কৃষিবান্ধব উদ্যোগে এখনও যেসব উদ্বেগ

চারু হক
২৯ মার্চ ২০২৬, ১২:০০আপডেট : ৩০ মার্চ ২০২৬, ১৪:১২

নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই কৃষি খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে যে একগুচ্ছ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। বিশেষ করে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ এবং ১ কোটি ৬৫ লাখ কৃষকের জন্য স্মার্ট কার্ড চালুর উদ্যোগ সরকারের এক দূরদর্শী চিন্তার প্রতিফলন। ‘কৃষক স্মার্ট কার্ড নীতিমালা ২০২৫’-কে ভিত্তি ধরে ২০৩০ সালের মধ্যে যে একটি সমন্বিত জাতীয় কৃষক ডেটাবেজ তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে— এটাও আধুনিক বাংলাদেশের পথে একটি শক্তিশালী ধাপ। এর পাশাপাশি কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে সমন্বিত বাজার ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা এবং আধুনিক কৃষির প্রসারে টেকনিক্যাল টিম নিযুক্তির ঘোষণা সত্যিকার অর্থেই সর্বস্তরে আশাবাদের সঞ্চার করেছে। তবে এই সম্ভাবনাময় সূচনার সমান্তরালে মাঠপর্যায়ের কৃষি উদ্যোক্তা ও বিশ্লেষকদের মনে কিছু মৌলিক সংশয়ও দানা বেঁধেছে, যা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি রাখে।

স্মার্ট কৃষি কার্ডে প্রতিটি কৃষকের একটি স্বতন্ত্র ডিজিটাল প্রোফাইল থাকবে, যা জাতীয় পরিচয়পত্রের মাধ্যমে যাচাই করা হবে। এতে করে কৃষকের সার ও বীজ প্রাপ্তি আগের চেয়ে অনেক বেশি স্বচ্ছ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। কিন্তু কৃষি কেবল উৎপাদন বৃদ্ধির কোনও যান্ত্রিক হিসাব নয়— এটি মাটি, প্রকৃতি আর মানুষের এক নিবিড় সম্পর্কের নাম। ঠিক এই জায়গাতেই পরিবেশবান্ধব কৃষি উদ্যোক্তাদের প্রশ্নের উদ্রেক প্রাসঙ্গিক। কারণ, নীতিমালায় বীজ ও সারের তালিকায় কীটনাশককে গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও বিষমুক্ত জৈব কৃষির বিষয়টি সেভাবে মূল স্তম্ভে স্থান পায়নি।

যদিও ঘটমান বাস্তবতা হচ্ছে, অতীতে অধিক ফলনের লক্ষ্যে সবুজ বিপ্লবের নামে রাসায়নিকের যে অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার শুরু হয়েছিল, তা ফসলের উৎপাদন বাড়ালেও মাটির প্রাকৃতিক প্রাণশক্তি শুষে নিয়েছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে— এসব বিষাক্ত রাসায়নিক শুধু মাটির ক্ষতি করেই ক্ষান্ত হয় না, বরং তা খাদ্যচক্রের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে গ্যাস্ট্রিক, ডায়াবেটিস ও ক্যানসারের মতো মরণব্যাধি সৃষ্টি করছে। বর্তমান পরিকল্পনায় যখন বিগ ডেটা, ইন্টারনেট অব থিংস বা ব্লকচেইন প্রযুক্তির জয়গান গাওয়া হচ্ছে, তখন জনস্বাস্থ্য রক্ষা এবং মাটির উর্বরতা ফেরানোর কোনও সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ স্থান পেল না— এটা নিয়েও তাই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, এসব প্রযুক্তিগত সমৃদ্ধি কি সত্যিই প্রান্তিক কৃষকের উপকারে আসবে, নাকি এর আড়ালে বহুজাতিক রাসায়নিক ব্যবসায়ীদের বাজার আরও পোক্ত হবে?

সরকার ১৫৫০ কোটি টাকার বকেয়া কৃষিঋণ মওকুফ করায় প্রায় ১২ লাখ প্রান্তিক কৃষক সরাসরি উপকৃত হচ্ছেন। এটি একটি সাহসী ও প্রশংসনীয় পদক্ষেপ। তবে ঋণের এই বোঝা নামানো কৃষকের জন্য সাময়িক এক স্বস্তি মাত্র। কারণ, উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া এবং ফসলের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার কারণেই কৃষক বারবার দেনার জালে আটকে পড়েন। সরকার ইতোমধ্যে অবশ্য একটি সমন্বিত বাজার ব্যবস্থাপনার ঘোষণা দিয়েছে এবং কৃষকের কাছ থেকে পণ্য সরাসরি ক্রয়ের পরিকল্পনা নিয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র বেশ জটিল। পথঘাট ও পরিবহণ ব্যবস্থার বিদ্যমান সিন্ডিকেট এবং বেপরোয়া চাঁদাবাজরা এই জটিলতার জন্ম দিয়েছে। কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপের মাধ্যমে এদেরকে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে কেবল স্মার্ট কার্ড বা নীতিনির্ধারণী ঘোষণা দিয়ে প্রান্তিক চাষিদের ভাগ্যের স্থায়ী পরিবর্তন অধরাই থেকে যাবে।

স্মার্ট কার্ডের আওতায় ভূমিহীন বর্গাচাষীদের অন্তর্ভুক্তি নিঃসন্দেহে একটি বড় সামাজিক স্বীকৃতি। তবে, গ্রামীণ ক্ষমতার চিরচেনা কাঠামোয় প্রকৃত চাষীদের খুঁজে বের করে এই সুবিধা পৌঁছে দেওয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের কমিটিগুলো তালিকা চূড়ান্ত করার দায়িত্বে থাকলেও, তাদের পক্ষে স্থানীয় প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করা অনেক ক্ষেত্রেই দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। দলীয় বা গোষ্ঠীগত স্বার্থকে প্রাধান্য দিলে প্রকৃত কৃষকের বদলে অ-কৃষক বা প্রভাবশালীদের নামেই তালিকা পূর্ণ হয়ে যাওয়ার ব্যাপক ঝুঁকি রয়েছে। ফলে, সঠিক তদারকি নিশ্চিত করা না গেলে এই মহতী উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হতে পারে।

বিশেষ করে বর্গাচাষীদের জন্য জমির মালিকের সত্যায়ন নেওয়ার যে শর্ত রাখা হয়েছে, তা মাঠপর্যায়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেক মালিকই আইনি ঝামেলার ভয়ে বা ভবিষ্যতে জমির মালিকানা দাবির আশঙ্কায় বর্গাচাষিদের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিতে কুণ্ঠিত থাকবে। এসব প্রশাসনিক ও স্থানিক জটিলতা নিরসন করা না গেলে ভূমিহীন কৃষকদের জন্য নেওয়া এই মহতী উদ্যোগটি কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।

আমাদের কৃষি অর্থনীতিতে নারীদের অবদান আজ এক অনস্বীকার্য সত্য, যা মোট কৃষি কার্যক্রমের প্রায় ৪৫ শতাংশ। এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই নতুন উদ্যোগের আওতায় কৃষাণীদের বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এমনকি পরিবারের পুরুষ সদস্য কাজের প্রয়োজনে দূরে থাকলে কিংবা নারী সদস্য নিজে সরাসরি চাষবাসে সক্রিয় হলে তার নামেই কার্ড ইস্যু করার বিধান রাখা হয়েছে। এটি সামাজিক ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক দিক হলেও মাঠপর্যায়ে নারীদের কৃষিঋণ প্রাপ্তি কিংবা আধুনিক প্রযুক্তির ওপর তাদের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ কতটুকু প্রতিষ্ঠিত হবে, সেটি নিশ্চিত করাই এখন আসল চ্যালেঞ্জ। শুধু নথিপত্রে নাম থাকলেই চলবে না, বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে না পারলে এই বিশাল শ্রমশক্তির সঠিক মূল্যায়ন অধরাই থেকে যাবে।

নীতিমালায় প্রযুক্তির যে মজবুত অবকাঠামো ও সাইবার নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবে রূপদান করাও সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রান্তিক কৃষকেরা যখন তাঁদের আর্থিক লেনদেন সংশ্লিষ্ট স্মার্ট বা ডিজিটাল কার্ডের মাধ্যমে করবেন, তখন প্রযুক্তির জটিলতায় তারা যেন কোনোভাবেই প্রতারণার শিকার না হন— সেটি নিশ্চিত করা প্রয়োজন হবে। যদিও নীতিমালায় আধুনিক এনক্রিপশন এবং নিয়মিত নিরাপত্তা নিরীক্ষার মাধ্যমে তথ্য ও আর্থিক লেনদেনের সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে, তবুও মাঠপর্যায়ে এর সফল প্রয়োগই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

কৃষিকে সত্যিকার অর্থে ‘স্মার্ট’ করতে হলে কৃষিবিষয়ক প্রচলিত দর্শনে একটি বড় পরিবর্তন আনয়ন প্রয়োজন। যদিও সরকারের রূপকল্পে টেকসই কৃষি প্রণোদনার কথা উল্লেখ আছে, কিন্তু এর বাস্তব প্রয়োগ যেন শুধু রাসায়নিক সার আর কীটনাশকের সহজলভ্যতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। মাটির উর্বরতা পুনরুদ্ধারে জৈব সারের ব্যবহার বৃদ্ধিতে সরাসরি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন হবে। এর পাশাপাশি, বিষাক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে কৃষকের শরীরে যে দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, তা মোকাবিলায় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ারও জরুরত আছে। কারণ, অনিয়ন্ত্রিত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে অনেক কৃষকই ক্যানসারসহ বিভিন্ন মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছেন। কৃষকের জীবন রক্ষায় কৃষি স্বাস্থ্যসেবা ও বিমা সুবিধাগুলোকে তাই এই স্মার্ট কার্ডের সেবার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করার ব্যাপারটা বিবেচনার দাবি রাখে। একইসঙ্গে চাষের ক্ষুদ্র যন্ত্রপাতি এবং সেচ কাজে সৌর বিদ্যুতের মতো সাশ্রয়ী প্রযুক্তিতে বিশেষ নজর দিলে কৃষকের উৎপাদন খরচ যেমন কমবে, তেমনি দীর্ঘমেয়াদে আমাদের কৃষিও হবে পরিবেশবান্ধব।

নীতিমালায় উল্লিখিত ‘রাজস্ব সংগ্রহ ও খরচ ভাগাভাগি’ মডেলটি নিয়েও নতুন করে ভাবার অবকাশ রয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে এই বিশাল কর্মযজ্ঞের আর্থিক স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার পরিকল্পনাটি তাত্ত্বিকভাবে যৌক্তিক মনে হলেও, সেখানে ব্যবসায়িক মুনাফা যেন জনস্বার্থকে ছাপিয়ে না যায় সেদিকে কড়া নজর রাখা প্রয়োজন। কৃষি সেবার মতো একটি সংবেদনশীল খাত যদি অতিমাত্রায় বাণিজ্যিকীকরণের দিকে ঝুঁকে পড়ে, তবে সেবার বিনিময়ে প্রান্তিক কৃষকের খরচ উল্টো বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। প্রযুক্তির এই আধুনিকায়নের ডামাডোলে কৃষক যেন তার আদি ও অকৃত্রিম বীজ সংরক্ষণের চিরন্তন ক্ষমতাটি হারিয়ে না ফেলেন, সেটি নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। কারণ, বীজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো মানেই হলো কৃষকের সার্বভৌমত্ব হারানো।

সরকারের এই কৃষিবান্ধব উদ্যোগকে টেকসই করতে হলে দৃষ্টিভঙ্গিতে সুনির্দিষ্ট পরিবর্তন জরুরি। শুধু সার, বীজ, বালাইনাশক আর বাজার ঠিক করে সেটাকে স্মার্ট বা আধুনিক ভাবার চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আধুনিক কৃষি মানে প্রকৃতি ও প্রযুক্তির এমন এক সুনিপুণ ভারসাম্য, যেখানে মাটির উর্বরতা থাকবে অক্ষুণ্ণ আর কৃষক থাকবেন ঋণের দুশ্চিন্তামুক্ত। প্রযুক্তি যখন এদেশের মাটির আদি ঘ্রাণ আর কৃষকের ঘামের প্রকৃত মূল্যায়ন করতে শিখবে, তখনই আমরা সত্যিকার অর্থে একটি টেকসই ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারবো।

লেখক: গবেষক ও অনুবাদ

/এপিএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
সর্বশেষসর্বাধিক