গাজীপুরের শ্রীপুরে মাদ্রাসাশিক্ষার্থীকে (১৬) অপহরণের অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযুক্ত যুবকের পরিবারের দাবি, এটি অপহরণ নয়। প্রেমের সম্পর্কের সূত্র ধরে ওই ছাত্রী স্বেচ্ছায় তাদের ছেলের সঙ্গে পালিয়ে বিয়ে করেছে। কোর্ট ম্যারেজের পর ছেলেটি ওই মেয়েকে বাড়িতে দিয়ে গেলে বাবা ঘরবন্দি করেন।
ঘটনার চার দিন পর শনিবার (১৮ এপ্রিল) সকালে উপজেলার নয়নপুর এলাকা থেকে ওই শিক্ষার্থীকে উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় সাত জনকে গ্রেফতার করা হলেও প্রধান আসামি আবিদ এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে।
ঘটনাটি নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট দিলে বিষয়টি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
পুলিশ জানায়, শনিবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে অভিযান চালিয়ে শ্রীপুরের গাজীপুর ইউনিয়নের নয়নপুর (এমসি বাজার) এলাকা থেকে ওই ছাত্রীকে উদ্ধার করে পুলিশ। এ সময় মামলার প্রধান আসামি আবিদসহ অন্যরা পালিয়ে যান। উদ্ধারের পর ছাত্রীর মেডিক্যাল পরীক্ষা এবং জবানবন্দি গ্রহণের জন্য আদালতে পাঠানো হয়। পলাতক আসামিদের গ্রেফতারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে।
গ্রেফতারকৃতরা হলেন- শ্রীপুর পৌরসভার কেওয়া পশ্চিম খণ্ড এলাকার সবদের আলীর ছেলে সজল আহমেদ (২৬), মেয়ে রাজিয়া বেগম (৪৫), সুরুজ মিয়ার স্ত্রী আবেদা বেগম (৪৫), আশ্রব আলীর ছেলে খলিল (৫০), বরমীর কায়েতপাড়া গ্রামের জাফর আলীর ছেলে মফিজুর রহমান (৫৩), মফিজুর রহমানের স্ত্রী মনোয়ারা বেগম ও একই এলাকার শামীম (৩৫)। তাদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
এর আগে ১৪ এপ্রিল সকালে ছাত্রীকে অপহরণ করা হয়েছিল অভিযোগে ১৫ এপ্রিল তার বাবা ১০ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাত ৩০ জনকে আসামি করে শ্রীপুর থানায় মামলা করেন। মামলার আসামিরা হলেন- কেওয়া পশ্চিম খণ্ড এলাকার সুরুজ মিয়ার ছেলে আবিদ, সবদের আলীর ছেলে সুরুজ মিয়া, বাচ্চু মিয়া, সুরুজ মিয়ার স্ত্রী আবেদা, উজ্জল, সৌমিত, সাইফুল, আবুল হাশেম, খলিলের স্ত্রী আবিদা এবং মৃত আশ্রব আলীর ছেলে খলিল।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ওই ছাত্রী বাবা-মায়ের সঙ্গে শ্রীপুর পৌরসভায় ভাড়া বাসায় থেকে মাওনার একটি মহিলা মাদ্রাসায় নবম শ্রেণিতে লেখাপড়া করে। একই এলাকার আবিদ (২১) নামে এক যুবক দীর্ঘদিন ধরে ছাত্রীকে উত্ত্যক্ত করে আসছিলেন এবং বিভিন্ন সময় কুপ্রস্তাব ও অপহরণের হুমকি দিতেন। গত ১৪ এপ্রিল সকালে মাদ্রাসায় যাওয়ার পথে মাওনা ফায়ার সার্ভিস সংলগ্ন এলাকা থেকে আবিদ ও তার সহযোগীরা ছাত্রীকে অপহরণ করেন। একই দিন তাকে উদ্ধার করে বাড়িতে আনা হয়। ওই দিন বেলা ১১টার দিকে বিষয়টি নিয়ে সালিশ বৈঠক বসে। এ সময় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে আবিদ ও তার সহযোগীরা ধারালো অস্ত্র নিয়ে অতর্কিতভাবে তাদের বাড়িতে হামলা চালান। তারা ঘরের দরজা ভেঙে পরিবারের সদস্যদের জিম্মি করে ছাত্রীকে পুনরায় তুলে নিয়ে যান। এ সময় মারধর ও লুটপাটের ঘটনাও ঘটে।
ছাত্রীর বাবা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মেয়ে আমার গলা জড়িয়ে ধরেছিল। সেখান থেকে আমার গলায় অস্ত্র ঠেকিয়ে মেয়েকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এতে মেয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। কোর্ট ম্যারেজ এবং প্রেমের বিষয়টি সম্পূর্ণ ভুয়া ও মিথ্যা। আসামিদের দোষত্রুটি ঢাকতে সমস্ত অপবাদ আমার মেয়ের ওপর দেওয়া হচ্ছে। এ নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি আমরা। কারণ বিভিন্ন মাধ্যমে আমাকে ও পরিবারকে হুমকি দিচ্ছে আসামিরা।’
আবিদের ফুফাতো বোন স্বর্ণা আক্তার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আবিদ আর ওই শিক্ষার্থী প্রতিবেশী। পাশাপাশি বাড়ি হওয়ায় আবিদের সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বিষয়টি দুই পরিবারসহ এলাকার সবাই জানতো। একপর্যায়ে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ছেলের পরিবার। ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখের দিন ছেলে-মেয়ে দুজনে পালিয়ে গিয়ে কোর্ট ম্যারেজ করেছিল।’
তিনি বলেন, ‘পরদিন সকাল ১০টার দিকে স্ত্রীকে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসে আবিদ। বিষয়টি জানাজানি হলে দুই পরিবারের লোকজন আবিদের বাসায় সালিশ বৈঠকে বসেন। পরে আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ের সিদ্ধান্ত হলে মেয়েকে তার বাবা-মায়ের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। এরপর মেয়েকে ঘরে নিয়ে তার বাবা বাড়ির গেটে ও ঘরের দরজায় তিনটি তালা লাগিয়ে মারধর করেন। মেয়ে চিৎকার দিয়ে ছেলের পরিবারের সহযোগিতা চায়। ছেলে ও তার পরিবার গিয়ে মারধরের কারণ জানতে চাইলে আবিদকে হুমকি দেন মেয়ের বাবা। এতে আবিদের স্বজনরা ক্ষুব্ধ হন। একপর্যায়ে মেয়েকে নিয়ে যাবে বলে বাবার কাছে ঘরের চাবি চাইলে আবিদের মা ও খালাকে মারধর করা হয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ঘরের তালা ভেঙে আবিদ ও তার সহযোগীরা মেয়েকে নিয়ে যান। এখানে অপহরণের মতো কোনও ঘটনা ঘটেনি। মেয়ে স্বেচ্ছায় বাড়ি থেকে চলে গিয়ে বিয়ে করেছিল।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শ্রীপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) লাল চান বলেন, ‘শনিবার ওই ছাত্রীকে আদালতে তোলা হলে গাজীপুরের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক আসমা জাহান তাকে বাবার জিম্মায় দেন।’
শ্রীপুর থানার পরিদর্শক (অপারেশন) সঞ্জয় সাহা বলেন, ‘ছাত্রীর মেডিক্যাল পরীক্ষা, বয়স নির্ধারণ এবং নারী-শিশু আইনের ২২ ধারা মোতাবেক জবানবন্দি গ্রহণের জন্য আদালতে পাঠানো হয়েছিল। তবে আদালত জবানবন্দি গ্রহণ করেননি ওই দিন। মেয়েকে বাবার জিম্মায় দেন। এটি আদালত ও তার পরিবারের বিষয়।’
শ্রীপুর থানার একজন পুলিশ কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, ওই ছাত্রীর সঙ্গে আবিদের প্রেমের সম্পর্ক রয়েছে। সেই সূত্র ধরে ঘটনাটি ঘটেছে। পরে এ ঘটনায় অপহরণের মামলা করেছিল মেয়ের পরিবার।









