‘চার বছর বয়সে বাবা আমারে ছেড়ে দুনিয়া থেকে চলে গেছেন। দুই বছর আগে মা অন্য জায়গায় বিয়ে করে ঢাকায় চলে গেলেন। বাবার কথা তো এখন ধীরে ধীরে ভুলতে বসেছি। মাও দেখতে আসে না। তবে ঈদ এলে খুব বেশি মনে পড়ে মা-বাবার কথা। খুব মনে পড়ে। কিন্তু কী করবো। এখন কেউ তো আমার খোঁজ নেয় না। যার বাবা-মা নেই, আসলে তার কষ্ট বোঝার কেউ নেই। ঈদের আনন্দও নেই তার।’
এভাবেই কথাগুলো বললো মোমেনশাহী এতিমখানার জান্নাত নামে ছয় বছরের এক শিশু। ময়মনসিংহ নগরীর আবাসিক এলাকার এক দম্পতির মেয়ে জান্নাত। জান্নাতের বাবা চার বছর আগে মারা গেছেন। আর দুই বছর আগে জান্নাতের মা দ্বিতীয় বিয়ে করে ঢাকায় চলে গেছেন। এখন জান্নাতের বড় বোন সাবিহা ছাড়া আর কেউ নেই তার। বড় বোন সাবিহা নানির কাছে বেড়ে উঠছে। জান্নাতের ঠাঁই হয়েছে মোমেনশাহী এতিমখানায়। জান্নাত জানায়, ঈদে দুইটা নতুন জামা পেয়েছি। আপারা এতিমখানায় এসে সব মেয়েদের মেহেদি পরিয়ে দিয়েছেন।
শুধু জান্নাত নয়, এখানকার সব মেয়েশিশুর গল্পটা প্রায় একই রকম। কারও বাবা আছে মা নেই, আবার কারও বাবা নেই মা আছে। আবার কারও বাবা-মা কেউ নেই। এই এতিমখানায় বেড়ে উঠছে তারা। ঈদের আনন্দ সবাই নিজেদের মধ্যে ভাগ নিয়েছে।
এখানের আরেক শিশু শ্রাবন্তী (১০)। একই আবাসন এলাকার দম্পতির মেয়ে। বাবা পাঁচ বছর আগে মারা গেছেন। মা এতিমখানায় শ্রাবন্তীকে রেখে ঢাকায় চলে গেছেন গার্মেন্টসে কাজ করার জন্য। তবে ঈদের সময় মা তাকে দেখতে আসেন। মাকে কাছে পেয়ে আনন্দ ধরে রাখতে পারি না বলে জানায় শ্রাবন্তী।
শ্রাবন্তী জানায়, সারা বছর তো মাকে কাছে পাই না। ঈদ আসলেই আমার কাছে আসে। এ কারণে ঈদ হলো আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দের দিন।
ময়মনসিংহ নগরীর পাটগুদাম বাসস্ট্যান্ড এলাকার মোমেনশাহী এতিমখানায় ৪৫ জন কন্যা এতিম আছে। তারা এখানে থেকেই বেড়ে ওঠার পাশাপাশি লেখাপড়া করছে।
এতিমখানায় গিয়ে দেখা যায়, বড় একটি রুমের বিছানার ওপরে শিশুদের বসিয়ে স্কাউটার রফিকুল ইসলাম ওপেন স্কাউট গ্রুপের সদস্যরা মেহেদি পরিয়ে দিচ্ছেন। সবাই হাতে মেহেদি পরতে পেরে খুবই আনন্দিত।
স্কাউট গ্রুপের সদস্য নাফিসা আক্তার জানান, ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়ার জন্যই এতিম শিশুদের মেহেদি পরিয়ে আনন্দ পাচ্ছি আমরা। এরকম কার্যক্রম ভবিষ্যত করবো।
মোমেনশাহী এতিমখানার ইনচার্জ মোজাম্মেল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই এতিমখানায় ৪৫ জন কন্যা এতিম শিশু আছে। ঈদ উপলক্ষে সরকারি কোনও আর্থিক সহায়তা পাওয়া যায়নি। সমাজের বিত্তবানদের সাহায্য সহযোগিতা নিয়ে এতিমখানাটি চলছে। মানুষের সহায়তায় প্রত্যেক এতিম শিশুর জন্য দুটি করে নতুন জামার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ঈদের দিন সকালে নাশতা হিসেবে সেমাই, নুডলস ও চিপস দেওয়া হয়। দুপুরে শিশুরা খেয়েছে গরুর মাংস, মুরগির রোস্ট, পোলাও ও দই। রাতে সাদা ভাত, মুরগির মাংস আর ডালের ব্যবস্থা আছে। এখানকার শিশুরা খুব অসহায়। তাদের জন্য বিত্তবানদের সহায়তা প্রয়োজন।’








