‘উন্নয়নের মহাসড়কে’ বেকারের মিছিল

Send
রুমিন ফারহানা
প্রকাশিত : ১৭:১০, জানুয়ারি ২৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৫৩, জানুয়ারি ২৬, ২০২০

রুমিন ফারহানাআমরা ভুলে যাইনি—কিছুদিন আগের কোটা সংস্কার আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোর কথা। আন্দোলনকারীদের মার খাওয়া, নির্যাতিত হওয়া, গ্রেফতার হওয়া আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে আবার মনে করিয়ে দিয়েছিল দেশে চাকরিপ্রার্থী অসহায় বেকার যুবকদের দুঃসহ জীবনের কথা। আবার সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩০ থেকে ৩৫ করার দাবিতে বহুদিন ধরেই যুব সমাজ সোচ্চার। দেশে প্রতিবছর বাড়ছে বিসিএস পরীক্ষার্থীর সংখ্যা। সর্বশেষ ৪১তম বিসিএসে আবেদনকারীর সংখ্যা ৪ লাখ ৭৫ হাজার। এটি এযাবৎকালের সর্বোচ্চ সংখ্যা। একথা সত্য যে, নানা প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সুবিধা মিলে সরকারি চাকরি এখন বেশ আকর্ষণীয়। কিন্তু গত ১০ বছরে সরকারি চাকরি নিয়ে যে হুজুগটা চলছে, সেটা এর আগে এমন ছিল না। এর প্রধান কারণ বাংলাদেশি শিক্ষিত তরুণ-তরুণীরা চাকরি পাচ্ছেন না, তাই তারা বছরের পর বছর বিসিএসের পেছনে সময় নষ্ট করছেন।
স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণি পেলেও দেশে ভালো চাকরির নিশ্চয়তা নেই। সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস)-এর গবেষণা বলছে, উচ্চশিক্ষায় দুর্দান্ত ফল অর্জনকারীদের মধ্যে ২৮ থেকে সাড়ে ৩৪ শতাংশ বেকার। বেকারত্বের হার উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। বছর দুয়েক আগে বিশ্বখ্যাত ব্রিটিশ সাময়িকী ইকোনমিস্ট-এর ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে বাংলাদেশের প্রতি ১০০ জন স্নাতক ডিগ্রিধারীর মধ্যে ৪৭ জনই বেকার। ভারতে এর হার ৩৩ শতাংশ, নেপালে ২০ শতাংশ, পাকিস্তানে ২৮ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কায় ৭ দশমিক ৮ শতাংশ।

এদিকে, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০১৬-১৭ অর্থবছরের শ্রমশক্তি জরিপের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা ৪ কোটি ৮২ লাখ।

দেশের মানুষের কর্মহীনতার কথা সরকারের পক্ষ থেকেও স্পষ্ট স্বীকৃতি আছে। ২০১৮ সালের জুলাই মাসে রাজধানীর একটি অনুষ্ঠানে সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, ‘দেশে একটা বড় ধরনের সমস্যা হয়ে যাচ্ছে (জবলেস গ্রোথ) কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি।’ গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, জবলেস গ্রোথ আসলে কতটা সত্য কথা। বাংলাদেশ অটোমেশন এবং রোবট কি এমন পর্যায়ে গেছে যে, আমাদের জিডিপির আকার ক্রমাগত বাড়ছে কিন্তু সেটা মানুষের কর্মসংস্থান করতে পারছে না? মোটেও তা নয়। এর ভিত্তিতে স্পষ্টভাবে বলা যায়, এই দেশে সরকারের দাবি অনুযায়ী অর্থনৈতিক উন্নতি হচ্ছে না।

এই দেশে বেকারত্ব এই পর্যায়ে যাওয়ার পেছনে আমাদের শিক্ষায় অত্যন্ত অপ্রতুল বরাদ্দ একটা বড় কারণ। চলমান অর্থবছরে শিক্ষায় বরাদ্দ জিডিপির ২ দশমিক ১ শতাংশ। এই বরাদ্দের হার দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। নেপাল, ভারত, মালদ্বীপ, ভুটানে শিক্ষা খাতে জিডিপির অনুপাতে ব্যয় যথাক্রমে ৩ দশমিক ৭, ৩ দশমিক ৮, ৫ দশমিক ২ এবং ৭ দশমিক ৪। অথচ ইউনেস্কো ও ডাকার ডিক্লারেশন অনুযায়ী আমাদের মতো দেশে শিক্ষায় বাজেটে জিডিপির অন্তত ৬ শতাংশ অথবা মোট বাজেটের অন্তত ২০ শতাংশ ব্যয় করা উচিত।

শিক্ষার ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে শিক্ষার অতি নিম্নমান। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে আওয়ামী লীগ সরকার সিদ্ধান্ত নেয় ঢালাওভাবে ছাত্রছাত্রীদের পাস করানো হবে। উচ্চ গ্রেড দেওয়া হবে। ২০০১, ২০০৪, ২০০৬, ২০০৭ সালে এসএসসিতে পাসের হার ছিল যথাক্রমে ৩৫ দশমিক ২২, ৪৮ দশমিক ০৩, ৫৯ দশমিক ৪৭, ৫৭ দশমিক ৩৭ শতাংশ। এরপর থেকে পাসের হার বেড়েই চলেছে। ২০১৩, ২০১৪, ২০১৬ সালে পাসের হার ছিল যথাক্রমে ৮৯ দশমিক ২৮, ৯২ দশমিক ৬৭, ৮৮ দশমিক ৭০ শতাংশ। এইচএসসিতে ২০০১, ২০০৪, ২০০৬ সালে পাসের হার ছিল যথাক্রমে ২৮ দশমিক ৪১, ৪৭ দশমিক ৭৩, ৬৩ দশমিক ৯২ শতাংশ। এরপর পাসের হার খুব দ্রুত বাড়তেই থাকে। ২০১৪, ২০১৬ সালে পাসের হার ছিল যথাক্রমে ৭৮ দশমিক ৩৩ এবং ৭৪ দশমিক ৭০ শতাংশ। শিক্ষাক্ষেত্রে কী এমন জাদু হয়েছিল যে, এত বেশি সংখ্যক ছাত্রছাত্রী ভালো ফল করছিল?

ঢালাওভাবে অযোগ্য ছাত্রছাত্রীদের এভাবে ভালো ফল দেওয়ার প্রত্যক্ষ প্রভাব দেখা যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ইউনিটে ভর্তি পরীক্ষায়। গত কয়েক বছরে এগুলোতে ছাত্রছাত্রীদের পাস করার হার মাত্র ১০ থেকে ১৩ শতাংশে ওঠানামা করছে। এদিকে ২০১৪ সালের এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ইউনিটের পরীক্ষায় এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত ছাত্রছাত্রীদের ৬৬ শতাংশ ফেল করে।

এই প্রেক্ষাপটে ২০১৬ সালের পর থেকে সরকার কিছুটা লাগাম টানার চেষ্টা করেছে। এতে পাসের হার আগের তুলনায় কিছুটা কমার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ২০১৭ সালে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ জানিয়েছেন, তারা এখন শিক্ষার গুণগত মানের ওপর জোর দিচ্ছেন। খাতা মূল্যায়ন যেন সঠিকভাবে হয়, সেদিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর মানে তারা আগে বছরের পর বছর সেটা করেননি।

এছাড়া বর্তমানে যে শিক্ষাব্যবস্থা চালু আছে আমাদের দেশে, সেটা আদৌ আমাদের বেকারত্ব সমস্যাকে মোকাবিলা করতে পারবে না। দেশের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা এবং কারিকুলাম কোনোভাবেই কর্মোপযোগী নয়। সরকার দেশে একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করছে। তাতে এমন সব বিষয় পড়ানো হচ্ছে যেগুলো শেষ পর্যন্ত কোনোভাবেই কর্মসংস্থানের জন্য উপযোগী নয়।

দেশে বেকারত্বের এই ভয়ঙ্কর মহামারির মধ্যেই আমরা দেখি, এই দেশে নানা সেক্টরের মিড টু আপার লেভেল ম্যানেজমেন্টের নানা পদে কাজ করে কয়েক লক্ষ বিদেশি, বিশেষ করে ভারতীয় ও শ্রীলংকার নাগরিক। বৈধ এবং অবৈধ পথে তারা  ৮৫ হাজার কোটি টাকার বেশি আয় করে নিয়ে যায়। এই দেশের প্রায় সোয়া এক কোটি মানুষ বিদেশে শ্রম বিক্রি করে ১৭/১৮ বিলিয়ন ডলার উপার্জন করে। তার অর্ধেকের বেশি অর্থ এই দেশ থেকে উপার্জন করে নিয়ে যায় মাত্র কয়েক লাখ বিদেশি কর্মী।

এর মূল কারণ আমাদের অদক্ষ কর্মী। বছর দেড়েক আগের বিবিসি বাংলার এই সংক্রান্ত একটি রিপোর্টে বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক প্রেসিডেন্ট ফজলুল হক বলেন, ‘দেশে মিড লেভেল ও টপ লেভেলের প্রফেশনালদের বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষিত হয়ে আসা কর্মীরা চাহিদা মেটাতে পারছে না। ফলে বাধ্য হয়ে বিদেশ থেকে এসব কর্মী আমদানি করতে হচ্ছে।’ দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে সরকারের বিনিয়োগ অনেক কম। কিন্তু সেই সামান্য বিনিয়োগটাও একটা বড় অংশ অপচয় করা হয় এভাবে মানহীন এবং শ্রমবাজারের সঙ্গে সম্পর্কহীন ডিগ্রি দেওয়ার মাধ্যমে।

উন্নত দেশগুলোতে ৫৫ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ভোকেশনাল শিক্ষা, অথচ এই ক্ষেত্রে আমাদের অংশ অনেক কম, মাত্র ১৪ শতাংশ। এই শিক্ষার প্রতি এই দেশের মানুষের এক ধরনের অশ্রদ্ধা আছে। কিন্তু সরকারকে এই ব্যাপারে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে আগ্রহী দেখি না।

ওদিকে মূলত মধ্যপ্রাচ্যে যে শ্রমিকরা যায় বাংলাদেশ থেকে তারাও অদক্ষ এবং অপ্রশিক্ষিত হওয়ার কারণে আমাদের পার্শ্ববর্তী অনেক দেশের তুলনায় তারা অনেক কম উপার্জন করে।  দক্ষতা না থাকার কারণে তারা অনেক পেশায় সেখানে যেতেও পারে না। ওদিকে নানা কারণে দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির হয়ে থাকার কারণে দেশের অভ্যন্তরেও শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ ক্রমাগত সীমিত হয়ে আসছে। 

আমরা যখন আজ বেকারত্বের ভয়াবহ সমস্যা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছি, তখন আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ শ্রীলংকা দেখিয়েছে একটা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা যদি আন্তরিকভাবে চান, তাহলে জনগণের জন্য কতটা কল্যাণ নিশ্চিত করতে পারেন। এই দেশটি কর্মমুখী শিক্ষাকে এতই গুরুত্ব দেয় যে, তরুণদের দক্ষতা নিশ্চিত করার জন্য স্বতন্ত্র মন্ত্রণালয় আছে ‘Ministry of Skills Development and Vocational Training’ নামে। আগেই উল্লেখ করেছি, দীর্ঘকাল গৃহযুদ্ধের মধ্যে থাকলেও শ্রীলংকায় শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা এই অঞ্চলে সর্বনিম্ন–মাত্র ৭ দশমিক ৮ শতাংশ।

এই দেশের বেকার জনগোষ্ঠীর একটা সম্ভাব্য কর্মসংস্থান হতে পারতো উদ্যোক্তা হওয়া। উদ্যোক্তা হতে পারলে একদিকে যেমন নিজের কর্মসংস্থান হতো অন্যদিকে সেটা আরও কিছু মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারতো। কিন্তু সেই ক্ষেত্রে প্রয়োজন যথোপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও পুঁজি। এই রাষ্ট্র এমন ভয়ঙ্কর পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে ব্যাংক থেকে টাকা ঋণ নিয়ে মেরে দেবে এমন মানুষকে শত শত বা হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয় কিন্তু একজন প্রকৃত উদ্যোক্তা তার ব্যবসা শুরু কিংবা সম্প্রসারণ করার জন্য ঋণ পান না।

আজ আমরা এখানে বসে যে আলোচনাগুলো করছি সেই আলোচনাগুলো শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল আরও অনেক আগে। বর্তমান পৃথিবীতে এক নতুন বিপদ এসে হাজির হয়েছে–আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সভিত্তিক অটোমেশন। এটা দূরের ব্যাপার না, এরমধ্যেই বাংলাদেশ গার্মেন্ট সেক্টরে এই ধরনের প্রযুক্তি এসে অসংখ্য কাজকে অপ্রয়োজনীয় করে তুলেছে। বহু গার্মেন্টস কারখানায় অনেক শ্রমিক কাজ হারাচ্ছেন। অথচ সেই আলোচনাগুলো আমরা এখনও ঠিকভাবে শুরুই করতে পারছি না।

বাংলাদেশ তার ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডে সময়টার অর্ধেক হেলায় হারিয়ে এসে তার কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর চরম বেকারত্ব নিয়ে আলোচনা করছে। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সঠিক ব্যবহার করে দেশের উন্নতি তো হয়ইনি বরং এই বেকার জনগোষ্ঠী প্রচণ্ড সামাজিক অস্থিরতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভবিষ্যতে এই সংকট বাড়বে আরও বহুগুণে। শিক্ষার বহুমুখীকরণ, কর্মমুখী শিক্ষায় উদ্বুদ্ধকরণ, দক্ষ ও যোগ্য শ্রমশক্তি তৈরি, বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো, নতুন নতুন কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি, উদ্যোক্তা তৈরির সহায়ক পরিবেশ বানানো ছাড়া বেকারত্বের এই অভিশাপ থেকে মুক্তি নেই।      

লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট। জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে বিএনপির দলীয় সংসদ সদস্য

 

/এসএএস/এমএনএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ