গুলশান ও শোলাকিয়ায় হামলাঝিনাইদহের মেসে নিভৃতে সময় কাটাতেন নিবরাস ও আবির

Send
নয়ন খন্দকার, ঝিনাইদহ
প্রকাশিত : ১৬:২৫, জুলাই ১৬, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:০৯, জুলাই ১৭, ২০১৬

নিবরাস-আবিরঝিনাইদহের সোনালীপাড়ার সাবেক সেনা সার্জেন্ট কওছার আলীর ভাড়া দেওয়া মেসটি ছিল মূলত জঙ্গিদের আস্তানা। ঢাকার গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে সন্ত্রাসী হামলার সন্দেহভাজন জঙ্গি নিবরাস ইসলাম পরিচয় গোপন করে সাঈদ নামে ওই মেসটিতে থাকতেন। আর মাস খানেক তার খালাতো ভাই পরিচয়ে সেখানে ছিলেন কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় হামলার সময় নিহত আবির রহমানও। আবিরের ছবি দেখে শুক্রবার এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন সোনালীপাড়ার বাসিন্দারা।  নিবরাস ও আবির ওই বাড়িতে নিভৃতে সময় কাটাতেন এবং মাঝেমধ্যে পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলতে যেতেন বলেও জানিয়েছেন তারা।
তবে ওই ভাড়া বাড়ির মেসে থাকা বাকি ছয় জনের নাম ও পরিচয় কেউই দিতে পারেননি।
আবিরের ব্যাপারে জানতে শুক্রবার আবার ওই বাড়িতে গেলে বিলকিস নাহার ঘরের দরজা খোলেননি। ঘরের জানালাও বন্ধ ছিল। ঘরের ভেতর থেকে একজন নারী বলেন, তাদের ওপর নানাভাবে চাপ এসেছে। তারা আর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে পারবেন না। কারা চাপ দিচ্ছে, সেটাও বলতে চাননি তারা।
তবে ঝিনাইদহ শহরে সোনালীপাড়ার ওই জঙ্গি আস্তানার লাগোয়া মসজিদের মাঠে স্থানীয় তরুণদের সঙ্গে ফুটবল খেলায় অংশ নিতেন সাঈদ নামধারী নিবরাস। ওই মাঠে খেলতেন এমন কয়েকজন স্থানীয় তরুণকে শুক্রবার আবিরের ছবি দেখালে তারা তাকে ‘সাঈদ ভাইয়ের খালাতো ভাই’ হিসেবে শনাক্ত করেন। জঙ্গিদের ভাড়া করা ওই বাড়িতে রান্নার কাজ করতেন যে নারী, তিনিও আবিরের ছবি দেখে শনাক্ত করেছেন।

এর আগের দিন বৃহস্পতিবার বাড়ির মালিকের স্ত্রী ও ফুটবল খেলার সাথিরা ছবি দেখে নিবরাসকে শনাক্ত করেন। শুক্রবার আবার সেখানে আবিরের ছবি দেখানো হয়। স্থানীয় দুই তরুণ বলেন, এই ছবি সাঈদ ওরফে নিবরাসের খালাতো ভাইয়ের। তিনি সবার সঙ্গে মিশতেন না, ফুটবলও খেলতেন না। মাঠের পাশে বসে সময় কাটাতেন। মাঝে মধ্যে মাঠের পাশে ছোট জায়গায় বাচ্চাদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলতেন।

ওই দুই স্থানীয় তরুণ বলেন, ওই ভাইয়ের নাম কী জিজ্ঞাসা করলে তিনি জবাব দেওয়ার আগেই সাঈদ ভাই বলতেন, ও আমার খালাতো ভাই। তারা বলেন, আবিরের চলাফেরা কিছুটা অপ্রকৃতিস্থ ছিল। কেমন যেন হেলেদুলে হাঁটতেন।

আবিরদের মেসে তিন বেলা রান্না করে দিয়ে আসতেন স্থানীয় এক নারী। তিনি বলেন, ‘সাঈদ ভাই (নিবরাস) আর ছবির এই ভাই (আবির) একই রুমে থাকতেন। তারা বেশির ভাগ সময় ঘরেই কাটাতেন।’ তিনি বলেন, সাঈদ ওরফে নিবরাস মাঝে মাঝে মোটরসাইকেল চালিয়ে বাইরে যেতেন, তবে আবিরকে বাইরে যেতে দেখিনি। আবির কবে মেস ছেড়ে গেছেন, তা তিনি (ওই নারী) নিশ্চিত করে বলতে পারেননি।

গত ৬ জুলাই ভোরে সোনালীপাড়ার ওই বাড়ির মালিক সাবেক সেনা সার্জেন্ট কওছার আলী, তাদের  কলেজপড়ুয়া দুই ছেলে বিনছার আলী ও বেনজির আলী, পাশের মসজিদের ইমাম মো. রোকনুজ্জামান ও সহকারী ইমাম সাব্বির আহম্মেদ রবকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আটক করে নিয়ে গেছে বলে পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত এদের কোনও বাহিনী আটক করার কথা স্বীকার করেনি। স্থানীয় পুলিশ ও র‌্যাব বলছে, তারা এ ব্যাপারে কিছু জানেন না।

ঝিনাইদহ পৌরসভার ৪ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর তোফাজ্জেল হোসেন জানান, সোনালী পাড়াটি আমার ওয়ার্ডের মধ্যে। নিবরাস ও আবিরের এখানে থাকার কথা শুনেছি। এছাড়া টেভিশনেও দেখাচ্ছে। ঝিনাইদহের পাশেই ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় আর শহরেই রয়েছে কেসি কলেজসহ অন্যান্য বেশ কয়েকটি কলেজ। সে কারণে প্রত্যেকটা মহল্লাহই ছেলে মেয়েদের যথেষ্ট মেস আছে। তবে এখানে কখনও কোনও ঘটনা ঘটেনি। ওইখানে একটি কমিউনিটিও রয়েছে। সেখারকার লোকজন শিক্ষিতও বটে। কয়েকজন বিসিএস ক্যাডারও আছে। সেখানকার মেজর রাজ্জাক ২ শতক জমিও দিয়েছেন মসজিদ নির্মাণের জন্য। মাঝ খানে এই ঘটনা শুনে আমরাতো হতভম্ব হয়ে গেছি। আমরা তো কর্মজীবী মানুষ, আমাদের তো এত গভীরের কথা জানার নয়। এসব বিদেশ ফেরত  ট্যালেন্ট  ছেলেকে বোঝা আমাদের পক্ষে কি সম্ভব?  

ঝিনাইদহ সদর থানার নবাগত অফিসার-ইন-চার্জ (ওসি) হরেন্দ্রনাথ সরকার জানান, সোনালীপাড়া ঘটনা আমি শুনেছি। তবে এ ব্যাপারে কোনও বক্তব্য দিতে পারব না। ঝিনাইদহ শহরে কতগুলো মেস আছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, এর একটি তালিকা আছে। পুলিশ নতুন করে তালিকা তৈরি করছে। সুস্পষ্ট মেসের কোনও সংখ্যা আছে কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন, তালিকা তৈরি হচ্ছে বিভ্রান্তিমূলক কোনও তথ্য দিতে পারব না।

এদিকে সাঈদ পরিচয়ে নিবরাসসহ আট জন ঝিনাইদহে গত চার মাস ধরে বসবাস করার সময়ে চারটি আলোচিত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এসব হত্যাকাণ্ডের মধ্যে গত ৭ জুন ঝিনাইদহ সদর উপজেলার করোতিপাড়া গ্রামের আনন্দ গোপাল গাঙ্গুলী খুন হন। এর আগে গত ৭ জানুয়ারি ঝিনাইদহ সদর উপজেলার কালুহাটী গ্রামের বেলেখাল বাজারে খ্রিস্টান হোমিও চিকিৎসক সমির বিশ্বাস ওরফে সমির খাজা ও ১৪ মার্চ কালীগঞ্জ শহরের নিমতলা এলাকার শিয়া মতবাদের হোমিও চিকিৎসক আব্দুর রাজ্জাককে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। সর্বশেষ গত ১ জুলাই ঝিনাইদহ সদর উপজেলার উত্তর কাস্টসাগরা গ্রামের স্থানীয় রাধামদন মঠের গোসাই (সেবায়েত) শ্যামানন্দ দাসকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।

এসব ঘটনার সঙ্গে তারা জড়িত বলে সন্দেহ করছেন ঝিনাইদহবাসী। বিভিন্ন পত্রপত্রিকা, টিভি চ্যানেল ও অনলাইনে এসব খবর প্রকাশের পর জেলার বিভিন্ন স্থানে মানুষের মধ্যে নানা আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠেছে। 

কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় নিহত আবিরের বাসা ঢাকায় বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায়। তিনি নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে বিবিএ পড়তেন। এর আগে তিনি ‘ও’ লেভেল, ‘এ’ লেভেল সম্পন্ন করেন বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল টিউটোরিয়ালে (বিআইটি)। আবিরদের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লা জেলার দেবীদ্বার উপজেলায় বলেও জানা গেছে।

এ ব্যাপারে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা কোনও তথ্য দিতে পারেননি। ঝিনাইদহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আজবাহার শেখ জানান, এসব ঘটনার বিষয়ে আমরা কিছুই জানি না। তিনি বলেন, এদের কে আটক করেছে, কেন করেছে বলতে পারছি না।

সদর সার্কেলের এএসপি গোপিনাথ কানজিলালও জানান, এই ঘটনার বিষয়ে তার কিছুই জানা নেই।

অন্যদিকে র‌্যাব-৬ ঝিনাইদহ ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার মেজর মুনির জানান, তারা কাউকে আটক করেননি। এ সংক্রান্ত কোনও তথ্যও তাদের কাছে নেই। তবে বাইরের কোনও টিম এসে তাদের আটক করলেও করতে পারে।

উল্লেখ্য, ঝিনাইদহের সোনালীপাড়ায় জঙ্গিদের অস্তানার পাশের মসজিদের ইমাম ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রোকনুজ্জামান জঙ্গি সাঈদ ওরফে নিবরাসকে ২ হাজার ৩০০ টাকায় সাবেক সেনা সার্জেন্ট কওছার আলীর বাড়িটি ভাড়া করে দেন।

আরও পড়তে পারেন: গুলশান হামলার পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি দেশেই: ডিএমপি কমিশনার

/এফএস/এমএনএইচ। 

লাইভ

টপ