জঙ্গি ছেলের মুখ দেখতে চান না মা

বিপুল সরকার সানি, দিনাজপুর
২৮ জুলাই ২০১৬, ১৩:২৭আপডেট : ২৮ জুলাই ২০১৬, ১৩:৪৯




নিহত জঙ্গি আব্দুল্লাহ ঢাকার কল্যাণপুরে নিহত জঙ্গি মোতালেব ওরফে আব্দুল্লাহর লাশ নিতে চায় না পরিবারের লোকজন। এলাকাবাসী চান না তার লাশ দাফন হোক তাদের গ্রামে। আর মা দেখতে চান না তার ছেলে জঙ্গি আব্দুল্লাহ’র মুখ।

আজ বৃহস্পতিবার (২৮ জুলাই) সকালে দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার দাউদপুর ইউনিয়নের ভল্লবপুর এলাকায় গেলে সবাই এমন কথাই বলেন।

আব্দুল্লাহর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তার বাড়িতে থমথমে অবস্থা। জটলা বেঁধে লোকজন কথাবার্তা বলছেন।

এদিকে, রাতেই নিহত জঙ্গি আব্দুল্লাহর বাবা ও এক ভাইকে আটক করে ঢাকায় পাঠিয়েছে পুলিশ। পুলিশ বলছে, তারা আটক নন। ডিএনএ মিলানোর জন্য তাদের ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। আর আব্দুল্লাহ যে জঙ্গি সম্পৃক্তায় জড়িত, তার কোনও তথ্য ছিল না তাদের কাছে।

সকালে ভল্লবপুর এলাকায় যাওয়া হলে সাংবাদিকদের দেখার পর অনেকেই এগিয়ে আসেন। প্রথমে কথা হয়, আব্দুল্লাহর ভাই আবুল কালামের সাথে।

তিনি জানান, আব্দুল্লাহ ভল্লবপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ৫ম শ্রেণি পাস করার পর হাকিমপুর উপজেলার হিলি মাদ্রাসায় ভর্তি হয়। সেখান থেকে নওগাঁ জেলার আলাদিপুর হেফজ মাদ্রাসায় চলে যায়। সেখান থেকে সে ঢাকার নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ ফাজিল মাদ্রাসায় ফাজিল ১ম বর্ষে পড়াশোনা করতো।

জঙ্গি আব্দুল্লাহর বাড়িতে লোকজনের ভিড় আবুল কালাম জানান, পড়ালেখার অজুহাতে সে (আব্দুল্লাহ) এক বছর ধরে বাড়িতে আসেনি। তবে মাঝেমধ্যে মোবাইলে কথা বলতো সে। ৭/৮ দিন আগেও মোবাইলে কথা বলেছে সে। জানিয়েছে, কোরবানির সময় বাড়িতে আসবে। তবে সে যে জঙ্গি হয়েছে, সেটি তাদের জানা ছিল না।

এমন ভাই যেন আর কারও না হয় জানিয়ে তিনি বলেন, তার (আব্দুল্লাহ) লাশ নিতে চান না তারা। সে জাতির শত্রু। পাশাপাশি ভঙ্গ করেছে পরিবারের বিশ্বাস। তাকে বিশ্বাস করে কষ্ট করে পড়ালেখার খরচ পাঠানো হতো। কিন্তু সে এমনটি হবে, তা তারা কল্পনাও করেননি।

তিনি জানান, ৭/৮ দিন আগে শেষ মোবাইলে শেষ কথা হয় আব্দুল্লাহর সাথে।

নিহত জঙ্গি সদস্য আব্দুল্লাহর আরেক ভাই আব্দুস সালাম বলেন, তারা চার ভাই, এক বোন। দুই ভাই রাজমিস্ত্রি ও এক ভাই কাঠমিস্ত্রির কাজ করেন। বোনের বিয়ে দিয়েছেন।

তিনি বলেন, সবার আদরের ছিল আব্দুল্লাহ। সবাই মিলে তার পড়াশোনার খরচ যোগাতেন। কিন্তু তাদের কষ্টের এমন প্রতিদান দেবে, তা কখনও ভাবতে পারেননি তারা।

কান্না জড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ভাই তাদেরকে বলতো, পড়ালেখা শিখে সরকারি চাকরি করবে। মেরিনে সে চাকরি চেষ্টা করছে, এমনটি জানা ছিল পরিবারের। কিন্তু সে যে জড়িয়ে পড়েছে জঙ্গি সম্পৃক্ততায়, তা কখনোই মনে হয়নি।

এদিকে, আব্দুল্লাহর নিহত হওয়ার খবর পাওয়ার পর থেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন তার মা মোসলেমা খাতুন।

বিছানায় শুয়ে থেকেই জানালেন, তার ছেলে ভালো ছিল। কীভাবে সে এই পথে আসলো, তা তারা জানেন না। আশা ছিল, বড় হয়ে পরিবারের অভাব দূর করবে। কিন্তু হয়েছে জঙ্গি। এমন ছেলের মুখও দেখতে চান না তিনি।

তিনি জানান, সরকার যাতে এমন পদক্ষেপ গ্রহণ করে যে, আর কোনও পরিবার থেকে ছেলেরা যেন জঙ্গি তৎপরতায় জড়িত হয়ে না পড়ে।

জঙ্গি আব্দুল্লাহর বাড়ির সামনের অংশ আব্দুল্লাহর বড় আব্বা (চাচা) সাইফুল ইসলাম জানান, পড়ালেখায় ভালো ছিল আব্দুল্লাহ। লেখাপড়া শিখে সে আলেম হবে, এমন ইচ্ছা ছিল তাদের। কিন্তু সেই ইচ্ছায় পানি ফেলে দিয়েছে সে। এমন সন্তানের লাশ চান না তারা।

তবে আব্দুল্লাহ কীভাবে জঙ্গি হয়েছে, তা তারা জানতে চান। যারা তাকে জঙ্গি বানিয়েছে, তাদেরও বিচার চান তারা।

এলাকার ফরিদুল ইসলাম ও সুলতান জানান, আব্দুল্লাহর ব্যবহার ভালো ছিল। পরিবারের সাথে দূরত্বের কারণে সে জঙ্গিদের সাথে সম্পৃক্ত হয়েছে বলে মনে করেন তারা। কিন্তু যেহেতু সে জাতির শত্রু, মানুষ হত্যা করে, সেহেতু তার লাশ গ্রামের মাটিতে দাফন হোক, তা তারা চান না।

এবিষয়ে নবাবগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইসমাইল হোসেন জানান, নিহত আব্দুল্লাহর নাম-পরিচয় জানার পর বাড়িতে গিয়ে তার বাবা ও এক ভাইকে আটক করে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।

তবে তিনি জানান, এটি আটক নয়, ডিএনএ মিলানোর জন্য তাদের নিয়ে আসা হয়েছে।

তিনি বলেন, নবাবগঞ্জে আরও জঙ্গি সদস্য রয়েছে এবং তাদের বিভিন্ন বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে তিনি জানান, আব্দুল্লাহ জঙ্গি ছিল এমন তথ্য তাদের কাছে ছিল না। আর যেহেতু পরিবারের সাথে মোবাইলে যোগাযোগ ছিল, তাই সে যে নিখোঁজ, এমন কোনও অভিযোগও দেয়নি পরিবারের পক্ষ থেকে।

লাশ নিয়ে আসা হবে কিনা এ ব্যাপারে তিনি বলেন, পরিবারের লোকজন ও এলাকাবাসী তার লাশ গ্রহণ করতে চাইছে না। এলাকাবাসী সাফ জানিয়ে দিয়েছে, আব্দুল্লাহর লাশ গ্রামে প্রবেশ করতে দেবে না। লাশ নিয়ে এসে কোনও ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার উদ্ভব হোক, এমনটি চান না তারা।

তারা জানিয়েছেন, আব্দুল্লাহর বাবা ও ভাই ঢাকায় গেছে। যদি তারা লাশ নিতে না চান, তাহলে আঞ্জুমান মফিদুলের মাধ্যমে ঢাকায় দাফন করা হবে।

মঙ্গলবার (২৬ জুলাই) ভোরে রাজধানীর কল্যাণপুরের ৫ নম্বর রোডের ছয়তলা ভবনের পঞ্চমতলায় জঙ্গি আস্তানায় পুলিশের অভিযানে নয় জঙ্গি নিহত হয়। অপারেশন স্টর্ম-২৬ নামে প্রায় ঘণ্টাব্যাপী অভিযান আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।
এতে র‌্যাব-পুলিশের অন্তত এক হাজার সদস্য অংশ নেন। এর আগে সোমবার রাত সাড়ে ১১টা থেকে ভবন ও তার আশেপাশের এলাকা ঘিরে রেখেছিল পুলিশ।

মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে এই অভিযান শুরু হয়। ওই ভবনে ১১ জন জঙ্গি ছিল। এর মধ্যে সোমবার রাতে ভবনটি থেকে লাফিয়ে পালানোর সময় রাকিবুল হাসান রিগ্যান নামে এক জঙ্গিকে গুলি করার পর আটক করে পুলিশ। আরেকজন পালিয়ে যায়।

নিহত জঙ্গিদের একজন হচ্ছেন দিনাজপুরের আব্দুল্লাহ।

এবি

 আরও পড়ুন- 

নিহত জঙ্গিরা বেসরকারি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসহ বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক
মর্গে লাশ দেখে গেলেন অর্কের পরিবার, নিশ্চিত হবেন ডিএনএ টেস্টের পরই

বিএনপির সঙ্গে জঙ্গিদের গোপন যোগসূত্র আছে কিনা দেখতে হবে: প্রধানমন্ত্রী

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
শেষ মুহূর্তেও একে অপরকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছিলেন তারা
শেষ মুহূর্তেও একে অপরকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছিলেন তারা
ছোট ছেলে শ্বশুরবাড়ি, বড় ছেলের ঘরের মেঝে খুঁড়ে মায়ের লাশ উদ্ধার
ছোট ছেলে শ্বশুরবাড়ি, বড় ছেলের ঘরের মেঝে খুঁড়ে মায়ের লাশ উদ্ধার
‘শাহজালালে হাজিদের লাগেজ কেটে চুরির অভিযোগ সঠিক নয়’
‘শাহজালালে হাজিদের লাগেজ কেটে চুরির অভিযোগ সঠিক নয়’
৩০০ ফিটে প্রাইভেটকারের ধাক্কায় চীনা নাগরিকের মৃত্যু
৩০০ ফিটে প্রাইভেটকারের ধাক্কায় চীনা নাগরিকের মৃত্যু
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের