শ্রমিকের সুরক্ষা নেই

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
২০ এপ্রিল ২০১৬, ১৫:৩৪আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০১৬, ১৫:৪০

ইশতিয়াক রেজা ফিরে এলো রানা প্লাজা দিবস। বছর ঘুরে এলে কিছু সভা হয়, সেমিনার হয়. মানববন্ধন হয়, কিছু টকশো হয়। তারপর আবার ভুলে যাওয়াও হয়। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ড-এর কাছে আট তলা ‘রানা প্লাজা’ ধসে পড়লে ১ হাজার ১৩৬ জন নিহত হন, যাদের অধিকাংশই ওই ভাবনের পাঁচটি পোশাক কারখানার শ্রমিক। আরও অন্তত আড়াই হাজার মানুষ পঙ্গু হয় ওই ঘটনায়।  
মানুষ জীবন হারিয়েছে, স্বজন হারিয়েছে, কেউবা বেঁচে থেকেও মৃত প্রায়। এ ঘটনা বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের জন্য ছিল এক বড় ধাক্কা। শ্রমিকের কর্ম পরিবেশ বারবার আলোচনায় এসেছে। পশ্চিমা দেশের ক্রেতারাও নানাভাবে দেখতে চেয়েছে বাংলাদেশের সরকার এবং উদ্যোক্তারা কতটা মানবিক হয় এই প্রধান রপ্তানি পণ্যটির উৎপাদন ও বিপনন প্রক্রিয়ায়। এমন মর্মান্তিক ঘটনার তিন বছর পর তাই স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগে কতটা ঘুরে দাঁড়াতে পারলো বাংলাদেশ?
সরকারের দিক থেকে দাবি করা হচ্ছে রানা প্লাজা দুর্ঘটনা পরবর্তী সময়ে পোশাক শিল্পে বাংলাদেশের শ্রমিকদের অধিকার, স্বাস্থ্য এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে ব্যাপক পরিবর্তন ও অগ্রগতি হয়েছে। ভাল খবর কিছু পাওয়াও যাচ্ছে। সচতনতা কিছু বেড়েছে অন্তত আগুন লাগার ব্যাপারে। ২০১২ সালে যেখানে ২৫০টি আগুনের ঘটনা ছিল সেখানে ২০১৫ তে হয়েছে ৫টি।  
বাংলাদেশে বর্তমানে অবস্থান করা অ্যাকোর্ড ও অ্যালায়েন্স-এর প্রতিবেদনে এখাতের পরিবর্তনের কথা উঠে এসেছে। বেতন-ভাতা নিয়ে বড় অসন্তোষের কথা তেমন একটা উচ্চারিত নয় এখন। কিন্তু  শ্রমিক অধিকার ও ট্রেড ইউনিয়ন নিয়ে কোন অগ্রগতি নেই বলে বলছে তারা।

রানা প্লাজা ধসের পর আর কোন দুর্ঘটনা ঘটেনি। এটি একটি সুখবর। কিন্তু ঝুঁকির কথা বিবেচনা করলে দুশ্চিন্তা আছে। ২০১৮ এর জুন মাসের মধ্যে ৬৭৭টি কারখানা নানাভাবে ঝুঁকিমুক্ত করার প্রক্রিয়ায় এখন পর্যন্ত সম্পন্ন হয়েছে মাত্র ২৪টির। এই গতিতে এগুলে নির্ধারিত সময়ে কি সবগুলো ভবনের মেরামতসহ বিভিন্ন দুর্ঘটনা ঝুঁকির কারণগুলো দূর করা সম্ভব হবে? 

ধীর গতির কারণ অনেক। বলা হচ্ছে একটা বড় সময় গেছে রাজনৈতিক অস্থিরতায়। আছে ভাল প্রকৌশলী সংকট যারা এসব বুঝে সুপারিশ করতে পারেন কি কি করা প্রয়োজন। অনেক কারাখানার মালিক বলছেন, ভবন ঝুঁকিমুক্ত করতে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও মালামাল আমদানিতে জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রিতা করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তবে, বাস্তবতা হলো কারখানাগুলো মানসম্পন্ন করতে যে বিনিয়োগ প্রযোজন, সেখানেই যত অনীহা পোশাকশিল্প মালিকদের অনেকের।

রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় একটি কঠিন সত্য মানুষের সামনে এসেছে। বাংলাদেশের ব্যাক্তিমালিকানাধীন কারখানা বা প্রতিষ্ঠানে যারা কাজ করেন, তারা কোনও দুঘর্টনার শিকার হলে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা আসলে কেমন? শ্রম আইন অনুযায়ী একজন শ্রমিক কারখানায় কর্মরত অবস্থায় সম্পূর্ণ বা আংশিক কর্মক্ষমতা হারালে যে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নিয়ম রয়েছে,তা একজন শ্রমিকের পুনর্বাসন ও বেঁচে থাকার জন্য একেবারেই অপ্রতুল। অধিকাংশ দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে মালিকপক্ষকে এককভাবে নিহত ও আহত উভয়ের ক্ষতিপূরণ দিতে হয়।

আরও পড়ুন খালেদা জিয়ার এখন যা করা দরকার

বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের ইতিহাসে এত বড় দুর্ঘটনার ধাক্কা সামলাতে না সামলাতেই সামনে চলে আসে হতাহতের ক্ষতিপূরণের প্রসঙ্গটি। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলও’র নেতৃত্বে সরকার, শ্রমিক এবং গার্মেন্টস মালিক প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত একটি কমিটি এই ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়ে কাজ করছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত অনেকেই ক্ষতিপূরণ পাননি বলে দাবি করছেন। আর যারা পেয়েছেন তারাও আংশিক পেয়েছেন।

রানা প্লাজা ধসের ক্ষেত্রে দেখা গেছে,এত বড় বিপর্যয়ে তিনটি কারখানার মালিকপক্ষের সম্মিলিতভাবে নিহত ও আহতদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার সামর্থ্য ছিল না। তাদের সামর্থ্যের অনুপস্থিতিতে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সংগঠন যেভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছিল সেসব অর্থ ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রতিটি নিহত ও আহতের পরিবারের কাছে পৌঁছানো গেলে হয়তো প্রতিটি পরিবারই সুন্দরভাবে পুনর্বাসিত হওয়ার সুযোগ পেত। কিন্তু তিন বছর পরও জানা যাচ্ছে, সমন্বয়হীনতার অভাবে বিদেশ থেকে দেশের বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা ও ব্যক্তি এ দুর্ঘটনা সংশ্লেষে যে অর্থ প্রাপ্ত হয়েছেন তার পরিমাণ কত,তা কীভাবে ব্যয় হয়েছে, কোন উৎস থেকে অর্থ এসেছে, এ-সংক্রান্ত কোনও তথ্য সরকারের কাছে নেই এবং প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিমালিকদের পক্ষ থেকেও দেওয়া হয়নি। সরকারিভাবেও রানা প্লাজা ধসকে কেন্দ্র করে যে অর্থ সংগৃহীত হয়েছে, তার কী পরিমাণ নিহতদের পরিবার ও আহতদের পুনর্বাসনে ব্যয় হয়েছে; এ-সংক্রান্ত তথ্য দেশবাসীর সামনে উপস্থাপন করা হয়নি। রানা প্লাজা ভবন ধস ঘটনায় নিহতদের পরিবার এবং আহতরা যথাযথ ক্ষতিপূরণ না পাওয়ায় যেভাবে তাদের পুনর্বাসন বাঁধাগ্রস্ত হয়েছে,তাতে তাদের আর্তনাদ আরও বাড়ছে।

ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিত করা হয়েছে বলে সরকার দাবি করে, দাবি করে কারাখানা মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএও। তারপরও ঈদ এলে কোন কোন কারখানায় বিক্ষোভের কথা শুনি। বেতন না পাওয়ার অভিযোগও কম নয়। রানা প্লাজা বড় দুর্ঘটনা ছিল, চারদিকে আওয়াজ উঠেছে। পোশাক শিল্প অন্য সব শিল্প থেকে নজরেও বেশি।  

কিন্তু সাধারণভাবে আমাদের শিল্পখাতে শ্রমিকরা কর্মরত অবস্থায় জখম হলে ক্ষতিপূরণ মেলে না। শ্রমিকদের পরিচয়পত্র নেই। শ্রমিক কল্যাণ ও শ্রমিক স্বাস্থ্য বিষয়ক অবকাঠামো দুর্বল। বিপজ্জনক যন্ত্রাংশ পরিচালনায় নিয়মনীতির বালাই নেই। উপযুক্ত সুরক্ষার সরঞ্জাম ছাড়াই দূষণের মধ্যে কাজ করতে বাধ্য হন শ্রমিকরা। শ্রমিক নেতাদের সাথে কথা বললে জানা যায়, নানা কারখানায় দুর্ঘটনা  ঘটে, অনেকে পঙ্গু হয়ে যায়। কেউ কেউ মারাও যায। কিন্তু সব দুর্ঘটনার খবর বাইরে আসে না।

আরও পড়ুন শফিক রেহমানকে গ্রেফতার এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতার ধুয়া

কারখানায় কাজ করা ঝুঁকি বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়না আমাদের দেশে। সরকারি দফতর আছে, আইন আছে, কর্মকর্তারা আছেন। শত শত কারাখানায় ঘটে যাওয়া এমনসব ঘটনাকে অপরাধ হিসেবেই দেখে কড়া হাতে তা দমন করতে হবে। সুষ্ঠু জীবনের আশ্বাস দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে সরকারকেই। রাতারাতি শ্রমিকের জীবন নিরাপদ হয়ে যাবে,তা নয়। কখনও কখনও দু’একটি শাস্তি দেয়ার ঘটনা আমরা শুনি। কিন্তু মূল সমস্যায় কিছুটা হলেও এগুনো যাবে। সমস্যার সমাধান না করে শাস্তি হলেই অপরাধ কমবে এমন ভরসা কোথায়?

লেখক:পরিচালক বার্তা, একাত্তর টেলিভিশন

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
সর্বশেষসর্বাধিক