ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফেনী-৩ (সোনাগাজী ও দাগনভূঞা) আসনে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু প্রচার-প্রচারণায় ভোটের মাঠে এগিয়ে রয়েছেন। মনোনয়ন পাওয়ার পর থেকেই তাকে ঘিরে ভোটারদের মাঝে আগ্রহ ও আলোচনা তৈরি হয়। প্রচারণার সময় দলীয় নেতাকর্মীর পাশাপাশি নারী-পুরুষ ও সাধারণ ভোটারদের ধানের শীষে ভোট চাইতে দেখা গেছে। এ অবস্থায় আসনটিতে আবদুল আউয়াল মিন্টুকে এগিয়ে রেখেছেন এবং জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী ভোটাররা।
আবদুল আউয়াল মিন্টু ১৯৪৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ফেনী জেলার দাগনভূঁইয়া উপজেলার আলাইয়াপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা হাজী শফীউল্ল্যাহ একজন সমাজসেবক ছিলেন। আউয়াল মিন্টু ফেনী সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬৪ সালে এসএসসি ও কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে ১৯৬৬ সালে এইচএসসি পাস করেন। মেরিন একাডেমি চট্টগ্রাম থেকে ১৯৬৮ সালে বিএসসি ইন মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি অর্জন করেন। এ ছাড়া নিউইয়র্ক স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে ১৯৭৩ সালে মেরিন ট্রান্সপোর্টেশন এ উচ্চতর ডিগ্রি ও ১৯৭৭ সালে এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন।
তিনি ব্যবসায়ী ও এফবিসিসিআইয়ের সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং রাজনীতিবিদ। ন্যাশনাল ব্যাংক লিঃ ও জেনারেল লাইফ ইন্সুরেন্সের পরিচালক। মাল্টিমোড গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। পরে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা হন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচনের আগে গ্রেফতার হন এবং জামিন পেয়ে ঢাকা মহানগর বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মনোনীত হন।
দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার পর থেকে সভা-সমাবেশ ও জনসংযোগে ব্যস্ত সময় পার করেছেন আবদুল আউয়াল মিন্টু। নির্বাচনি প্রচারণা শুরুর পর প্রতিদিনই গেছেন বিভিন্ন গ্রামে, শুনছেন ভোটারদের কথা। তাদের কাছে তুলে ধরেছেন ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনাও।
প্রচারণা শুরুর পর থেকে বিএনপির এই জ্যেষ্ঠ নেতার নির্বাচনি কর্মসূচি ছিল ধারাবাহিক। সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়ে নির্বাচনি এলাকায় এলাকায় ঘুরেছেন। এর মধ্যে ২৮ জানুয়ারি সোনাগাজী উপজেলার মতিগঞ্জ ইউনিয়নের ১০টি স্থানে জনসংযোগ করেন। মতিগঞ্জ ইউনিয়নের ডাকবাংলো থেকে মঙ্গলকান্দি স্কুল, দারোগারহাট, বিজয়নগর, শান্তিনগর, মতিগঞ্জ বাস স্টেশন, আবুল মামার দরবার, স্বরাজপুর, জিতপুর তেমুহনি, রিয়াজ উদ্দিন মুন্সিবাড়ি ও সুলেখালিতে জনসংযোগ করেন তিনি। জনসংযোগের সময় গ্রামীণ রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে গ্রামবাসী হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান। এ সময় তিনিও বিভিন্ন স্থানে গাড়ি থেকে নেমে তাদের সঙ্গে হাত মেলান এবং শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। কোথাও কোথাও তিনি গাড়ির ছাদ খুলে হ্যান্ড মাইকে বক্তব্যও দেন। অংশ নেন পথসভায়। গ্রামের পথে পথে তার গাড়িবহর ঘিরে ছিল উৎসুক জনতার ভিড়।
বিভিন্ন পথসভায় মিন্টু বলেছেন, ‘বিএনপি মানুষের জন্য রাজনীতি করে। দেশ পরিচালনার অভিজ্ঞতা একমাত্র এই দলেরই আছে। দেশের বিদ্যমান সমস্যার সমাধান চাইলে ধানের শীষে ভোট দেওয়ার কোনও বিকল্প নেই।’
এ ছাড়া সোনাগাজী সদর ইউনিয়নের তেমুহনি কাদির ডিলার, চরখোয়াজ স্কুল সংলগ্ন, ফুলকুঁড়ি নগর, মনগাজী বাজার, হোসাইনিয়া মাদ্রাসা, ভৈরব চৌধুরী বাজার ও সাহাপুর এলাকায় জনসংযোগ করেন। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য শাহেনা আক্তার, সোনাগাজী উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক জয়নাল আবেদীন, সদস্যসচিব সৈয়দ আলম ভূঞা, যুগ্ম আহ্বায়ক মনোয়ার হোসেন, সোনাগাজী উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক খুরশিদ আলম ভূঞা, সদস্যসচিব প্রবীর ও মতিগঞ্জ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আমিন উদ্দিনসহ দলীয় নেতাকর্মীরা।
সেখানে গ্রামবাসীর উদ্দেশে মিন্টু বলেছেন, ‘বর্তমান বাংলাদেশে যে নাজুক অর্থনৈতিক অবস্থা রয়েছে, তা থেকে উত্তরণের জন্য এ মুহূর্তে বিএনপিকে প্রয়োজন। বিএনপির অতীত অভিজ্ঞতা রয়েছে দেশকে অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার। সে অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বিএনপি দেশকে শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ হিসেবে গড়ে তুলবে। একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত হচ্ছে কর্মসংস্থান তৈরি করা। বৃহৎ একটি জনগোষ্ঠীকে বেকার রেখে কোনও দেশই অর্থনৈতিকভাবে উন্নতি করতে পারে না। এই দেশকে অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে নিতে হলে সবার আগে কর্মসংস্থান তৈরি করে বেকার সমস্যার সমাধান করতে হবে। এ জন্য বড় পরিকল্পনা রয়েছে বিএনপির।’
স্থানীয় ভোটারদের বক্তব্যেও প্রতিফলিত হচ্ছে তার প্রতি সমর্থন। সোনাগাজী উপজেলার মতিগঞ্জ ইউনিয়ন পালগিরি গ্রামের ভোটার জাকির হোসেন বলেন, ‘আবদুল আউয়াল মিন্টু একজন ভালো মানুষ। আমরা চাই, আমাদের এলাকা সন্ত্রাসমুক্ত হোক। তিনি এমপি হলে ভোটের পর যেন আমাদের খোঁজ রাখেন, সে আশা রাখি। এই আসনে যে কজন প্রার্থী রয়েছেন, তাদের মধ্যে আউয়াল মিন্টুর জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি।’
সোনাগাজী সদর ইউনিয়নের ফুলকুঁড়ি নগরের বাসিন্দা রাজিব হোসেন বলেন, ‘আবদুল আউয়াল মিন্টু জনপ্রিয় নেতা। তার গণসংযোগে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল অভূতপূর্ব। আশা করছি তিনি বিপুল ভোটে জয়লাভ করবেন।’
নেতাকর্মীরা জানান, সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার রক্ষা ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে আবদুল আউয়াল মিন্টু দৃঢ় অবস্থানে রয়েছেন। এবার তিনিই এই আসনে জিতবেন।
ফেনী-৩ (সোনাগাজী ও দাগনভূঞা) আসনে মোট ভোটার ৫ লাখ ৩ হাজার ৮৭ জন। এর মধ্যে দাগনভূঞা উপজেলায় ২ লাখ ৪৮ হাজার ৩৮৪ জন। পুরুষ ভোটার ১ লাখ ২৮ হাজার ৯৭১ জন, নারী ১ লাখ ১৯ হাজার ৪১২ জন ও তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার একজন। এ উপজেলায় নিবন্ধিত নতুন ভোটারের সংখ্যা ১০ হাজার ৯৭০।
সোনাগাজী উপজেলায় ২ লাখ ৫৪ হাজার ৭০৩ ভোটার রয়েছেন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৩০ হাজার ৮২৯ জন, নারী ১ লাখ ২৩ হাজার ৮৭৩ জন ও তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার একজন। এ উপজেলায় নতুন ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছেন ৯ হাজার ৭৪২ জন। এই আসনের দাগনভূঞা উপজেলার আটটি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় ভোটকেন্দ্র রয়েছে ৭৮টি ও ভোটকক্ষ ৪৫৭টি। সোনাগাজী উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় ভোটকেন্দ্র রয়েছে ৮৩টি ও ভোটকক্ষ ৪৬০টি।
ফেনী-৩ আসনে বিএনপি, ১১ দলীয় জোটের জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ ৯ জন প্রার্থী নির্বাচন করছেন। তারাও প্রচারণা চালিয়েছেন। তবে আবদুল আউয়াল মিন্টু শুধু পথেঘাটে গণসংযোগে সীমাবদ্ধ থাকেননি। বরং ভোটারদের পেশা, সামাজিক পরিচয় ও জীবনবাস্তবতাকে গুরুত্ব দিয়ে আলাদা আলাদা শ্রেণিতে ভাগ করে কথা বলেছেন এবং তাদের মতামত গ্রহণ করেন। ব্যবসায়ী সমাজের সঙ্গে বৈঠকে উঠে এসেছে শিল্প ও কর্মসংস্থানের সংকট। মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে আলোচনায় এসেছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মর্যাদা রক্ষার প্রশ্ন। প্রবাসী ও প্রবাসী সংগঠনের সঙ্গে মতবিনিময়ে গুরুত্ব পেয়েছে রেমিট্যান্স ব্যবস্থাপনা ও প্রবাসীদের সামাজিক নিরাপত্তা।
একইভাবে সিএনজি অটোরিকশা চালক ও মালিক সমিতির সঙ্গে আলোচনায় পরিবহন খাতের বাস্তব সমস্যা এবং জীবিকা সংকটের কথা উঠে এসেছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে বৈঠকে তিনি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। এসব মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে তার নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, নির্বাচন কার্যক্রম পরিচালনা অফিস দুলামিঞা কটন মিল এবং স্থানীয় পার্টি সেন্টার মনপুরা কাবাব হাউজে। এই বৈঠকগুলোতে অংশগ্রহণকারীদের অভিন্ন বক্তব্য—একজন প্রার্থী যখন ভোটারকে শুধু সংখ্যা হিসেবে নয়, বরং মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করেন, তখন তা নির্বাচনি রাজনীতিতে ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। অনেকেই মন্তব্য করেছেন, দীর্ঘদিন পর এমন একজন প্রার্থীকে কাছ থেকে পেয়েছেন, যিনি শোনেন, নোট নেন এবং প্রতিশ্রুতি দিতে গিয়ে বাস্তবতার কথা বলেন।
আসনটির এমন কোনও এলাকা নেই, যেখানে আবদুল আউয়াল মিন্টুর পদচারণা পড়েনি—এমন ধারণাই তৈরি হয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। গ্রাম থেকে গ্রাম, বাজার থেকে পাড়া—প্রতিটি জায়গায় তার উপস্থিতি ভোটারদের সঙ্গে এক ধরনের আত্মিক সম্পর্ক তৈরি করেছে। ভোটারদের মতে, এই সম্পর্ক শুধু নির্বাচনের সময়ের জন্য নয়; এটি ভবিষ্যতের প্রত্যাশার সঙ্গেও যুক্ত। ভোটারদের আশা, এই সম্পর্কেরই প্রতিফলন ঘটবে ব্যালট বাক্সে। তাকে জয়ের মালা পরানোর জন্য এখন অপেক্ষায় আছেন তারা।
আবদুল আউয়াল মিন্টু বিভিন্ন সভায় বলেছেন, নির্বাচিত হলে ফেনী-৩ আসনের দুই উপজেলায় কোনও ধরনের বৈষম্য না রেখে সর্বোচ্চ উন্নয়নের নজির স্থাপন করবেন। তার প্রতিশ্রুতির কেন্দ্রে রয়েছে অবকাঠামো উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা। একই সঙ্গে স্থানীয় সমস্যা সমাধানে সরাসরি জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার অঙ্গীকারও বারবার উচ্চারিত হয়েছে।









