খসে পড়ছে দেয়ালের আস্তরণ। ঘরের কাঠে বাসা বেঁধেছে ঘুনপোকা। কোথাও চাল নেই, কোথাও মরিচা ধরা টিনও টিকে আছে কেবল নামেমাত্র। ভাঙা টিনের বেড়া পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়ে ঘাস-আগাছায় ভরা মেঝে। দেয়ালে শ্যাওলার আস্তরণ, পড়ে আছে পুরোনো একটি খাট। চুরি হয়ে গেছে জানালার লোহার গ্রিল, খসে পড়ছে ইটও।
দেখলে বোঝার উপায় নেই—এটি এমন একজন মানুষের বাড়ি, যিনি পাকিস্তান গণপরিষদে দাঁড়িয়ে সর্বপ্রথম বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি তুলেছিলেন। এটি ভাষাসৈনিক ও শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের একসময়কার আবাসস্থল।
শনিবার দুপুরে কুমিল্লা নগরীর ঝাউতলা এলাকায় অবস্থিত ঐতিহাসিক বাড়িটি ঘুরে দেখা যায়, দীর্ঘদিনের অযত্ন আর অবহেলায় বাড়িটি এখন অনেকটাই ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। নেই বিদ্যুৎ সংযোগ, নেই পর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণ। বাড়ির আনাচে-কানাচে মশা ও বিভিন্ন পোকামাকড়ের উপদ্রব। সব মিলিয়ে ঐতিহাসিক স্থাপনাটি এখন যেন পরিত্যক্ত এক বাড়ি।
যে বাড়ি থেকে বাংলার অধিকারের স্বপ্ন
কুমিল্লার মুক্তিযোদ্ধা, ইতিহাস গবেষক ও প্রবীণ নাগরিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের রাজধানী করাচিতে গণপরিষদের অধিবেশন শুরু হয়। এর দুই দিন পর, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ওই অধিবেশনে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তই সর্বপ্রথম বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উত্থাপন করেন।
অধিবেশনে স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, গণপরিষদের কার্যবিবরণী ইংরেজি ও উর্দু ভাষায় লেখা হচ্ছে। অথচ সমগ্র পাকিস্তানের ৫৬ শতাংশ মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলেন। তাই ইংরেজি ও উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকেও গণপরিষদের ভাষা হিসেবে ব্যবহারের দাবি জানান তিনি।
তার এই প্রস্তাবে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ক্ষুব্ধ হন। এরপর পাকিস্তান সরকারের রোষানলে পড়ে কয়েকবার কারাবরণ করতে হয় ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে।
ভাষার অধিকারের সেই দাবি পরবর্তী সময়ে বাঙালির ভাষা আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ভিত্তি হয়ে ওঠে। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত হয়ে ওঠেন বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রামের অন্যতম সাহসী কণ্ঠ।
ভাষার দাবির সেই মানুষকে ধরে নিয়ে যায় হানাদাররা
ভাষা আন্দোলনে ভূমিকা রাখার কারণে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত আগে থেকেই পাকিস্তানি শাসকদের টার্গেটে ছিলেন বলে জানান স্থানীয় ইতিহাস গবেষকরা।
১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ গভীর রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কুমিল্লা নগরীর ধর্মসাগরের পশ্চিম পাড়ের এই বাড়ি থেকে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ও তার ছেলে দিলীপ কুমার দত্তকে ধরে নিয়ে যায়। পরে তাদের কুমিল্লা সেনানিবাসে নিয়ে অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়।
৮৫ বছর বয়সী এই প্রবীণ রাজনীতিক ও তার ছেলে দিলীপ কুমার দত্তকে পরে হত্যা করা হয়। তবে তাদের মরদেহের সন্ধান আর পায়নি পরিবার। যে বাড়ি একসময় একজন ভাষাসংগ্রামী ও মুক্তিযুদ্ধের শহীদের স্মৃতি বহন করত, সেই বাড়িই এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ার অপেক্ষায়।
যাদের নিয়ে চর্চা করার কথা, তারাই অবহেলিত
শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্মৃতি সংরক্ষণ ও পাঠাগার বাস্তবায়ন পরিষদের সভাপতি ও কুমিল্লার সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শাহ মোহাম্মদ সেলিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “আমরা যাদের নিয়ে চর্চার কথা, তারা অবহেলিত। এই বাড়িটি এখন ঝোপঝাড়ে পরিপূর্ণ। অথচ আমাদের উচিত ছিল আমাদের আগামী প্রজন্মকে বিষয়গুলো জানানো।”
তিনি বলেন, “ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলাদেশের প্রথম মানুষ, যিনি ভাষাকে আশ্রয় করে আমাদের স্বাধিকার আন্দোলনের স্বপ্ন দেখেছিলেন। তার সাহস আর স্বপ্ন দেখানোর ভঙ্গি ইতিহাসের অধ্যায় হোক—এটাই চাই। তার বাড়িটি সংরক্ষণের রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নিলে দেশের মানুষ ইতিহাস জানবে।”
কুমিল্লার একার নয়, বাংলাদেশের সম্পদ
ইতিহাসবিদ, গবেষক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আহসানুল কবীর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত কুমিল্লার একার নয়, বাংলাদেশের সম্পদ। একটা গণপরিষদে দাঁড়িয়ে নিজের ভাষার জন্য বলার সাহস তৎকালীন সময়ে কী ব্যাপার ছিল, ভাবা যায়? অথচ তাকে আমরা ধারণ করতে পারিনি। যদি ধারণ করতাম, তার বাড়ির কি এই অবস্থা হতো?”
তিনি বলেন, “দুঃখজনক বিষয় হলো, তার স্মৃতিচিহ্ন প্রায় বিলুপ্ত। বাড়িটিকে কেন্দ্র করে আরও আগেই অনেক কিছু হতে পারতো। আমরা অপেক্ষায় আছি, এই সরকার কিছু করবেন। সেই সঙ্গে আমার দাবি, ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের এই বাড়ি থেকে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি জাদুঘরের আদলে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্মৃতি জাদুঘর হিসেবে রূপ দেওয়া হোক।”
বাড়িতেই পাঠাগার করার পরিকল্পনা
কুমিল্লা-৬ (সদর, সদর দক্ষিণ ও সিটি করপোরেশন) আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্মৃতি সংরক্ষণ ও পাঠাগার বাস্তবায়ন পরিষদের মতবিনিময় সভায় শনিবার বলেছেন, ভাষাসৈনিক ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত শুধু ভাষার ইতিহাসের অংশ নন; তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসেরও এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।
তিনি বলেন, “তার আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস যদি নতুন প্রজন্মকে জানানো না যায়, তাহলে তারা পথভ্রষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। তাই ভাষাকে আধুনিক প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে কুমিল্লায় ভাষা কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হবে। সেখানে ভাষার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ইতিহাসসম্বলিত বই থাকবে। এ ছাড়া এই পাঠাগার থেকে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।”
এমপি মনিরুল হক চৌধুরী আরও বলেন, “আমরা শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের অবহেলিত বাড়িটিকে ইতিহাসের সাক্ষী করতে চাই। তাই সেই বাড়িতেই আমরা পাঠাগারটি স্থাপনের পরিকল্পনায় সরকারের কাছে সহযোগিতা চাওয়া হবে। সেই বিষয়ে সরকারও আশা করি তৎপর থাকবে।”
ইতিহাসের সাক্ষী বাড়িটি কি বাঁচবে?
যে বাড়ি থেকে একসময় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উঠেছিল, যে বাড়ি থেকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ধরে নিয়ে গিয়েছিল ভাষাসংগ্রামী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ও তার ছেলেকে, সেই বাড়িই আজ অবহেলায় হারিয়ে যেতে বসেছে।
ইতিহাসবিদ ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের দাবি, শুধু স্মরণসভা বা আলোচনা নয়—দ্রুত বাড়িটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব নির্ধারণ করে সংরক্ষণ, সংস্কার ও স্মৃতি জাদুঘর কিংবা পাঠাগারে রূপ দেওয়া প্রয়োজন। তা না হলে নতুন প্রজন্মের কাছে ভাষা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিচিহ্ন চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে।









