আপদ ঠেকানো শেখানো হয় যেখানে

Send
তৌহিদ জামান, যশোর
প্রকাশিত : ১৫:৪৬, ডিসেম্বর ০৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০৯:৫১, ডিসেম্বর ০৮, ২০১৯

শঙ্করপুরে বয়স্কশিক্ষা কার্যক্রমশিক্ষার্থীদের সবার বয়সই ৬০-৬৫ বছরের ওপরে। কেউ কাজ করেন বাসাবাড়িতে, কেউ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে, আবার কেউ নিজেই ক্ষুদ্র ব্যবসায় জড়িত। সংসারের হাল টানা আর জীবনের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে লেখাপড়া করা হয়নি তাদের কারও। এ কারণে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে ঠকতে হয়েছে তাদের। কিন্তু তাদের সন্তান বা নাতির বয়সী কিছু ছেলেমেয়ে পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। অক্ষরজ্ঞান দেওয়ার পাশাপাশি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, স্বাস্থ্য সচেতনতা, মোবাইল ফোন ব্যবহারের মতো জরুরি বিষয় শেখাচ্ছেন তারা। বিপদে-আপদে সহজে পার পাওয়ার জন্য শেখানো হচ্ছে ৯৯৯, ৩৩৩ ও ১০৯-এর মতো হটলাইনগুলোর সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে। এই পুরো কাজটি করা হচ্ছে কোনও ধরনের টাকা-পয়সা বিনিময় ছাড়াই।

অভিনব এই বয়স্ক শিক্ষার কাজটি করছে যশোর ইনফো ফাউন্ডেশন নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। এর সদস্যরা যশোর শহরের শঙ্করপুর এলাকার আশপাশের অক্ষরজ্ঞানহীন মানুষকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করছেন। শহরের শঙ্করপুর গোলাম প্যাটেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তিনটি কক্ষে সপ্তাহে ছয়দিন বিকালে চলছে এই বয়স্ক শিক্ষা কার্যক্রম। বিনামূল্যের এই বয়স্ক শিক্ষা কেন্দ্রের শিক্ষার্থীদের বেশিরভাগ অন্যের বাড়িতে ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। সারাদিনের কাজকর্ম শেষে বিকালে তারা সমবেত হন পুথিগত ও ব্যবহারিক শিক্ষা নিতে।যশোরে অভিনব বয়স্কশিক্ষা কার্যক্রম

এখানে বাংলা, অঙ্ক, ইংরেজি, সাধারণ জ্ঞান, ধর্ম, স্বাস্থ্য ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয় ছাড়াও শেখানো হচ্ছে মোবাইল ফোনের ব্যবহার। শেখানো হচ্ছে হটলাইনগুলোর সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে। যাতে তারা হিসাব-নিকাশের পাশাপাশি বিপদে-আপদে সহজেই পেতে পারেন সরকারি সুযোগ-সুবিধাগুলো। বয়স্ক শিক্ষার্থীদের পড়ানোর জন্য কেন্দ্রে আছেন তিনজন শিক্ষক। তারা নিজেরাই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করছেন। কোনও প্রকার বেতনভাতা ছাড়া কেবল মনের প্রশান্তির জন্য কাজ করে যাচ্ছেন তারা। আর তাদের গাইড করার জন্য রয়েছেন সংগঠনের ভাইস চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান খান।

শিক্ষার্থী হামিদা বেগম (৫৫) বলেন, ‘ছোটবেলায় কিছুদিন লেখাপড়া করেছি। পরে আর মনে ছিল না। এখন আমি থ্রিপিস ও কাপড়ের ব্যবসা করি। কিন্তু হিসাব করতে পারতাম না। গত তিন বছর আমি এখানে শিক্ষা নিয়ে এখন সবকিছু লিখে রাখতে পারি। প্রতিদিন বিকালে তাই স্কুলে চলে আসি। এখন আর কেউ ব্যবসায়ে ফাঁকি দিতে পারবে না।’যশোরে অভিনব বয়স্কশিক্ষা কার্যক্রম

বয়স্ক শিক্ষার্থী হাসিনা খাতুন (৬০) বলেন, ‘গত চার বছর ধরে আমি পড়ালেখা করে এখন বাংলা, ইংরেজি, অঙ্ক ও ধর্ম শিক্ষায় অনেককিছু জানতে পেরেছি। টাকা-পয়সার হিসাব-নিকাশ এখন নিজেই করতে পারি। আগে মোবাইল ফোন চালাতে পারতাম না, এখন পারি। সেই সঙ্গে আরও অনেক কিছু শিখতে পারছি।’

সুফিয়া বেগম (৬০) বলেন, ‘ছোটবেলায় বাবা মায়ের সংসারে অভাবের কারণে পড়ালেখা করতে পারিনি। এখন নিজের সংসার শেষ করে প্রতিদিন বিকালে পড়ালেখা করতে আসি। ফলের ব্যবসা আছে, সেখানে আমি এখন হিসাব করে রাখতে পারি।’

শিক্ষক সেলিনা খাতুন সোনিয়া যশোর সরকারি মহিলা কলেজের অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। তিনি বলেন, ‘গত চার বছর ধরে মা ও নানির বয়সী মহিলাদের শিক্ষক হিসেবে কাজ করছি। এখানে যারা আসেন, তারা সবাই খুব আন্তরিকভাবে শিক্ষা গ্রহণ করেন। তাদের পড়াতে পেরে আমি নিজেকে ধন্য মনে করি।’শঙ্করপুরে বয়স্কশিক্ষা কার্যক্রম

মহিলা কলেজের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের আরেক শিক্ষার্থী সালমা খাতুন ঊর্মি বলেন, ‘বিকালে খেলাধুলা করে সময় পার করতাম। এখন মা-খালাদের পড়াতে পেরে খুব ভালো লাগে। তারা সহজে কিছু বোঝেন না, কিন্তু শিখতে অপারগতা প্রকাশ করেন না। যখন পড়াই, মনোযোগ দিয়েই পড়েন। সবকিছু ভালোভাবে নেন। দেখা যাচ্ছে, মুষলধারায় বৃষ্টি হচ্ছে, কিন্তু তারা ফাঁকি দেন না। ঠিকই ক্লাসে এসে উপস্থিত হন।’

আরেক শিক্ষক হাবিবা জান্নাত মাস্টার্স করছেন। তিনি বলেন, ‘এখান থেকে কিছু শিখে যদি তারা নিজেদের ছোটখাট সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারেন, তবে সেটাই আমাদের জন্য বড় আনন্দের।’

যশোর ইনফো ফাউন্ডেশনের সহ-সভাপতি হাবিবুর রহমান খান বলেন, ‘শিক্ষার কোনও বয়স নেই। সেই ধারণা থেকে কোনও প্রকার অর্থ গ্রহণ ছাড়াই আমরা বয়স্ক শিক্ষার কার্যক্রম চালাচ্ছি। এখানে শুধু বই-ই পড়ানো হয় না। একইসঙ্গে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, প্রাথমিক স্বাস্থ্যজ্ঞান, কোন খাদ্যে কী ধরনের পুষ্টি আছে, এমনকি সাধারণ জ্ঞানের বিষয়েও শিক্ষা দেওয়া হয়। এসব বয়স্ক মানুষ কীভাবে ব্যাংকে টাকা জমা দিতে হয় বা চেকের মাধ্যমে কীভাবে টাকা তুলতে হয়, তাও শিখেছেন। শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির ওপরে দুই মাস পরপর পুরস্কারের ব্যবস্থাও রয়েছে। পুরস্কারের ক্ষেত্রে দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার্য জিনিসপত্রকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়।’যশোরে অভিনব বয়স্কশিক্ষা কার্যক্রম

তিনি বলেন, ‘শুরুতে এখানে বয়স্ক পুরুষদেরও শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু জায়গার অভাবে আমরা সেটি বন্ধ রেখেছি।’

যশোর ইনফো ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ইকবাল হোসেন সিদ্দিকী মিশু বলেন, ‘প্রায় ১১ বছর ধরে চলা এ কেন্দ্রটির কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে স্থায়ী অবকাঠামোর প্রয়োজন। সরকার যদি আমাদের জন্য একটু বরাদ্দ করতো, তাহলে নিজস্ব অর্থায়নে ছোটখাট স্থাপনা গড়ে তুলতে পারতাম। তাহলে আমরা দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রম নিতে পারতাম। নারীদের পাশাপাশি পুরুষরা এখানে আসতে পারতেন।’

২০০৮ সালে শুরু হওয়া এই শিক্ষাকেন্দ্র থেকে দুই হাজারের বেশি বয়স্ক মানুষ শিক্ষা নিয়েছেন। আর বর্তমানে এই কেন্দ্রের শিক্ষার্থী সংখ্যা ১৩০ জন।

যশোর পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘বয়স্কদের পড়ালেখার যে কাজটি শঙ্করপুর এলাকায় হচ্ছে, সে সম্পর্কে অনেকের কাছেই শুনি। তারা খুবই ভালো একটি কাজ করছে। যারা এখানে লেখাপড়া শেখেন, তারাই এটা আমাকে জানিয়েছেন। এর উদ্যোক্তারা নিজেরাই চাকরি করে অর্থ জোগাড় করেন এই স্কুল চালানোর জন্য। এটি একটি অনুকরণীয় উদ্যোগ।’

যশোরের জেলা প্রশাসক মো. শফিউল আরিফ বলেন, ‘আমি এই বিষয়ে শুনেছি। শিগগিরই স্কুলটির কার্যক্রম পরিদর্শনে যাবো। স্কুলের জন্য যেসব সুযোগ-সুবিধা চাওয়া হচ্ছে, সেবিষয়ে জেনে যথাযথ ব্যবস্থা নেবো।’

 

 

/এফএস/এমএমজে/

লাইভ

টপ