস্থা এবং ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা দুর্বল থাকে, এবং এর ফলে উচ্চ শিশু মৃত্যুহার ও দারিদ্র্যের চক্র অব্যাহত থাকে, সেগুলোকে দুর্গম এলাকা হিসেবে এই সংক্রান্ত জাতীয় কৌশলপত্র – বাংলাদেশের দুর্গম এলাকায় পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়ন ২০১২-তে চিহ্নিত করা হয়েছে। চিহ্নিত এই এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে হাওর, বাওর, চর, উপকূলীয় অঞ্চল, পাহাড়, এর পাশাপাশি চা বাগান এবং শহরে নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর আবাসস্থলও বর্তমান প্রেক্ষাপটে দুর্গম এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে।
বরেন্দ্র অঞ্চলের মতো শুষ্ক এলাকায় সুপেয় পানির তীব্র সংকট রয়েছে। আবার উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা এবং হাওর-চর-পাহাড়ের মতো এলাকায় মৌসুমি পরিবর্তনের কারণে পানির উৎস প্রায়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর্সেনিক, আয়রন এবং ব্যাকটেরিয়াজনিত দূষণের কারণেও অনেক সময় পানির গুণগত মান খারাপ থাকে। বন্যা বা নদীভাঙনের কারণে ল্যাট্রিনগুলো ভেঙে যায় বা নষ্ট হয়ে যায়। শহরের নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল কিংবা চা বাগানগুলোতে প্রায়ই অস্বাস্থ্যকর ও ভাগাভাগি করে ব্যবহার করা টয়লেট দেখা যায়। এইসব স্থানগুলোয় নারী এবং কিশোরীদের জন্য মাসিক স্বাস্থ্যবিধি ব্যবস্থাপনার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই, বিশেষ করে স্কুল, কর্মস্থল এবং অন্যান্য অধিক জনসমাগম স্থানে এর অভাব লক্ষণীয়।
বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিধস এবং জলাবদ্ধতার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণেও ওয়াশ অবকাঠামো বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জলবায়ু-সহনশীল নকশার অভাব এবং দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ব্যবস্থার সঙ্গে দুর্বল সমন্বয়ের কারণে এসব অবকাঠামো সহজে ভেঙে পড়ে। অতিদরিদ্র পরিবারগুলোর পক্ষে উন্নত ওয়াশ পরিষেবা বা রক্ষণাবেক্ষণের খরচ বহন করা সম্ভব হয় না। দুর্গম এলাকায় পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় লজিস্টিক এবং উচ্চ খরচের কারণেও সমস্যা তৈরি হয়। সরকারি সংস্থা ও এনজিওগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব, অপর্যাপ্ত বাজেট এবং দুর্বল তদারকি ব্যবস্থা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রধান সমস্যা হলো খরা। এখানকার শক্ত মাটির কারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর খুব নিচে নেমে যায়। এই সমস্যা সমাধানে কৃত্রিমভাবে ভূগর্ভস্থ পানি রিচার্জ করার ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। এছাড়া, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা এবং খরা-সহনশীল ওয়াশ অবকাঠামো নির্মাণ করাও জরুরি। হাওর ও বিল এলাকার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো দীর্ঘস্থায়ী বন্যা এবং জলাবদ্ধতা। বর্ষার সময় এখানকার সবকিছু পানিতে ডুবে যায়, যার ফলে টয়লেট এবং পানির উৎসগুলো অকেজো হয়ে পড়ে। এই সমস্যা মোকাবিলায় উঁচু প্ল্যাটফর্মে নির্মিত ল্যাট্রিন, ভাসমান টয়লেট, এবং জলবায়ু-সহনশীল ওয়াশ অবকাঠামো তৈরি করতে হবে। শুষ্ক মৌসুমে ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত উত্তোলন বন্ধ করতে হবে এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থার মতো বিকল্প উৎস ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস এবং লবণাক্ততা উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। এই অঞ্চলের জন্য লবণাক্ততা-প্রতিরোধী এবং উঁচু ওয়াশ অবকাঠামো নির্মাণ করা প্রয়োজন। রিভার্স অসমোসিস (RO) প্ল্যান্টের মতো কমিউনিটি-ভিত্তিক প্রযুক্তি এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা কার্যকর সমাধান হতে পারে। পাহাড়ের দুর্গমতা এবং ভূমিধসের ঝুঁকি এখানকার ওয়াশ পরিষেবাকে কঠিন করে তোলে। এখানে গ্রাভিটি-ফেড সিস্টেমের (GFS) মতো পাহাড়ি অঞ্চলের জন্য উপযুক্ত পানি সরবরাহ ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যা মাধ্যাকর্ষণ ব্যবহার করে পানি সরবরাহ করে। এছাড়া, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ট্যাঙ্ক এবং বাঁশ বা ফেরোসিমেন্টের মতো স্থানীয় উপকরণ দিয়ে তৈরি কম খরচের টয়লেট ব্যবস্থা কার্যকরী হতে পারে।
চা বাগানের শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান খুব নিম্ন, এবং তারা প্রায়ই সামাজিক বঞ্চনার শিকার হন। ২০১২-এর কৌশলপত্রকে হালনাগাদ করে শ্রম আইন ২০১৫ অনুযায়ী বাগান মালিকদের ওয়াশ সুবিধা নিশ্চিত করতে বাধ্য করা বাঞ্ছনীয়। উন্নত ল্যাট্রিন, হাত ধোয়ার স্থান এবং মাসিক স্বাস্থ্যবিধি ব্যবস্থাপনার জন্য সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে। শহরের নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠির আবাসস্থলে ভূমি অধিকারের অনিশ্চয়তা এবং দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থা একটি বড় সমস্যা। তাদেরকে যথাযথভাবে ওয়াশ কর্মসূচির আওতায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থা তৈরি করা এবং ঢাকা ওয়াসা ও কমিউনিটি-ভিত্তিক সংগঠনগুলোর মাধ্যমে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় বৈধ সংযোগ স্থাপনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
প্রযুক্তির ক্ষেত্রে, অনেক প্রযুক্তি স্থানীয় পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং উচ্চ খরচের কারণে অকার্যকর হয়ে পড়ে। লিঙ্গ সমতা ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করাও একটি চ্যালেঞ্জ, কারণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীদের সীমিত অংশগ্রহণ এবং শারীরিক প্রতিবন্ধী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য অবকাঠামোর অপ্রতুলতা রয়েছে। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা কম, অপর্যাপ্ত বাজেট এবং আন্তসংস্থা সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। সবশেষে, অংশীজনদের মধ্যে সমন্বয়হীনতাও একটি বড় সমস্যা, যেখানে বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের মধ্যে দ্বৈততা এবং কমিউনিটির মতামতকে গুরুত্ব না দেওয়া হয়।
পাশাপাশি, আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে ওয়াশ পরিকল্পনা ও পরিচালনায় যুক্ত করা এবং বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-এর সাথে ওয়াশ কার্যক্রমের সমন্বয় বাড়ানো জরুরি। পার্বত্য অঞ্চলের প্রধান সমস্যা হলো দুর্গমতা, যেখানে যাতায়াত ব্যবস্থা অপ্রতুল এবং সুপেয় পানির উৎস প্রায় ৯০০ ফুটেরও বেশি গভীরে থাকে। এই অঞ্চলের জন্য গ্রাভিটি-ফেড সিস্টেমের মতো পাহাড়ি অঞ্চলের জন্য উপযুক্ত পানি সরবরাহ ব্যবস্থা চালু করা এবং বাঁশ বা ফেরোসিমেন্টের তৈরি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ট্যাঙ্ক ও ইকো-স্যানিটেশন টয়লেটের মতো কম খরচের প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে।
উপকূলীয় অঞ্চলে ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস এবং লবণাক্ততার কারণে ওয়াশ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। এখানে লবণাক্ততা-প্রতিরোধী এবং উঁচু ওয়াশ অবকাঠামো নির্মাণ করা এবং রিভার্স অসমোসিস প্ল্যান্টের মতো কমিউনিটি-ভিত্তিক প্রযুক্তিকে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। চরাঞ্চলের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো নদী ভাঙন ও ভূ-প্রাকৃতিক অস্থিতিশীলতা। এখানে নদীভাঙন থেকে ওয়াশ অবকাঠামো রক্ষায় ব্যবস্থা নেওয়া, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং উঁচু স্যানিটেশন ব্যবস্থার বিকল্পগুলো বাড়ানো দরকার। হাওর ও বিল অঞ্চলের প্রধান সমস্যা হলো দীর্ঘস্থায়ী বন্যা। এই অঞ্চলে বন্যাসহনশীল ওয়াশ অবকাঠামো, যেমন—উঁচু প্ল্যাটফর্মের ওপর ল্যাট্রিন তৈরি করা এবং বন্যার সময় কমিউনিটি ওয়াশ টিমের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
শুধু অবকাঠামো নয়, অধিকার: এটি শুধু কিছু নলকূপ বা টয়লেট তৈরির বিষয় নয়, বরং নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনকে মানুষের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়। আমাদের ভাবতে হবে, কেন দেশের কিছু মানুষ এই মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকবে? এবং এই লক্ষ্যে ২০১২-এর জাতীয় কৌশলপত্রটিকে হালনাগাদ করা অত্যন্ত জরুরি। হালনাগাদ প্রক্রিয়ায় এই কৌশলপত্রটিতে জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। ভুলে গেলে চলবে না যে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ওয়াশ অবকাঠামো বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হলে উন্নয়নের ধারাও ব্যাহত হবে। তাই, জলবায়ু-সহনশীল এবং অভিযোজনমূলক সমাধানকে অগ্রাধিকার দিয়ে এই কৌশলপত্রে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
হালনাগাদকৃত কৌশলপত্রে ওয়াশ খাতে শুধু সরকারি অনুদানের ওপর নির্ভর না করে বেসরকারি খাত এবং ক্ষুদ্রঋণ সংস্থার মাধ্যমে অর্থায়নের বিবেচনা করতে হবে। এই কৌশলপত্রটি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহ, সরকারি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, দপ্তর, অধিদপ্তর, এনজিও, এবং কমিউনিটির মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের উপর জোর দিতে হবে। এটি আমাদের ভাবতে বাধ্য করে যে, জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনও উন্নয়নই টেকসই হতে পারে না।
বাংলাদেশের দুর্গম অঞ্চলের জন্য এই সংশোধিত কৌশলপত্রটি যেন শুধুমাত্র একটি নীতিগত নথি নয়, বরং একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন হয়ে উঠতে পারে। এটি আমাদের যেন মনে করিয়ে দেয় যে, সত্যিকারের উন্নয়ন ততক্ষণ পর্যন্ত সম্ভব নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত না দেশের প্রতিটি নাগরিক, সে যত দুর্গম অঞ্চলেই থাকুক না কেন, মৌলিক পরিষেবাগুলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
এই কৌশলপত্রটিকে হালনাগাদ করে তার সফল বাস্তবায়ন হলে তা শুধু স্বাস্থ্য ও স্যানিটেশনের মানই উন্নত করবে না, বরং দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ৬ অর্জনে বাংলাদেশকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে। এটি আমাদের সকলকে এই ভেবে অনুপ্রাণিত করতে পারবে যে, দুর্গমতা কোনও অভিশাপ নয়, বরং এক নতুন সুযোগ। এখন সময় এসেছে চিন্তা করার, আলোচনা করার এবং পদক্ষেপ নেওয়ার।
লেখক: অ্যাডভোকেট; সামাজিক-আইন গবেষক



