X
বুধবার, ১০ আগস্ট ২০২২
২৬ শ্রাবণ ১৪২৯

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের নিরাপত্তা কোথায়, প্রশ্ন পর্যটকদের

আবদুল আজিজ, কক্সবাজার
২৩ ডিসেম্বর ২০২১, ২৩:১৯আপডেট : ২৩ ডিসেম্বর ২০২১, ২৩:১৯

কক্সবাজারে স্বামী-সন্তানকে জিম্মি করে নারী পর্যটককে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। প্রকাশ্যে তুলে নিয়ে ওই নারীকে ধর্ষণের ঘটনায় কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পর্যটকরা। তারা বলছেন, কক্সবাজার সৈকতের নিরাপত্তা কোথায়?

এরই মধ্যে ঘটনায় জড়িতদের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে র‌্যাব বলছে, তারা দুই জনকে শনাক্ত করেছে। এখনও তাদের গ্রেফতার করতে পারেনি। এর মধ্যে একজন শহরের বাহারছড়া এলাকার আব্দুল করিমের ছেলে আরিফুল ইসলাম আশিক, অপরজন তার সহযোগী ইস্রাফিল হুদা জয়। এই দুই জনসহ সাত জনকে আসামি করে বৃহস্পতিবার (২৩ ডিসেম্বর) রাত সাড়ে ৮টার দিকে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় মামলা করেন ভুক্তভোগী নারীর স্বামী।

শহরের বাহারছড়া এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, কক্সবাজারে সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের মূলহোতা আশিক। তার নেতৃত্বে রয়েছে ৩২ জনের একটি অপরাধী চক্র। সবাই তাদের চেনে। আশিক বড় ধরনের অপরাধী। তার রয়েছে ৩২ জনের সিন্ডিকেট। তারা একেকজন একেকভাবে বিভক্ত হয়ে আবার কখনও দুই-তিন জন দলভুক্ত হয়ে শহরের অলিগলিতে চুরি, বিচে, ছিনতাই ও খুনসহ নানা ধরনের অপরাধ কর্মকাণ্ড করে বেড়ায়। পর্যটকদের তেমন কোনও নিরাপত্তা নেই। তবে অভিযোগ পেলে ট্যুরিস্ট পুলিশ আসে।

পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর রাতে কক্সবাজারের গুড ভাইব কটেজ নামে একটি রিসোর্টে অস্ট্রেলিয়ান এক নারীকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছিল। ওই সময়ে ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে ওই নারী রক্ষা পান। এ ঘটনায় রিসোর্টের দুইজন কর্মচারীকে আটক করেছিল পুলিশ। তারা হলো রামু উপজেলার পেঁচারদ্বীপ এলাকার কলিম উল্লাহর ছেলে আনসার উল্লাহ (২৪) ও আবদুল মুনাফের ছেলে আবদুল গফুর (২০)। পরে তারা জামিনে মুক্ত হয়। 

পুলিশ ও র‌্যাবের তথ্য অনুযায়ী, আরিফুল ইসলাম আশিক ও তার সহযোগী আব্দুর রহমান জয় ছিনতাইকারী। আশিকের বিরুদ্ধে ১৬টি মামলা রয়েছে। তার সহযোগীর বিরুদ্ধে তিনটি মামলা আছে। একাধিকবার গ্রেফতার হয়েছে দুজন।

ধর্ষণের শিকার নারীর ভাষ্য, ‘স্বামী-সন্তান নিয়ে বুধবার সকালে ঢাকা থেকে কক্সবাজারে পৌঁছেন। উঠেন শহরের হলিডে মোড়ের একটি পাঁচ তলা হোটেলে। ওই দিন বিকালে স্বামী-সন্তানকে নিয়ে লাবণি বিচে যান। রাতে হোটেলে ফেরার পথে এক যুবকের সঙ্গে তার স্বামীর ধাক্কা লাগে। এতে স্বামীর সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ে ওই যুবক। বাধা দিলে তার সঙ্গেও তর্কে জড়ায় যুবক। ওই সময় আরও দুই যুবক ঘটনাস্থলে এসে হাজির হয়। তারা স্বামী-সন্তানকে ইজিবাইকে তুলে দিয়ে ওই নারীকে আলাদা করে ফেলে। পরে ওই এলাকার একটি ঝুপড়ি ঘরে নিয়ে তিন জনে পালাক্রমে ধর্ষণ করে। এরপর স্বামী-সন্তানকে হত্যার ভয় দেখিয়ে একটি হোটেলে নিয়ে যায়। সেখানে এক যুবক স্ত্রী পরিচয় দিয়ে তাকে হোটেলের রুমে নিয়ে আবারও ধর্ষণ করে। শেষে রুমের দরজা বাইর থেকে আটকে পালিয়ে যায়। হোটেল থেকে বেরিয়ে ৯৯৯ নম্বরে কল করেন ওই নারী। পুলিশের কোনও সহায়তা না পেয়ে র‌্যাবকে খবর দেন। তখন হোটেলে আসে র‌্যাব।’

ওই নারীর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে সৈকতের লাবণী পয়েন্টের সানি বিচ এলাকার ঝুপড়ি ঘরে তাকে ধর্ষণ করেছে তিন যুবক। বৃহস্পতিবার বিকালে সেখানে গিয়ে দেখা যায় সুনসান নীরবতা, স্তব্ধ ওই এলাকা। আশপাশে লোকজন নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে চোখে পড়েনি।

আরিফুল ইসলাম আশিক ও তার সহযোগী ইস্রাফিল হুদা জয়

স্থানীয় বাসিন্দা নুরুল হক বলেন, ‘প্রতিরাতে সৈকতের বিচ ও ঝাউবাগানে গাঁজা ও জুয়াড়িদের আসর বসে। শহরের সব ছিনতাইকারী, নেশাখোর ও অপরাধীরা এখানে আড্ডা দেয়। পুলিশ সন্ধ্যার পর এখানে আসে না।’

স্থানীয় বাসিন্দা আবুল মঞ্জুর বলেন, ‘সন্ধ্যা হলেই লাবণী বিচ থেকে শুরু করে কবিতা চত্বর ও ডায়াবেটিক পয়েন্ট এবং ঝাউবাগানের আশপাশে কোনও নিরাপত্তা থাকে না। বলতে গেলে অপরাধীদের দখলে থাকে এসব এলাকা। ফলে এসব এলাকায় প্রতিনিয়ত কোনও না কোনও অপরাধ সংঘটিত হয়। এসব এলাকায় জেলা পুলিশ ও ট্যুরিস্ট পুলিশের কোনও তৎপরতা নেই। এখানে পুলিশ নিষ্ক্রিয়। জেনেও ব্যবস্থা নেয় না তারা।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন পর্যটক বলেছেন, সন্ধ্যা হলেই ভুতুড়ে এলাকা মনে হয়। কোনও লোকজন নেই। অপরাধী ও ছিনতাইকারীরা আড্ডা দেয়। জেলা পুলিশ ও ট্যুরিস্ট পুলিশের তৎপরতা আমাদের চোখে পড়ে না।

জানতে চাইলে ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার জোনের অতিরিক্ত সুপার মোহাম্মদ মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘পর্যটক ধর্ষণের বিষয়টি জানার পরপরই ট্যুরিস্ট পুলিশ তদন্ত শুরু করে। আমরা বিষয়টি তদন্ত করছি।’

ঝাউবাগান ও বিচে পর্যটকদের নিরাপত্তা না থাকার বিষয়টি অস্বীকার করে মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে ঝাউবাগানের শৈবাল ও কবিতা চত্বরে পুলিশ বক্স রয়েছে। সেখানে পুলিশ নিয়মিত টহলে থাকে। সেখানে অপরাধীদের বিচরণ কিংবা আড্ডা দেওয়ার সুযোগ নেই।’

জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘পুলিশ নিষ্ক্রিয়তার বিষয়টি সঠিক নয়। হোটেল মোটেল জোনে যে নারী ধর্ষণের অভিযোগে ৯৯৯ ফোন দেওয়ার কথা বলছেন, তা আমরা জানি না। কারণ, ৯৯৯ থেকে জেলা পুলিশের কাছে কোনও ফোন আসেনি। তারপরও খবর পেয়ে জেলা পুলিশ সুপার মো. হাসানুজ্জামান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং ভিকটিমের সঙ্গে কথা বলেছেন। ভিকটিম যদি থানায় মামলা দেন তাহলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

র‌্যাব-১৫ কক্সবাজারের অধিনায়ক লে. কর্নেল খায়রুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘পর্যটক ধর্ষণের বিষয়টি জানার পরপরই র‌্যাবের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে যায়। জিয়া গেস্ট ইন হোটেল থেকে ওই নারীকে উদ্ধার করেছি আমরা। উদ্ধার হওয়ার পর ওই নারী র‌্যাবকে জানান, তার আট মাসের সন্তান ও স্বামীকে জিম্মি করে হত্যার ভয় দেখিয়ে জিয়া গেস্ট ইন হোটেলে ধর্ষণ করেছিল। পরে ওই নারীকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করেছি। র‌্যাব তদন্ত করে দুই জনকে শনাক্ত করেছে। তাদের দ্রুত গ্রেফতার করা হবে।’ 

কক্সবাজার র‌্যাব-১৫ সিপিসি কমান্ডার মেজর মেহেদী হাসান বলেন, পুরো ঘটনা তদন্ত করে এবং সিসিটিভি ফুটেজ দেখে ঘটনায় জড়িত দুই জনকে শনাক্ত করেছি। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য জিয়া গেস্ট ইন হোটেলের ম্যানেজার রিয়াজ উদ্দিন ছোটনকে আটক করা হয়েছে। শনাক্তকারীদের ধরতে র‌্যাবের অভিযান অব্যাহত আছে।’ 

এরই মধ্যে জিয়া গেস্ট ইন হোটেলের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করেছে র‌্যাব। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, তিন যুবক অটোরিকশায় এক নারীকে নিয়ে আসে। দুই জন ওই নারীর সঙ্গে ছিল। আরেকজন হোটেলের রুম বুকিং দেয়। সেসময় হোটেলের রিসেপশনে ছিল হোটেলের ব্যবস্থাপক ছোটন। তিন যুবক ওই নারীকে নিয়ে ওপরে চলে যায়। রাত সাড়ে ১০টার দিকে তিন যুবক বেরিয়ে গেলেও ওই নারীকে নামতে দেখা যায়নি।

জিয়া গেস্ট ইন হোটেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাবিবুর রহমান বলেন, ‘স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে হোটেলের রুম ভাড়া নিয়েছিল তারা। ৪০ মিনিট পর রুম ছেড়ে চলে যায়। রাত ১১টার দিকে ওই নারীকে নিয়ে হোটেলে আসে র‌্যাব। এ সময় র‌্যাব হোটেলের সিসিটিভির ফুটেজ থেকে শুরু করে যাবতীয় প্রমাণাদি নিয়ে যায়। হোটেল থেকে কোনও নারীকে র‌্যাব উদ্ধার করেনি। কাজেই এই ঘটনায় হোটেল কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।’

কক্সবাজার সদর মডেল থানার ওসি (তদন্ত) বিপুল চন্দ্র দে বলেন, ‘এ ঘটনায় থানায় কেউ অভিযোগ করেনি। তবে ঘটনা শুনে মাঠে নেমেছে পুলিশের একটি দল। অভিযুক্ত আরিফুল ইসলাম আশিক ও জয় চিহ্নিত ছিনতাইকারী। তাদের ধরতে পুলিশ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’

কক্সবাজার হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. আবুল কাসেম শিকদার বলেন, ‘ঘটনাটি শুনে আমি দ্রুত জিয়া গেস্ট ইন হোটেল পরিদর্শন করি। যতটুকু জানি ওই স্বামী-স্ত্রীর পরিচয়ে এক নারী ও পুরুষ রুম ভাড়া নিয়ে পরে ছেড়ে দেয়। বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে র‌্যাব হোটেল ম্যানেজার রিয়াজ উদ্দিন ছোটনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যায়।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘যদি নারী ধর্ষণের ঘটনা সত্য হয়, তাহলে কক্সবাজার পর্যটন শিল্পের জন্য অসনি সংকেত।’

/এএম/
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
রুশ পর্যটকদের নিষিদ্ধ করুন, পশ্চিমাদের জেলেনস্কি
রুশ পর্যটকদের নিষিদ্ধ করুন, পশ্চিমাদের জেলেনস্কি
কুমিরের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে ফিরলেন যুবক
কুমিরের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে ফিরলেন যুবক
নারী উদ্যোক্তাকে হত্যার অভিযোগে স্বামী ও শিক্ষিকা গ্রেফতার
নারী উদ্যোক্তাকে হত্যার অভিযোগে স্বামী ও শিক্ষিকা গ্রেফতার
নিষিদ্ধ আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের আবু তাল্লাহর খোঁজে আসাম পুলিশ
নিষিদ্ধ আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের আবু তাল্লাহর খোঁজে আসাম পুলিশ
এ বিভাগের সর্বশেষ
তেল কম দেওয়ায় চট্টগ্রামে ৯ ফিলিং স্টেশনকে জরিমানা 
তেল কম দেওয়ায় চট্টগ্রামে ৯ ফিলিং স্টেশনকে জরিমানা 
বাসে ডাকাতি-ধর্ষণ: ৪ জনের স্বীকারোক্তি, রিমান্ডে ৬
বাসে ডাকাতি-ধর্ষণ: ৪ জনের স্বীকারোক্তি, রিমান্ডে ৬
রাত ৮টার পর বেচাকেনা, ১৬ প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা
রাত ৮টার পর বেচাকেনা, ১৬ প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা
তরুণীকে ধর্ষণের মামলায় নাইটগার্ড কারাগারে 
তরুণীকে ধর্ষণের মামলায় নাইটগার্ড কারাগারে 
প্যারামেডিক্যাল পাস করে ‘শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ’
প্যারামেডিক্যাল পাস করে ‘শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ’