বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর লক্ষ্যে সংরক্ষিত নারী আসনের ব্যবস্থা বহু বছর ধরে চালু রয়েছে। এই ব্যবস্থার ফলে সংসদে নারীর উপস্থিতি কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও একটি মৌলিক প্রশ্ন বারবার সামনে আসে— সংরক্ষিত আসনের সদস্যরা কবে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসবেন? বর্তমান নিয়মে তারা সংসদের নির্বাচিত সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হন। আমি চাই, নারীর প্রকৃত রাজনৈতিক উপস্থিতি নিশ্চিত হোক। আমরা চাই, নারী তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর মোকাবিলা করে বিজয়ী হয়ে আসুক এবং তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে সে পূর্ণ স্বাধীন ও দায়বদ্ধ থাকুক। তিনশ আসনেই নারী সদস্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করুক—তখন আর তাকে ‘সংরক্ষিত’ বলার সুযোগ থাকবে না। এই বাস্তবতায় সরাসরি ভোটে নারী সংসদ সদস্য নির্বাচনের দাবি দিন দিন জোরালো হচ্ছে। আমরা নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে এই দাবিগুলো যুক্তিযুক্তভাবে তুলে ধরেছি এবং এই অবস্থান থেকে আমরা এক চুলও নড়ছি না।
মনে রাখা প্রয়োজন, সংসদ মূলত একটি আইনসভা, যেখানে আইন সংস্কার হবে, নতুন আইন প্রণয়ন হবে এবং পুরোনো আইন নিয়ে বিতর্ক হবে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমরা সংসদকে স্থানীয় উন্নয়নের তদারক করার প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে ফেলেছি।
অথচ গণতন্ত্রের মূল শক্তি হলো জনগণের ভোট। যে প্রতিনিধি জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন, তার কাছে জনগণের জবাবদিহি ও প্রত্যাশা পূরণের দায়বদ্ধতা থাকে— এটি মর্যাদার সঙ্গে জড়িত। কিন্তু সংরক্ষিত নারী আসনের বর্তমান ব্যবস্থায় সদস্যরা আইনি সুরক্ষা কিংবা জনগণের নতুন দিশা তৈরিতে খুব একটা ভূমিকা রাখতে পারেন না।
আমরা যখন প্রস্তাব করি যে তিনশত আসনেই নারী প্রার্থীরা সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সংসদে আসুক, তখন আমাদের ‘উচ্চাভিলাষী’ আখ্যা দেওয়া হয়। যুক্তি দেওয়া হয় যে, সংসদে বসার জায়গা হবে না। আমাদের এও যুক্তি দেওয়া হলো—তিনশত নারী সদস্য আর বাকি সাধারণ তিনশত আসনে যদি অন্তত ১০ জন বিজয়ী হয়ে আসেন তাহলে ৩১০ জন নারী মিলে নারীরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে যাবে। নারীরা যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়েও যায়, তাতে ক্ষতি কী? আমরা দীর্ঘকাল পুরুষ-সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেখে আসছি, সেখানে নারীর সংখ্যাগরিষ্ঠতায় কী অসুবিধা হতে পারে? এতদিন ধরে এসব দেখে এসে এখনও দলগুলোর কাছে ঘুরে আসন নিশ্চিত করার পক্ষে আমরা নই।
সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হলে নারী নেত্রীরা জনগণের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করতে পারবেন। প্রতিটি আসনে যেমন একজন পুরুষ প্রতিনিধি থাকবেন, তেমনি একজন নারী প্রতিনিধিও থাকুক। এতে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে এবং নারীর অধিকার নিয়ে আলোচনার নতুন জায়গা তৈরি হবে। তারা নিজস্ব রাজনৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলতে পারবেন এবং সংসদে নারীর উপস্থিতি কেবল সংখ্যায় নয়, কার্যকারিতাতেও বৃদ্ধি পাবে। এতে কারও কোনও ক্ষতি হওয়ার কথা নয়।
সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা নারীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নকে শক্তিশালী করবে। বর্তমানে অনেক নারীই দলীয় মনোনয়নের দয়ার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। নির্বাচন বিষয়ক সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, এসব সংরক্ষিত আসনের জন্য নারী প্রার্থীদের নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে যেতে হবে বলা হয়েছিল। ৪০০ আসনের মধ্যে নারীদের জন্য নির্ধারিত ১০০ আসনে ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে নির্বাচনের বিধান করারও সুপারিশ করেছে ওই কমিশন। তাতেও আমার তীব্র আপত্তি আছে। কারণ ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে একজন নারী সংসদ সদস্যকে দুই টার্ম অপেক্ষা করতে হবে, যা তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারকে বাধাগ্রস্ত করবে।
আমরা বারবার সরাসরি নির্বাচনের কথা বলি, কারণ এর ফলে তারা নিজের যোগ্যতা, জনপ্রিয়তা ও রাজনৈতিক দক্ষতার ভিত্তিতে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। এতে রাজনীতিতে নতুন ও শক্তিশালী নারী নেতৃত্ব তৈরি হবে। বিশ্বের অনেক গণতান্ত্রিক দেশে নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর ক্ষেত্রে জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। আমরা লম্বা সময় সংরক্ষিত আসনে দলীয় মনোনয়নের রাজনীতি দেখেছি। আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের নারীরা এখন কেবল ‘সিলেকশন’ বা নির্বাচনের মাধ্যমে কোনও দায়িত্ব নেওয়ার পর্যায়ে নেই, তারা সরাসরি ‘ইলেকশন’ বা ভোটের লড়াইয়ে জেতার সক্ষমতা রাখেন।
আমার অবস্থান স্পষ্ট—সংরক্ষিত নারী আসন প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা হলেও মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নির্বাচন নিশ্চিত না হলে তা কেবল সংখ্যাগত উন্নয়নই ঘটায়। সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা চালু করতে হবে এবং সাধারণ আসনেও উল্লেখযোগ্য হারে নারী প্রার্থী মনোনয়ন দিতে হবে। যতই পাল্টা যুক্তি দেখানো হোক, এই ন্যায়সংগত দাবি আমরা এখনই ছাড়ছি না।
লেখক: মানবাধিকারকর্মী ও নারীপক্ষের প্রতিষ্ঠাতা




