অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসন না করেই প্রকল্পের কাজ শুরু, কৃষকের ফসল ক্ষতিগ্রস্ত

আতাউর রহমান জুয়েল, ময়মনসিংহ
২৬ অক্টোবর ২০২৩, ০৮:০১আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০২৩, ০৮:০১

‘ভিটেবাড়ি ছাড়া কোনও জায়গাজমি নেই। মানুষের বাড়িতে কাজ করে জমানো ৩৫ হাজার টাকায় ১৫০ শতক জমি বর্গা নিয়েছিলাম। ৭০ হাজার টাকা ধার করে জমিতে আমন ধান লাগিয়েছি, পাশাপাশি কয়েক জাতের সবজি আবাদ করেছি। মাসখানেকের মধ্যে ধান ঘরে তোলা যাবে। সবজি তোলা শুরু করেছি। আশা ছিল, ধান ও সবজি বিক্রি করে ধার পরিশোধের পর যা থাকবে, তা দিয়ে সংসার এবং ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার খরচ চালাবো। কিন্তু এখন ধানক্ষেত থেকে মাটি নিয়ে ফসল নষ্ট করে ফেলা হচ্ছে। ধান ও সবজি ঘরে তুলতে না পারলে কীভাবে ধার পরিশোধ করবো আর সংসার চালাবো।’

কান্নাজড়িত কণ্ঠে ধানক্ষেতের আইলে বসে কথাগুলো বলেছেন ময়মনসিংহ সদরের সিরতা ইউনিয়নের কোনাপাড়া গ্রামের হাশেম আলীর স্ত্রী সেলিনা বেগম। স্বামী কোনও কাজকর্ম করতে না পারায় নিজেই কৃষিকাজ করছেন। তার সেই ফসলি জমিতে শুরু হয়েছে ‘বিভাগীয় সদর দফতর’ স্থাপন প্রকল্পের নির্মাণকাজ। ভেকু মেশিন দিয়ে এক জমি থেকে আরেক জমিতে ফেলা হচ্ছে মাটি। এতে নষ্ট হচ্ছে জমিগুলোর ফসল। অথচ এখনও অধিগ্রহণের টাকা পাননি জমির মালিকরা। শেষ হয়নি পুনর্বাসনের কাজও।

সেলিনা বেগম বলেন, ‘ধারের টাকা পরিশোধ করতে না পারলে ছেলেমেয়েকে নিয়ে পথে বসতে হবে। একটা মাস সময় দিলে ধান ঘরে তুলতে পারতাম। এখন বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।’  

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা জমির পাশে জড়ো হয়ে প্রতিবাদ জানালেও কাজ বন্ধ হয়নি

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ময়মনসিংহ বিভাগীয় সদর দফতর স্থাপনের লক্ষ্যে ভূমি অধিগ্রহণ, ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ প্রদান ও পুনর্বাসন কাজ শীর্ষক প্রকল্পটি গত বছরের আগস্টে একনেকে পাস হয়েছিল। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ১ হাজার ২২৪ কোটি ৮০ লাখ ৬৩ হাজার টাকা। ইতোমধ্যে ব্রহ্মপুত্র নদের পূর্ব পাশে চরাঞ্চলে ৮৪৫ একর জমি অধিগ্রহণের কাজ শুরু করেছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকদের পুনর্বাসনের জন্য কোনাপাড়া গ্রামে বেড়িবাঁধের পাশে ২৫ একর জমি অধিগ্রহণের কাজ শুরু হয়েছে। তবে জমির মালিকদের এখনও ক্ষতিপূরণের টাকা দেওয়া হয়নি। জমিও বুঝে নেননি প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। এরই মধ্যে হঠাৎ ২৩ অক্টোবর থেকে শুরু হয়েছে প্রকল্পের কাজ। অথচ কাজ শুরুর বিষয়ে স্থানীয় কৃষক এবং জমির মালিকদের কিছুই জানানো হয়নি। ফলে ওসব জমিতে থাকা ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

কোনাপাড়া গ্রামের জমির মালিক শাহজাহান মনির বলেন, ‘কথা ছিল, জমি বুঝে নেওয়ার পর প্রকল্পের কাজ শুরু হবে। কাজ শুরুর আগে জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসন করা হবে। অথচ কিছুই না করে হঠাৎ জমির আমন ধান এবং সবজি নষ্ট করে উন্নয়নকাজ শুরু করেছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। এতে শতাধিক কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। আমরা ফসল তুলে নিতে প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের কাছে এক মাস সময় চেয়েছিলাম। কিন্তু তারা সময় না দিয়ে ধান এবং সবজি নষ্ট করে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।’

শতাধিক কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন

স্থানীয় আরেক কৃষক আব্দুর রশিদ বলেন, ‘আমন পাকতে শুরু করেছে। মাসখানেকের মধ্যে ঘরে তুলতে পারবো। আমরা ওসব জমিতে নানা ধরনের সবজি আবাদ করেছি। এখন সবাই ক্ষতির মুখে পড়েছি।’

বৃদ্ধা হাজেরা বেওয়া (৮০) বলেন, ‘এসব ধান ক্ষতিগ্রস্ত হলে আমরা খাবো কি? দায়িত্বশীলরা কি আমাদের দুঃখ-কষ্ট বোঝেন না? এক মাস সময় দিলে ফসল ঘরে তুলে নেবো। না হয় ফসলের ক্ষতিপূরণ দেক তারা।’

বুধবার (২৫ অক্টোবর) সরেজমিনে দেখা গেছে, ব্রহ্মপুত্র নদের পূর্ব পাড়ে সিরতা এলাকার বেড়িবাঁধের পাশে জমির মাটি ভেকু মেশিন দিয়ে তুলে প্রকল্পের কাজ করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে আমন ধান এবং সবজি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা জমির পাশে জড়ো হয়ে প্রতিবাদ জানালেও কাজ বন্ধ হয়নি।

সিরতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু সাঈদ বলেন, ‘জমির ফসল নষ্ট করে উন্নয়নকাজ না করার জন্য সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) অনুরোধ জানিয়েছি। কৃষকদের এক মাস সময় দিলে ফসল কেটে ঘরে তুলতে পারবেন। এতে কৃষকের যেমন ক্ষতি হবে না, তেমনি উন্নয়নকাজ বাধাগ্রস্ত হবে না।’

কৃষকদের সময় না দিয়ে ধান এবং সবজি নষ্ট করে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মো. মোস্তাফিজার রহমান বলেন, ‌‘বিভাগীয় সদর দফতর স্থাপনের লক্ষ্যে উন্নয়নকাজ শুরু হয়েছে। অধিগ্রহণের কাজ চলমান। জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণের অর্থ দেওয়ার কাজ প্রক্রিয়াধীন। তবে ফসল নষ্ট করে উন্নয়নকাজ করার বিষয়টি আমার জানা নেই। কৃষকরা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হন, বিষয়টি বিভাগীয় কমিশনারসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে ব্যবস্থা নেবো।’

একই বিষয়ে জানতে বিভাগীয় সদর দফতর প্রকল্পের পরিচালক হারুন-অর রশিদের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল দিলেও রিসিভ করেননি। 

/এএম/
সম্পর্কিত
২ লাখ ৩০ হাজার কৃষকের ২২৬ কোটি টাকা ঋণ মওকুফ করলো সরকার
বিরোধীদলীয় নেতার এলাকার উন্নয়নের সরকারের সমন্বয় সভা
৪ হাজার ২৯৯ কোটি টাকার উড়ালসড়ক, কবে সুফল পাবে মানুষ
সর্বশেষ খবর
‘কণ্ঠ কেঁপে উঠছে, এই ছেলেরা অনন্য’: ইংল্যান্ডকে হারিয়ে আবেগাপ্লুত স্ক্যালোনি 
‘কণ্ঠ কেঁপে উঠছে, এই ছেলেরা অনন্য’: ইংল্যান্ডকে হারিয়ে আবেগাপ্লুত স্ক্যালোনি 
পচনশীল উদ্ভিদ এড়িয়ে চলে গাছের শিকড়!
পচনশীল উদ্ভিদ এড়িয়ে চলে গাছের শিকড়!
তেহরানে ট্রাম্পের কফিনবন্দি পোস্টার
তেহরানে ট্রাম্পের কফিনবন্দি পোস্টার
এলডিসি উত্তরণে বাড়তে পারে অর্থনৈতিক সংকট, বড় ধাক্কা রফতানি খাতে 
এলডিসি উত্তরণে বাড়তে পারে অর্থনৈতিক সংকট, বড় ধাক্কা রফতানি খাতে 
সর্বাধিক পঠিত
২ মাসের শিশুর ভিডিও ভাইরাল, স্ত্রীর অপরাধে স্বামী-বাবা গ্রেফতার, কী ঘটেছিল
২ মাসের শিশুর ভিডিও ভাইরাল, স্ত্রীর অপরাধে স্বামী-বাবা গ্রেফতার, কী ঘটেছিল
মোসাদের সঙ্গে যোগাযোগ নিয়ে যা বললেন আহমাদিনেজাদ 
মোসাদের সঙ্গে যোগাযোগ নিয়ে যা বললেন আহমাদিনেজাদ 
গোপালগঞ্জে নিরাপত্তা জোরদার, ৫ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন, চলছে যৌথ টহল
গোপালগঞ্জে নিরাপত্তা জোরদার, ৫ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন, চলছে যৌথ টহল
এনসিপি নেতার ২ লাখ টাকা জরিমানা করলেন ভ্রাম্যমাণ আদালত
এনসিপি নেতার ২ লাখ টাকা জরিমানা করলেন ভ্রাম্যমাণ আদালত
চলমান শিক্ষার্থী আন্দোলনে ছেলে অংশ নেওয়ায় বিএনপি নেতা বহিষ্কার
চলমান শিক্ষার্থী আন্দোলনে ছেলে অংশ নেওয়ায় বিএনপি নেতা বহিষ্কার