রিটার্ন জমা কেন দেবেন

গোলাম মওলা
২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১০:২৮ আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১০:২৮

আপনার আয় করযোগ্য নয়, তাই আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার প্রয়োজন নেই—এমন ধারণা অনেকের। আবার কেউ কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) নিয়েছেন, কিন্তু বছরের পর বছর রিটার্ন জমা দেন না। অনেকে মনে করেন, আয়কর না দিলে সরকারের রাজস্ব কমবে, কিন্তু নিজের তেমন কোনও ক্ষতি হবে না। বাস্তবে এ ধারণা ঠিক নয়। রিটার্ন জমা না দেওয়ার কারণে জরিমানা গুনতে হতে পারে, কর ছাড়ের সুবিধা হারাতে পারেন, এমনকি ব্যাংকিং ও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সেবা নিতে গিয়েও জটিলতায় পড়তে পারেন।

দেশে টিআইএনধারীর সংখ্যা এক কোটির বেশি হলেও তাদের সবাই নিয়মিত আয়কর রিটার্ন জমা দেন না। ফলে করযোগ্য আয় থাকা সত্ত্বেও যাঁরা রিটার্ন দিচ্ছেন না, তাঁদের একাংশের আয় করের আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে। তবে রিটার্ন জমা দেওয়ার বিষয়টি শুধু সরকারের রাজস্ব আদায়ের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; নিজের আয়, সম্পদ ও আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতা বজায় রাখার জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ।

আয়কর আইন অনুযায়ী, শুধু টিআইএন থাকলেই সব ক্ষেত্রে রিটার্ন জমা বাধ্যতামূলক—বিষয়টি এমন নয়। যাদের করযোগ্য আয় রয়েছে, তাদের রিটার্ন দিতে হয়। এ ছাড়া আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট কিছু সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রেও রিটার্ন জমার প্রমাণ দেখাতে হয়। তাই নিজের আয় ও পেশাগত অবস্থার ভিত্তিতে রিটার্ন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা আছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি।

রিটার্ন না দিলে নিজের ক্ষতি কোথায়?

রিটার্ন জমা না দেওয়ার সবচেয়ে সরাসরি ঝুঁকি হলো জরিমানা। আয়কর আইন, ২০২৩-এর ২৬৬ ধারায় নির্ধারিত ক্ষেত্রে রিটার্ন জমা দিতে ব্যর্থ হলে কর কর্মকর্তারা জরিমানা আরোপ করতে পারেন। সাধারণভাবে সর্বশেষ নিরূপিত আয়ের ওপর ধার্য করের ১০ শতাংশ হারে জরিমানার বিধান রয়েছে। তবে জরিমানার ন্যূনতম পরিমাণ এক হাজার টাকা। আগে আয় নিরূপণ হয়নি—এমন ব্যক্তির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ জরিমানার সীমা পাঁচ হাজার টাকা। আগে আয় নিরূপণ হয়ে থাকলে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতার ক্ষেত্রে জরিমানার সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণে আইনে আলাদা শর্ত রয়েছে। এ ছাড়া ব্যর্থতা অব্যাহত থাকলে প্রতিদিন ৫০ টাকা হারে অতিরিক্ত জরিমানাও আরোপ করা যেতে পারে।

তবে রিটার্ন জমা না দিলেই সবার ওপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে একই অঙ্কের জরিমানা বসবে, বিষয়টি এমন নয়। সংশ্লিষ্ট করদাতার পরিস্থিতি ও আইনের বিধান অনুযায়ী কর কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিতে পারেন।

জরিমানার বাইরেও আর্থিক ক্ষতি হতে পারে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমা না দিলে করদাতার জন্য প্রযোজ্য কর ছাড় বা প্রণোদনার সুবিধা হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। বিলম্বে রিটার্ন জমা দিলে অতিরিক্ত করও দিতে হতে পারে। অর্থাৎ সময়মতো রিটার্ন জমা না দেওয়ার কারণে যে অর্থ সাশ্রয় করা সম্ভব ছিল, সেটিই বাড়তি খরচ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

ব্যাংকঋণ, সম্পত্তি ও সেবা নিতে জটিলতা

ব্যাংকঋণ নেওয়া, জমি বা ফ্ল্যাট কেনাবেচা, ব্যবসা পরিচালনা কিংবা বিভিন্ন আর্থিক লেনদেনের সময় নিজের আয়ের উৎস ও আর্থিক সামর্থ্যের প্রমাণ দেখানোর প্রয়োজন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে আয়কর রিটার্নের কপি বা রিটার্ন জমার প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ নথি হিসেবে কাজে আসে।

রিটার্নে একজন করদাতা তাঁর আয়, কর পরিশোধ, বিনিয়োগ ও সম্পদের তথ্য ঘোষণা করেন। এসব তথ্যের মাধ্যমে তাঁর আর্থিক অবস্থার একটি আনুষ্ঠানিক বিবরণ তৈরি হয়। ব্যাংক বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন অনুযায়ী এই নথি চাইতে পারে। রিটার্ন না থাকলে প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করতে গিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে।

আইনে নির্ধারিত কিছু সরকারি ও বেসরকারি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রেও রিটার্ন জমার প্রমাণ দেখানো বাধ্যতামূলক। তাই কেউ করযোগ্য আয় না করলেও তাঁর ক্ষেত্রে রিটার্ন জমার বাধ্যবাধকতা রয়েছে কি না, তা যাচাই করা উচিত। তবে রিটার্নের প্রমাণ না থাকলেই সবার গ্যাস, বিদ্যুৎ বা পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে—এমন সাধারণীকরণ ঠিক নয়। এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন ও নির্দিষ্ট শর্ত বিবেচ্য।

রিটার্ন জমা মানেই কি কর দিতে হবে?

অনেকের ধারণা, রিটার্ন জমা দিলেই কর দিতে হবে। বাস্তবে বিষয়টি আলাদা। রিটার্ন হলো নির্দিষ্ট আয়বর্ষে একজন ব্যক্তির আয়, ব্যয়, সম্পদ, দায় ও কর-সংক্রান্ত তথ্যের বিবরণ। আর কর দিতে হবে কি না, তা নির্ভর করে তাঁর করযোগ্য আয়, প্রযোজ্য করমুক্ত সীমা এবং আইনের অন্যান্য বিধানের ওপর।

কারও আয় করমুক্ত সীমার নিচে থাকলে বা তার ওপর কর প্রযোজ্য না হলে রিটার্ন জমা দিলেও কর দিতে নাও হতে পারে—যদি তার ক্ষেত্রে রিটার্ন জমা বাধ্যতামূলক হয়। আবার আয় থেকে উৎসে কর কাটা হয়ে থাকলে রিটার্নের মাধ্যমে সেই করের হিসাবও উপস্থাপন করা যায়।

তাই কর দিতে হবে কি না, সেই আশঙ্কায় রিটার্ন জমা না দিয়ে বসে থাকা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। বরং নিজের প্রকৃত আয় ও প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী হিসাব তৈরি করে রিটার্ন জমা দেওয়াই নিরাপদ।

সময়মতো রিটার্ন দিলে কী সুবিধা?

রিটার্ন জমা দেওয়ার মাধ্যমে একজন করদাতা নিজের আয় ও সম্পদের হিসাব নিয়মিত রাখতে পারেন। ভবিষ্যতে ব্যাংকঋণ, সম্পত্তি কেনাবেচা, ব্যবসায়িক কার্যক্রম বা অন্য কোনো আর্থিক প্রয়োজনে আয়ের বৈধ উৎসের প্রমাণ দিতে হলে আগের বছরের রিটার্ন সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে কর পরিশোধের রেকর্ড থাকলে নিজের কর-সংক্রান্ত অবস্থাও যাচাই করা সহজ হয়।

এ ছাড়া সময়মতো রিটার্ন জমা দিলে বিলম্বজনিত অতিরিক্ত কর বা জরিমানার ঝুঁকি কমে। যারা নিয়মিত আয় করেন, তাদের জন্য আয়-ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণ এবং প্রতিবছর রিটার্ন জমা দেওয়ার অভ্যাস ভবিষ্যতের আর্থিক পরিকল্পনাতেও সহায়ক হতে পারে।

অনলাইনে রিটার্ন জমার সুযোগ

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ই-রিটার্ন ব্যবস্থার মাধ্যমে ঘরে বসেই আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া যায়। ২০২৬-২৭ করবর্ষে সাধারণ ব্যক্তি করদাতাদের জন্য অনলাইনে রিটার্ন জমা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তবে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রবীণ করদাতা, শারীরিকভাবে অসমর্থ বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তি, বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি করদাতা এবং মৃত করদাতার আইনগত প্রতিনিধিরা নির্ধারিত ব্যতিক্রমের আওতায় রয়েছেন। অনলাইনে নিবন্ধনের সমস্যার কারণে রিটার্ন জমা দিতে না পারলে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় অনুমতি নিয়ে কাগজে রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগও রয়েছে।

এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ করবর্ষে ব্যক্তি করদাতারা ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত স্বনির্ধারণী পদ্ধতিতে রিটার্ন জমা দিতে পারবেন। তবে কখন জমা দেওয়া হচ্ছে, তার ওপর করের সুবিধা বা অতিরিক্ত অর্থের বিষয়টি নির্ভর করবে।

১ জুলাই থেকে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে প্রদেয় নিট করের ওপর ৫ শতাংশ ছাড় পাওয়া যায়, যার সর্বোচ্চ সীমা ২৫ হাজার টাকা। ১ অক্টোবর থেকে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে এ ছাড় পাওয়া যায় না, তবে অতিরিক্ত করও প্রযোজ্য হয় না। ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে প্রদেয় করের ২ শতাংশ অথবা ন্যূনতম তিন হাজার টাকা—যেটি বেশি—অতিরিক্ত দিতে হয়। ১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুনের মধ্যে জমা দিলে প্রদেয় করের ৫ শতাংশ অথবা ন্যূনতম পাঁচ হাজার টাকা—যেটি বেশি—অতিরিক্ত কর প্রযোজ্য হয়।

অতএব, রিটার্ন জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে শেষ সময় পর্যন্ত অপেক্ষা না করাই ভালো। নিজের আয় ও সম্পদের তথ্য প্রস্তুত করে আগেভাগে রিটার্ন জমা দিলে আর্থিক সুবিধা পাওয়ার পাশাপাশি শেষ মুহূর্তের ঝামেলাও এড়ানো সম্ভব।

সরকারের চেয়ে নিজের স্বার্থেও গুরুত্বপূর্ণ

কর ফাঁকি রোধ ও রাজস্ব বাড়ানোর জন্য রিটার্ন জমা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একজন নাগরিকের জন্য এর প্রয়োজন আরও ব্যক্তিগত। নিয়মিত রিটার্ন জমা দিলে নিজের আয় ও সম্পদের হিসাব স্বচ্ছ থাকে, আর্থিক নথি প্রস্তুত থাকে এবং প্রয়োজনের সময় আয়-সংক্রান্ত তথ্য উপস্থাপন করা সহজ হয়। অন্যদিকে, রিটার্ন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও তা উপেক্ষা করলে জরিমানা, অতিরিক্ত কর ও বিভিন্ন সেবা গ্রহণে জটিলতার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

তাই রিটার্ন জমা দেওয়াকে শুধু সরকারের রাজস্ব আদায়ের বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি নিজের আর্থিক নথি ঠিক রাখা, ভবিষ্যতের ঝামেলা এড়ানো এবং আইন মেনে চলারও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

/আইএএম/
সম্পর্কিত
যন্ত্রাংশের ঘোষণা দিয়ে খণ্ডিত বিএমডব্লিউ-ইসুজু আমদানি, কাস্টমসের তদন্ত
এবার ফেঁসে যাচ্ছেন কোটি টাকার গাড়ির মালিকরা  
সুতা আমদানির নিয়ম বদল: নতুন জটিলতায় পোশাক কারখানার মালিকরা 
সর্বশেষ খবর
ট্রাইব্যুনালে হাজির হয়ে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইলেন আওয়ামীপন্থী ২ আইনজীবী
ট্রাইব্যুনালে হাজির হয়ে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইলেন আওয়ামীপন্থী ২ আইনজীবী
মানবতাবিরোধী অপরাধ: আওয়ামী লীগের ৭ নেতার বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন জমা
মানবতাবিরোধী অপরাধ: আওয়ামী লীগের ৭ নেতার বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন জমা
ফ্রান্সে জোড়ালো বিক্ষোভের ডাক: অগ্নি পরীক্ষায় ম্যাক্রঁ
ফ্রান্সে জোড়ালো বিক্ষোভের ডাক: অগ্নি পরীক্ষায় ম্যাক্রঁ
প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় ছাত্রীকে অপহরণ, মাদ্রাসার পরিচালকের বিরুদ্ধে মামলা
প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় ছাত্রীকে অপহরণ, মাদ্রাসার পরিচালকের বিরুদ্ধে মামলা
সর্বাধিক পঠিত
জাপানে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হচ্ছেন কারা
জাপানে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হচ্ছেন কারা
একসঙ্গে ২৫ জেলে আটক, ৮০ কেজি ইলিশ গেলো এতিমখানায়
একসঙ্গে ২৫ জেলে আটক, ৮০ কেজি ইলিশ গেলো এতিমখানায়
ভোট দেওয়া নিয়ে অনুশোচনা ও বিএনপি সরকারের সমালোচনা করা নারী আটক
ভোট দেওয়া নিয়ে অনুশোচনা ও বিএনপি সরকারের সমালোচনা করা নারী আটক
‘শুধু একটা স্নাইপারের অভাব ছিল’-কমেন্ট কেন করেছিলেন, আদালতকে জানালেন সেই যুবক
‘শুধু একটা স্নাইপারের অভাব ছিল’-কমেন্ট কেন করেছিলেন, আদালতকে জানালেন সেই যুবক
মিয়ানমারের বিরল খনিজ রফতানিতে জোয়ার
মিয়ানমারের বিরল খনিজ রফতানিতে জোয়ার