একসময় নিরিবিলি ও শান্তির শহর হিসেবে পরিচিত ছিল খুলনা। চরমপন্থীদের তৎপরতা ও এরশাদ শিকদারের অপরাধজগতের মধ্য দিয়ে শহরটির অন্ধকার অধ্যায় শুরু হয়েছিল। মাঝখানে কিছুটা বিরতি থাকলেও এখন আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে অপরাধী গোষ্ঠীগুলো। খুন, গুলি, চাঁদাবাজি, অপহরণ ও প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়ায় নগরজীবনে ফিরেছে আতঙ্ক। এদের তৎপরতায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
সাম্প্রতিক সময়ে খুলনা মহানগরে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংঘটিত অপরাধের বিভিন্ন ঘটনায় ঘুরেফিরে কয়েকটি সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নাম উঠে এসেছে। এর মধ্যে শীর্ষ নয়টি সন্ত্রাসী গ্রুপের নাম আসছে বারবার। যেগুলো বিভিন্ন অপরাধে জড়িত। বাহিনী গঠন করে অপরাধ কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে তারা। একেক বাহিনীতে অন্তত ৩০ জনের বেশি সদস্য রয়েছে বলে জানা গেছে। এদের বেশিরভাগ সদস্যের বয়স ১৬ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। মহানগরী ও আশপাশের এলাকায় খুনোখুনি, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা ও আধিপত্য বিস্তারে জড়িয়ে পড়া শীর্ষ ৯টি সন্ত্রাসী গ্রুপ ও তাদের প্রধানদের তথ্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
খুলনায় সক্রিয় ৯টি সন্ত্রাসী গ্রুপ কারা
সম্প্রতি প্রকাশ্যে গুলি ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলোতে বি-কোম্পানির নাম আসছে বারবার। বি-কোম্পানি হলো রনি চৌধুরী ওরফে ‘গ্রেনেড বাবুর’ নেতৃত্বাধীন একটি শীর্ষ অপরাধী চক্র। খুলনা সদর, লবণচরা ও হরিণটানা এলাকায় এই গ্রুপের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। মাদক ব্যবসা ও পূর্ববিরোধের জের ধরে খুনোখুনিতে গ্রুপটি বেশি আলোচিত। এই গ্রুপের কয়েকজন সদস্যকে গ্রেফতার করা হলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
পাশাপাশি রয়েছে পলাশ গ্রুপ। শেখ পলাশের নেতৃত্বে পরিচালিত হয় এই সন্ত্রাসী গ্রুপ। এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে এদের নাম রয়েছে। এরপরে আছে হুমা বাহিনী। হুমায়ুন কবিরের নেতৃত্বে এই বাহিনীটি পরিচালিত হয়। দৌলতপুর ও খান জাহান আলী থানা এলাকায় এদের প্রভাব রয়েছে।
সম্প্রতি হত্যা ও গুলির ঘটনায় নাম আসছে আশিক বাহিনীর। আশিকের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গ্রুপটি মূলত খুলনা সদর ও লবণচরা থানা এলাকায় সক্রিয়। এ ছাড়া নূর আজিম গ্রুপ রয়েছে। নূর আজিমের নেতৃত্বে পরিচালিত গ্রুপটি খুলনা সদর ও লবণচরা এলাকায় অপরাধ কর্মকাণ্ড চালায়। পাশাপাশি টেনকি শাওন গ্রুপও আছে। শাওনের নেতৃত্বে এই গ্রুপটি সোনাডাঙ্গা ও খালিশপুর এলাকায় সক্রিয় রয়েছে। চাঁদাবাজি ও নানা অপরাধ কর্মকাণ্ডে তাদের নাম আসছে।
আরও আছে আরমান গ্রুপ। আরমান শেখের নেতৃত্বাধীন এই গ্রুপ দৌলতপুর ও খান জাহান আলী এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে। শাকিল গ্রুপ। শাকিল শেখের নেতৃত্বে এই গ্রুপটি স্থানীয় অপরাধ ও সংঘাতে জড়িত। নাসিম গ্রুপ। নাসিমুল গানীর নেতৃত্বে এই গ্রুপটি পরিচালিত হতো। সম্প্রতি (২০২৬ সালের অক্টোবর মাসে) দিঘলিয়া উপজেলায় নাসিমুল ইসলামী নিহত হন। এ ছাড়া দীঘলিয়া, আরংঘাটা, ডুমুরিয়া, কয়রা, পাইকগাছা ও দাকোপসহ বিভিন্ন উপজেলায় স্থানীয়ভাবে ছোটখাটো সশস্ত্র গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে, যারা মাদক ও অস্ত্র ব্যবসা, নদীর ঘাট দখল, বালু ব্যবসা এবং চিংড়ির ঘের ও জমি দখলের দ্বন্দ্বে জড়িত।
আলোচিত বি-কোম্পানি
পুলিশের একাধিক সূত্রের দাবি, খুলনায় সক্রিয় অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে রনি চৌধুরী বাবু ওরফে গ্রেনেড বাবুর ‘বি কোম্পানি’ সবচেয়ে সক্রিয় ও শক্তিশালী। পাড়া-মহল্লাভিত্তিক এজেন্টের মাধ্যমে গোষ্ঠীটি নিজেদের তৎপরতা চালায়। সমাজসেবামূলক কাজের প্রচার থেকে শুরু করে অপরাধের নানা কর্মকাণ্ড—সব ক্ষেত্রেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করা হয়। ফেসবুককেন্দ্রিক নিজস্ব প্রচারমাধ্যমও রয়েছে তাদের।
স্থানীয় লোকজন বলছেন, নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পুলিশের। অথচ খুলনায় এমন পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে, যখন রাতে একা চলাচল না করার জন্য পুলিশকে সতর্কবার্তা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। আধিপত্য বিস্তার নিয়ে কথায় কথায় দিনদুপুরে মানুষকে কুপিয়ে জখম করা হচ্ছে, ছোড়া হচ্ছে গুলি। প্রকাশ্যে তুলে নেওয়া হয়েছে সাব-রেজিস্ট্রারের মতো সরকারি কর্মকর্তাকে। খাদ্য বিভাগের এক কর্মকর্তাকে আঘাত করে তুলে নেওয়ার চেষ্টাও হয়েছে। মাদক চোরাচালান, কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য, মহল্লাভিত্তিক নতুন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ও নীরব চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটছে। বিভিন্ন পেশার মানুষকে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করে হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। কেউ কেউ নীরবে চাঁদা দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছেন। আবার অনেকে চাঁদাবাজদের ভয়ে বাড়িঘর ছেড়ে আত্মগোপনে রয়েছেন।
পাড়া-মহল্লায় এজেন্ট, চাঁদার দাবিতে হুমকি
পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ‘বি কোম্পানি’ এখন নবাবের নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন এলাকায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালানো হচ্ছে। প্রথমে রহস্যময় ব্যক্তি ছিল নবাব। কিন্তু ইতিমধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানতে পেরেছে জেল থেকে বের হওয়া গ্রেনেড বাবু-ই আসলে নবাব নামে এখন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। পাড়া-মহল্লায় থাকা এজেন্টদের মাধ্যমে বিভিন্ন নামে গ্রুপ তৈরি করা হয়েছে। এসব গ্রুপের সদস্যরা নিজেদের বি কোম্পানি বা নবাবের লোক পরিচয় দিয়ে চাঁদা দাবি করে। তারাই সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু বা টার্গেট নির্ধারণ করে। এরপর চাঁদা না দিলে গুলি করে আহত ও মেরে ফেলা হয়।
স্থানীয় একাধিক সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে, চাঁদা দিলে পরিস্থিতি এক রকম থাকে, আর না দিলে শুরু হয় অন্য ধরনের চাপ। নিয়মিত বিরতিতে মুঠোফোনে হুমকি ও ভয়ভীতি দেখানো হয়। সংশ্লিষ্ট এলাকায় মহড়া বাড়ানো, লোকবল বাড়িয়ে নজরদারি এবং কারও চলাচল পর্যবেক্ষণ করা হয়। পরে মুঠোফোনে গতিবিধি নজরদারির বিষয়টি জানিয়ে ভয় দেখানো হয়। এমনকি নবাবের সঙ্গে কথা বলার জন্যও চাপ দেওয়া হয়। পুলিশকে জানালে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। অনেকে বাধ্য হয়ে গোপনে চাঁদা দিয়ে ঝামেলা মেটান।
এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দুই বা তার বেশি তলাবিশিষ্ট বাড়ির মালিকদের বাছাই করে চাঁদা দাবি শুরু করেছে এই বাহিনী। নগরীর ৩০ ও ৩১ নম্বর ওয়ার্ড এলাকায় এ তৎপরতায় আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। যারা চাঁদার অঙ্ক নিয়ে সমঝোতা করছেন বা চাঁদা দিচ্ছেন, তাদের বাড়িতে মিষ্টির প্যাকেট পৌঁছে দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন স্থানীয়দের কেউ কেউ। অন্যদিকে এলাকায় আতঙ্ক ছড়াতে গুলির ঘটনা ঘটছে। বারবার চাওয়ার পরও কেউ চাঁদা না দিলে মেরে ফেলা হচ্ছে। অথবা গুলি করে আহত করে ফেলা হচ্ছে।
বিভিন্ন নামে গ্রুপ, এলাকায় এলাকায় তৎপরতা
বি কোম্পানির বাইরে খুলনার বিভিন্ন এলাকায় পাড়া-মহল্লাভিত্তিক আরও কয়েকটি গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। এগুলো পলাশ গ্রুপ, নূর আজিম গ্রুপ, আশিক বাহিনী, হুমা বাহিনী, টেংকি শাওন গ্রুপ, আরমান গ্রুপ, শাকিল গ্রুপ ও নাসিম গ্রুপ নামে পরিচিত।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, নূর আজিম ও আশিক গ্রুপের আধিপত্য খুলনা সদর ও লবণচরা থানা এলাকায়। শাওন গ্রুপ সক্রিয় সোনাডাঙ্গা ও খালিশপুর এলাকায়। আরমান গ্রুপ ও হুমা বাহিনী দৌলতপুর ও খানজাহান আলী থানা এলাকায় তৎপর। নাসিম গ্রুপের প্রধান নাসিমুল গণি গত ৪ অক্টোবর দিঘলিয়া উপজেলায় গুলিতে নিহত হন। এখন হাল ধরেছে তার দলেরই আরেকজন।
খুলনা জেলা পুলিশের একাধিক সূত্র বলছে, দিঘলিয়া, আড়ংঘাটা, রূপসা, তেরখাদা, বটিয়াঘাটা, কয়রা, পাইকগাছা ও ডুমুরিয়ায় ছোট ছোট সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। এসব গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মাদক ও অস্ত্র কারবারে জড়িত থাকার অভিযোগ আছে। তাদের কেউ কেউ নিজেদের নবাব বাহিনীর সক্রিয় সদস্য বলেও পরিচয় দিতে শুরু করেছে। স্থানীয় আধিপত্য, জমি, ঘের, বালুর ব্যবসা, পরিবহন ও ঠিকাদারি কাজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এসব গোষ্ঠীর মধ্যে প্রায়ই বিরোধ দেখা দেয়।
পলাশের উত্থান, গ্রেফতারের পর গ্রুপে ভাঙন
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, পলাশ গ্রুপের প্রধান শেখ পলাশ একসময় ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর তার উত্থান ঘটে। খুলনা-২ আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে প্রভাবশালী হয়ে ওঠে পলাশ। পরে নিজস্ব বাহিনী গড়ে তোলে। ২০১৫ সালের এপ্রিলে গ্রেফতার হওয়ার পর কিছুদিন কারাগারে ছিল। পরে জামিনে বেরিয়ে যায়।
বিভিন্ন সূত্রের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর খুলনার মিস্ত্রিপাড়া, বানরগাতি, আরামবাগ, নিরালা, পশ্চিম বানিয়াখামার, রূপসা বাগমারা ও সোনাডাঙ্গা এলাকায় পলাশের বাহিনী চাঁদাবাজিতে জড়িয়ে পড়ে। এ নিয়ে গ্রেনেড বাবুর সঙ্গে তার বিরোধ তৈরি হয়। অপরাধজগতের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের দ্বন্দ্বে একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটতে থাকে। ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ যৌথ বাহিনী সোনাডাঙ্গা এলাকা থেকে শেখ পলাশকে তার ১০ সহযোগী ও অস্ত্রসহ গ্রেফতার করে। এরপর থেকে তিনি কারাগারে রয়েছেন। সূত্রগুলোর দাবি, পলাশের বাহিনীর অনেক সদস্য পরে নূর আজিম ও আশিক গ্রুপে যুক্ত হয়েছেন।
গ্রেনেড বাবুর বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় হত্যা, হত্যাচেষ্টা ও মারধরসহ অন্তত ১৭টি মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। নূর আজিম ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে আটক হন। গত আগস্টের শেষ সপ্তাহে জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি আবারও সক্রিয় হন।
মাদক কারবার, অস্ত্রের জোগান ও খুন
পুলিশের ভাষ্য, মাদক কারবারের সঙ্গে যুক্ত অপরাধী চক্রগুলো মাদক বিক্রেতা ও সহযোগীদের মোটরসাইকেল, মাসিক বেতন, কমিশন এবং অস্ত্রের জোগান দেয়। অস্ত্রের সহজলভ্যতা অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে। গোয়েন্দা পুলিশের ধারণা, খুলনায় এখনও অন্তত ৩০০টি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে।
পুলিশ বলছে, নূর আজিম ও গ্রেনেড বাবু গ্রুপের সদস্যরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করছে। এক গ্রুপ চাঁদাবাজির ক্ষেত্রে অন্য গ্রুপের নামও ব্যবহার করছে।
এরই মধ্যে কয়েকটি ঘটনা তদন্ত করেছে পুলিশ। তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানান, গত ২২ অক্টোবর গুলিতে নিহত তাওহিদুল ‘পলাশ গ্রুপের’ সদস্য ছিলেন। মাদক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এই গ্রুপের সঙ্গে বি কোম্পানির ব্লেড বাবুর বিরোধ ছিল। অন্যদিকে খুশি আক্তার ব্লেড বাবুর স্ত্রী। তিনি বি কোম্পানির হয়ে মাদক বিক্রি করেন।
তাওহিদুল হত্যাকাণ্ডে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করেছে। এজাহারে বি কোম্পানির সদস্য শহিদুল ইসলাম ওরফে সেজান, সাকিবুর রহমান ওরফে জিতু এবং রাব্বি চৌধুরীর সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে খুশি হত্যাকাণ্ডে তার বোন হাসি আক্তার বাদী হয়ে শীর্ষ সন্ত্রাসী আশিকসহ চারজনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেছেন।
গোয়েন্দা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গ্রেনেড বাবুর নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী ‘বি কোম্পানি’ নামে একটি বাহিনী গড়ে তুলেছে। পাড়া-মহল্লার উঠতি বয়সী তরুণদের লক্ষ্য করে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। এসব তরুণকে মাদক ব্যবসায় নিয়োগ করা হয়। সর্বোচ্চ ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত মাসিক বেতন দেওয়া হয় বলে গোয়েন্দা সূত্রের দাবি। তারা স্থানীয় পর্যায়ে ক্রেতাদের কাছে মাদক পৌঁছে দেয়।
নিম্ন আয়ের পরিবার ও বস্তি এলাকার কিশোর-তরুণদের এসব কাজে যুক্ত করা হয়। দেনা-পাওনা নিয়ে বিরোধ হলে প্রথমে হুমকি-ধমকি দেওয়া হয়। এতে কাজ না হলে হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত গড়ায় বলে সূত্রগুলোর দাবি। মাদক বিক্রির অর্থ লেনদেনকে কেন্দ্র করে একাধিক হত্যাকাণ্ডের প্রমাণ পুলিশের হাতে রয়েছে।
১০ মাসে ৭১ খুন, দেড় বছরে ৯১
খুলনা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, মহানগরী ও জেলায় গত ১০ মাসে ৭১টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর পাশাপাশি হুমকি-ধমকি, চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনাও রয়েছে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী দেড় বছরে নগরী ও জেলায় ৯১টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে পুলিশের তথ্য। শুধু হত্যাকাণ্ড নয়, চাঁদাবাজি, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার, চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনাও বেড়েছে। এতে নগরবাসীর মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে।
মহানগরীর মিস্ত্রিপাড়ার রিকশাচালক ইসমাইল হোসেন বলেন, কয়েক দিন আগে রাত ১টার দিকে নিরালার মোড়ে ছিনতাইকারীর কবলে পড়েন তিনি। সেদিন রাতে যা আয় করেছিলেন, সব নিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা। ইসমাইল বলেন, ‘৩৬ বছর রিকশা চালাই। রিকশাচালকের কাছ থেকে ছিনতাই হয়েছে, এমন ঘটনা আগে শুনিনি কখনও।’
খুলনায় মানুষ শান্তিতে নেই
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) খুলনার জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট কুদরত ই খুদা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শান্তির শহর খুলনার মানুষ এখন শান্তিতে নেই। সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কারণে সবার মধ্যে ভয় ও শঙ্কা কাজ করছে। মানুষের কথা বলার আগেই গুলি চলছে। শিক্ষক, চিকিৎসক, পুলিশ, সরকারি কর্মচারী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই সন্ত্রাসের রাজত্ব থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।’
বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ উজ জামান বলেন, ‘অপরাধ বেড়ে গেলেও পুলিশের তৎপরতা কিছু অভিযান ও লোকদেখানো কার্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে। অপরাধীরা প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া দিলেও মূল হোতা ও নেপথ্যের কারবারিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। সন্ত্রাসী ও মাদক কারবারিদের এমন বেপরোয়া আচরণে নগরবাসীর ক্ষোভ বাড়ছে।’
খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি এস এম শফিকুল আলম মনা বলেন, ‘কিশোর গ্যাং, মাদক ও সন্ত্রাস নির্মূল করতে না পারায় খুলনায় বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। আমার দলের লোকজনও আক্রান্ত হচ্ছেন। কিন্তু পুলিশ কার্যকর কোনও ব্যবস্থা নিতে পারছে না। একের পর এক গুলি ও হত্যাকাণ্ড ঘটছে প্রতিদিন।’
পুলিশের অভিযান, গ্রেফতার ও নেটওয়ার্ক ভাঙার চেষ্টা
খুলনা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার মোহাম্মদ আহাদুজ্জামান মিয়া বলেন, ‘বেশির ভাগ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে রয়েছে মাদক বিরোধ। পুলিশ তালিকাভুক্ত অপরাধীদের গ্রেফতার করছে। তবে জামিনে বেরিয়ে এসে অনেকে আবার বেপরোয়া হয়ে উঠছে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে মানুষ মুখ খুলতে চায় না। এজন্য তাদের গ্রেফতারও করা যাচ্ছে না।’
খুলনার পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক বলেন, ‘পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গত ৬ অক্টোবর থেকে জেলা পুলিশ, মহানগর পুলিশ ও এসআরবির যৌথ বিশেষ অভিযান এবং “ব্লক রেইড” জোরদার করা হয়েছে। গুলির ঘটনা ও হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত এবং গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত আছে।’
তিনি বলেন, ‘রূপসা, বটিয়াঘাটা, দিঘলিয়া ও তেরখাদা উপজেলাকে ‘ডেঞ্জার জোন’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। গত নয় মাসে শুধু রূপসায় ১১টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। তেরখাদায় দুটি, দিঘলিয়ায় চারটি এবং বটিয়াঘাটায় তিনটি হত্যাকাণ্ড হয়েছে।’
খুলনা মহানগর পুলিশের (কেএমপি) কমিশনার মো. সাজ্জাদুর রহমান বলেন, ‘অভিযান জোরদার করায় নিয়মিত আসামিরা গ্রেফতার হচ্ছে। তবে মানুষ সচেতন না হওয়া এবং প্রশাসনকে সহযোগিতা না করার কারণে অপরাধীরা সুবিধা পাচ্ছে। সন্ত্রাসীদের অবস্থান বা তাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে মানুষ তথ্য দিচ্ছে না।’
পুলিশ ও জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নিরাপদ বাংলাদেশ এবং শান্তিপূর্ণ, বাসযোগ্য খুলনা গড়ে তোলা সম্ভব বলে উল্লেখ করেন পুলিশ কমিশনার। অপরাধ প্রতিরোধে পাড়া-মহল্লায় সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে সবাইকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।
এসআরবি-৬-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নিস্তার আহমদে বলেন, ‘অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে। সীমান্ত এলাকা দিয়ে এসব অস্ত্র দেশে প্রবেশ করছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অস্ত্র কারবারিদের নেটওয়ার্ক ভাঙার চেষ্টা করছে। সন্ত্রাসীদের যেসব বাহিনী গড়ে উঠেছে, সেগুলোর বেশির ভাগ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে দু-একজন দেশের বাইরে থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করে শহরকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। অচিরেই তাদের নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া হবে।’