গণঅভ্যুত্থানের পর গণতন্ত্রের সন্ধিক্ষণ: শিক্ষা, শালীনতা ও ভবিষ্যৎ

ড. খালিদুর রহমান
০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৭:৫৪আপডেট : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৮:৩৬

জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। দীর্ঘ সময় ধরে চলমান এক কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার অবসান শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং সমাজের নানা স্তরে নতুন প্রত্যাশা ও সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করেছে। এই পরিবর্তনের পেছনে যে প্রজন্মটি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে, তাদের সাহস, ত্যাগ ও অংশগ্রহণ নিঃসন্দেহে স্মরণীয়। রাজপথে দাঁড়িয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা, ভয় উপেক্ষা করে পরিবর্তনের দাবি তোলা এবং গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে সামনে নিয়ে আসা এই প্রজন্মের বড় অর্জন। তবু ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের পরবর্তী সময়ে কিছু আচরণ ও প্রবণতা আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে যে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন কতটা গভীরে প্রোথিত হচ্ছে এবং সেই পরিবর্তনের মূল্যবোধ কতটা সুরক্ষিত থাকছে।

যেকোনও গণআন্দোলনের পর সমাজে এক ধরনের উত্তেজনা ও আবেগের ঢেউ বয়ে যায়। মানুষের প্রত্যাশা বেড়ে যায়, একই সঙ্গে হতাশাও জন্ম নিতে পারে। এই আবেগের প্রবাহে কখনও কখনও সীমারেখা ঝাপসা হয়ে ওঠে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যে চিত্রটি ক্রমশ দৃশ্যমান হচ্ছে, তা সেই বাস্তবতারই একটি প্রতিফলন। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় বরাবরই সমাজের বিবেক গঠনের অন্যতম কেন্দ্র। এখানে প্রশ্ন করা হবে, প্রতিবাদ হবে, বিতর্ক হবে এবং মতভেদ প্রকাশ পাবে। এসবই একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক সমাজের লক্ষণ। কিন্তু প্রতিবাদের ভাষা ও ভঙ্গি যখন শালীনতার সীমা অতিক্রম করে, তখন তা কেবল প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের ইঙ্গিত বহন করে এবং শিক্ষা পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

সম্প্রতি লক্ষ করা যাচ্ছে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার নামে কিছু শিক্ষার্থী শিক্ষকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করছে। শিক্ষকরা সমাজে জ্ঞান ও মূল্যবোধের বাহক হিসেবে সম্মানিত একটি অবস্থানে রয়েছেন। তাদের সঙ্গে মতভেদ হওয়া অস্বাভাবিক নয়, এমনকি তাদের কোনও আচরণ প্রশ্নবিদ্ধ হলে তা নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনা করাও স্বাভাবিক। কিন্তু সেই সমালোচনা যদি ব্যক্তিগত আক্রমণ, অবমাননা বা প্রকাশ্য অসম্মানের রূপ নেয়, তবে তা সমস্যার সমাধান তো করেই না, বরং নতুন সংকটের জন্ম দেয়। একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হলে তার প্রভাব পড়ে শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশ, শিক্ষক শিক্ষার্থী সম্পর্ক এবং সামগ্রিক শিক্ষার মানের ওপর।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। কোনও শিক্ষক যদি অনিয়ম, দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহারের সঙ্গে জড়িত থাকেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক পথ সমাজে বিদ্যমান রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ, তদন্তের দাবি এবং প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া একটি সভ্য রাষ্ট্রের স্বাভাবিক চর্চা। এই পথ অনুসরণ করলে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে এবং একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির মর্যাদাও রক্ষা পায়। বিপরীতে, প্রকাশ্য অপমান বা অশালীন আচরণ সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে এবং প্রকৃত অপরাধী থাকলেও তার বিরুদ্ধে ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

গণঅভ্যুত্থানের পর যে অংশটি পর্যায়ক্রমে শিক্ষকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণে জড়িয়ে পড়ছে, তাদের উদ্দেশ্য ও প্রেরণা নিয়ে সমাজে নানা প্রশ্ন উঠছে। অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, এই আচরণের পেছনে কেবল আবেগ বা ক্ষোভ নয়, বরং কিছু রাজনৈতিক প্রভাবও কাজ করছে। ইতিহাস বলে, রাজনৈতিক শক্তিগুলো প্রায়ই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে তাদের প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র হিসেবে দেখে। তরুণদের আবেগ ও আদর্শবাদকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা নতুন কিছু নয়। এই বাস্তবতা মাথায় রেখে বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা জরুরি, যাতে আমরা আবেগের বশে এমন পথে না হাঁটি যা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে।

এখানে আরেকটি বিষয় গভীরভাবে ভাবার দাবি রাখে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্বদানকারী প্রজন্মের অবদান ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে থাকার কথা ছিল। কিন্তু এই প্রজন্মের একটি অংশ এমন আচরণে জড়িয়ে পড়েছে যা সহনশীলতা ও শালীনতার পরিপন্থি, এবং তাদের সামগ্রিক অবদানই প্রশ্নের মুখে পড়ছে। ইতিহাস প্রায়ই সূক্ষ্মভাবে বিচার করে। সেখানে কেবল উদ্দেশ্য নয়, পদ্ধতিও গুরুত্ব পায়। ন্যায়সঙ্গত দাবি যদি অনৈতিক উপায়ে উপস্থাপিত হয়, তবে তা নিজের শক্তিকেই দুর্বল করে দেয়। এই কারণে নেতৃত্বদানকারী প্রজন্মের ওপর দায়িত্ব আরও বেশি। তাদের উচিত নিজেদের আচরণে সেই আদর্শের প্রতিফলন ঘটানো, যার জন্য তারা আন্দোলনে নেমেছিল।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কোনও বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়। রাষ্ট্রের সামগ্রিক রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশের প্রতিফলন সেখানে স্পষ্টভাবে দেখা যায়। যদি রাষ্ট্রের সর্বস্তরে সহনশীলতা, সংলাপ ও আইনানুগ প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা গড়ে না ওঠে, তাহলে তার প্রভাব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও পড়বে। তাই সমস্যার সমাধান খুঁজতে গেলে কেবল শিক্ষার্থী বা শিক্ষককে আলাদা করে দেখলে চলবে না। রাষ্ট্র, রাজনীতি, সমাজ এবং পরিবার সব কিছুর সম্মিলিত ভূমিকা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তরুণদের প্রতিবাদের শক্তিকে দমন করা নয়, বরং তা যেন গঠনমূলক পথে প্রবাহিত হয় সেই দিকেই মনোযোগ দিতে হবে।

জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। এই নির্বাচনের মাধ্যমে যে রাজনৈতিক শক্তিগুলো সামনে আসে, তাদের দর্শন ও আচরণ রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে প্রভাব ফেলে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে প্রশাসন, সংস্কৃতি ও সামাজিক সম্পর্ক সব কিছুতেই সেই প্রভাব বিস্তৃত হয়। তাই এমন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান রাষ্ট্রের জন্য কাম্য নয়, যারা আদর্শের কথা বলে কিন্তু বাস্তবে অনাদর্শিক আচরণকে উৎসাহিত করে। আদর্শ মানে কেবল স্লোগান নয়, বরং দৈনন্দিন আচরণ, সিদ্ধান্ত ও সম্পর্কের ভেতর দিয়ে তার প্রকাশ ঘটে।

আজকের বাংলাদেশে তরুণ প্রজন্মের শক্তি ও সংখ্যা দুটিই বিশাল। এই শক্তি যদি সঠিক পথে পরিচালিত হয়, তবে দেশের জন্য তা আশীর্বাদ হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু যদি এই শক্তি বিভ্রান্তিকর রাজনীতি বা অসহিষ্ণু আচরণের দিকে ধাবিত হয়, তাহলে তা সমাজে অস্থিরতা ও বিভাজন বাড়াতে পারে। শিক্ষকদের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এই সত্য প্রযোজ্য। শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক মূলত পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। এই ভিত্তি দুর্বল হলে শিক্ষা ব্যবস্থা তার মূল উদ্দেশ্য থেকে সরে যেতে শুরু করে।

গণঅভ্যুত্থানের পর প্রাপ্ত স্বাধীনতা ও সুযোগকে কীভাবে ব্যবহার করা হবে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। এই সময়টি আত্মসমালোচনা ও আত্মসংযমেরও।

আন্দোলনের উত্তাপ যখন কমে আসে, তখন স্থায়ী পরিবর্তনের কাজ শুরু হয়। এই কাজের জন্য প্রয়োজন ধৈর্য, সংলাপ এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর প্রতি আস্থা। দ্রুত ফল পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা অনেক সময় আমাদের ভুল পথে নিয়ে যেতে পারে। তাই অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ অবশ্যই করতে হবে, কিন্তু সেই প্রতিবাদ যেন আইনের কাঠামোর ভেতরে থেকে, যুক্তি ও প্রমাণের ভিত্তিতে হয়।

সমাজের অভিজ্ঞ মানুষদের একটি বড় অংশ আজ তরুণদের দিকে তাকিয়ে আশার পাশাপাশি উদ্বেগও অনুভব করছে। আশা এই কারণে যে তরুণরাই পরিবর্তনের প্রধান চালিকাশক্তি। উদ্বেগ এই কারণে যে তাদের শক্তি যদি ভুল পথে পরিচালিত হয়, তাহলে ক্ষতির পরিমাণও হবে বড়। এই দ্বৈত অনুভূতির ভেতর থেকেই একটি ভারসাম্যপূর্ণ পথ খুঁজে নেওয়া জরুরি। তরুণদের কণ্ঠ রোধ করা নয়, বরং তাদের দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলাই হওয়া উচিত রাষ্ট্র ও সমাজের লক্ষ্য।

মোটকথা, জুলাই গণঅভ্যুত্থান আমাদের সামনে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এই অধ্যায় কীভাবে লেখা হবে, তা নির্ভর করছে আমাদের সম্মিলিত আচরণ ও সিদ্ধান্তের ওপর। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো যদি সহনশীলতা, শালীনতা ও নৈতিকতার চর্চার ক্ষেত্র হিসেবে শক্ত অবস্থান নিতে পারে, তবে তা পুরো সমাজের জন্য ইতিবাচক বার্তা দেবে। আসুন, আমরা জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে এমন একটি ভবিষ্যতের প্রত্যাশা করি যেখানে প্রতিবাদ ও মতপ্রকাশ থাকবে, কিন্তু তা হবে সম্মানজনক ও গঠনমূলক। যেখানে রাজনৈতিক শক্তির উত্থান হবে গণতান্ত্রিক ও নৈতিক ভিত্তির ওপর। এবং যেখানে পরিবর্তনের নেতৃত্বদানকারী প্রজন্ম ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে শুধু তাদের সাহসের জন্য নয়, বরং তাদের প্রজ্ঞা ও সংযমের জন্যও।

লেখক: অধ্যাপক, পরিসংখ্যান বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয়ে ৭.৫% কর নেওয়ার অভিযোগ, স্পষ্ট করার দাবি সারজিসের
কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয়ে ৭.৫% কর নেওয়ার অভিযোগ, স্পষ্ট করার দাবি সারজিসের
ভাতের সঙ্গে জমবে মজাদার সরষে সবজি
ভাতের সঙ্গে জমবে মজাদার সরষে সবজি
মার্কিন যুদ্ধবিরতি প্রত্যাখ্যান হিজবুল্লাহর, চলছে ইসরায়েলি হামলা
মার্কিন যুদ্ধবিরতি প্রত্যাখ্যান হিজবুল্লাহর, চলছে ইসরায়েলি হামলা
ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্তিতে জোর দেবে নতুন বিএসইসি
ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্তিতে জোর দেবে নতুন বিএসইসি
সর্বশেষসর্বাধিক