‘আপনি কিডন্যাপ (অপহরণ) হয়েছেন। আমাদের কাজই হচ্ছে এটা। আপনার কোনও ক্ষতি করা হবে না। টাকা দিলে ছেড়ে দেবো। এটা করে আমরা খাই—গাজীপুরের শ্রীপুরে মাওনা চৌরাস্তা থেকে ধাক্কা দিয়ে প্রাইভেটকারে ওঠানোর পর আমাকে (চিকিৎসক) চেনেন কিনা জিজ্ঞেস করতেই অপহরণকারীরা এসব কথা বলে। পরে চোখে স্কচটেপ পেঁচিয়ে বিভিন্ন স্থানে ঘুরিয়ে ৪ ঘণ্টা পর রাত সাড়ে ১১টায় গাজীপুর মহানগরীর সালনা এলাকা থেকে এক কিলোমিটার ভেতরে এক লাখ ৩৪ হাজার ৫০০ টাকা মুক্তিপণ নিয়ে আমাকে ছেড়ে দেয় অপহরণকারীরা।’
রবিবার (১২ জানুয়ারি) দুপুরে মোবাইল ফোনে চিকিৎসক আমিনুর রহমান (৩৯) এসব কথা বলেন। এর আগে শনিবার (১১ জানুয়ারি) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের মাওনা চৌরাস্তা উড়ালসেতুর দক্ষিণ পাশ থেকে ওই চিকিৎসককে সিলভার কালার প্রাইভেটকারে তুলে নিয়ে অপহরণ করা হয়।
আমিনুর রহমান টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার কচুটি গ্রামের ইসমাইল হোসেনের ছেলে। তিনি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগে কর্মরত। রাজধানীর যাত্রাবাড়ী (শনির আখড়া) এলাকায় পরিবারসহ বসবাস করেন তিনি।
এদিকে, চিকিৎসক অপহরণের ঘটনায় স্থানীয়ভাবে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। তবে ঘটনার ২১ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও মাওনা হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আইয়ুব আলী এ বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে জানান।
রবিবার দুপুর দেড়টায় চিকিৎসক আমিনুর রহমান জানান, শনিবার বিকাল ৪টা থেকে ৭টা পর্যন্ত মাওনা চৌরাস্তা লাইফ কেয়ার হাসপাতালে চেম্বার করেছিলেন তিনি। ওই দিনই তিনি শ্রীপুরের মাওনায় প্রথম চেম্বার করেন। তিন ঘণ্টা চেম্বার শেষে ঢাকার বাসায় যাওয়ার উদ্দেশে ওই হাসপাতাল থেকে বের হয়ে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের মাওনা চৌরাস্তা উড়ালসেতুর দক্ষিণ পাশে বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। এ সময় ওই স্থানে ১০ থেকে ১২ জন যাত্রী বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। হঠাৎ সেখানে সিলভার কালারের একটি প্রাইভেটকার এসে দাঁড়ায়। তখন চালক প্রাইভেটকারের পেছনের দরজা খুলে অপেক্ষায় থাকা যাত্রীদের ঢাকা যাওয়ার জন্য আহ্বান করে।
আমিনুর রহমান বলেন, ‘আমি চালকের কথায় কোনও সাড়া দিইনি। এ সময় পেছন থেকে তিন জন (১৮ থেকে ২৫ বছর বয়স) যুবক আমাকে ধাক্কা দিয়ে প্রাইভেটকারের ভেতরে তুলে নেয়। তখন তাদের জিজ্ঞাসা করি আমাকে চেনেন কিনা। অপহরণকারীরা বলে, আপনি কিডন্যাপ (অপহরণ) হয়েছেন। আমাদের কাজই এটা। আপনার কোনও ক্ষতি করা হবে না। টাকা দিলে ছেড়ে দেবো। এটা করে আমরা খাই। পরে আমার চোখ স্কচটেপ দিয়ে পেঁচিয়ে ফেলে। গাড়ির ভেতরে তাদের সঙ্গে থাকা হাতুড়ি দিয়ে আমার হাঁটুতে আঘাত করে এবং বুকে কিলঘুষি দেয়। একপর্যায়ে গলায় রশি পেঁচানোর চেষ্টা করলে আমি হাত দিয়ে বাধা দিই। তারা প্রথমে আমার কাছে ৫ লাখ টাকা দাবি করেছিল। পরে বলেছে ৩ লাখ টাকা দিলেই হবে। তারা আমার সঙ্গে থাকা নগদ সাড়ে ৯ হাজার টাকা এবং আমার মোবাইল থেকে স্ত্রীর কাছে ফোন করে আমার নগদ নম্বরে ৪৫ হাজার, বিকাশ নাম্বারে ৫০ হাজার এবং অপহরণকারীদের বিকাশ নম্বরে ৩০ হাজার টাকা নেয়। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ায় কেউ তাদের ফলো করতেছে কিনা, এসব ভেবে বলে আর লাগবে না। চার ঘণ্টা পর রাত সাড়ে ১১টার দিকে গাজীপুর মহানগরীর সালনা এলাকা থেকে এক কিলোমিটার ভেতরে আমাকে নামিয়ে দিয়ে তারা চলে যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘অপহরণকারীরা ছেড়ে দেওয়ার আগে আমার সঙ্গে থাকা ক্রেডিট কার্ড, দুটি স্মার্টফোন (নগদ-বিকাশ নম্বর খোলা) এবং একটি ল্যাপটপ নিয়ে যায়। পরে সালনা মহাসড়কে গিয়ে এক দোকান থেকে ফোন করে বাসায় জানাই ছাড়া পাওয়ার কথা।’
এ ঘটনায় রবিবার সন্ধ্যায় তিনি শ্রীপুর থানায় লিখিত অভিযোগ করবেন বলে জানান।
শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জয়নাল আবেদীন মণ্ডল বলেন, ‘মৌখিক খবর পেয়ে আমরা মোবাইল ফোনের নম্বরে লোকেশন ট্র্যাক করি। পরে চিকিৎসকের পরিবার থেকে জানানো হয় তিনি বাসায় চলে গেছেন। এ বিষয়ে এখনও লিখিত অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’








