ছিন্নমূলদের অনেকেই পাচ্ছে না সরকারি শীতবস্ত্র

Send
বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
প্রকাশিত : ০৭:৫৯, জানুয়ারি ১৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:১৮, জানুয়ারি ১৯, ২০২০

 সারাদেশে জেঁকে বসেছে শীত। এতে সবচেয়ে বেশি কষ্টে আছে ছিন্নমূল ও নিম্নআয়ের মানুষ। প্রচণ্ড শীতে হতদরিদ্রদের কিছুটা উষ্ণতা দিতে সারাদেশে কম্বলসহ অন্যান্য শীতবস্ত্র পাঠাচ্ছে সরকার।  আর তা পেতে দীর্ঘলাইন ধরে ভিড় করছেন তারা। তবে অনেকেই সরকারি বরাদ্দের শীতবস্ত্র না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এছাড়া কেউ কেউ কম্বল বিতরণে অনিয়ম ও তা নিম্নমানের বলেও অভিযোগ তুলেছেন। কেউ কেউ বলছেন, ‘প্রতিবারই শোনা যায় সরকারি কম্বল দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু আমরা কখনও পাইনি।’  তবে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনের দাবি, চাহিদার তুলনায় শীতবস্ত্র কম হওয়ায় কাউকে কাউকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে। বিস্তারিত তুলে ধরা হলো বিভিন্ন জেলা থেকে বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে:

পঞ্চগড়

পঞ্চগড় জেলায় শীতার্ত মানুষের সংখ্যার তুলনায় কম্বল বা শীতবস্ত্র বিতরণের সংখ্যা খুবই নগণ্য। জেলায় ৪ লাখেরও বেশি অসহায়, দুঃস্থ, ছিন্নমূল বা হতদরিদ্র মানুষ রয়েছে বলে সরকারি বেসরকারিসহ বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। বিগত বছরগুলোর তুলনায় এবার শীতবস্ত্রের সরকারি বরাদ্দের পরিমাণও কম।

জেলার সদর উপজেলার ধাক্কামারা ইউনিয়নের লাঠুয়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা আবুল হোসেন (৭২) বলেন, ’৭৪ সাল থেকে রিকশা চালাই। চার জনের খরচ চালাই। রিকশা না চালালে তো ঘরে চুলা জ্বলবে না।কিন্তু,আমি এখন পর্যন্ত কম্বল বা একটা সোয়েটার বা সরকারি কোনও সুবিধা পাইনি।

আবার কম্বলের পাশাপাশি অন্য শীতবস্ত্রও দাবি করেছেন এলাকাবাসী।জেলার সদর উপজেলার হাড়িভাসা ইউনিয়নের ব্রম্মতলপাড়া এলাকার ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ আশরাফ আলী জানান, ‘দিনে যেমন-তেমন, রাতে খুব ঠাণ্ডা লাগে। খালি কম্বল দিয়ে কি শীত পালায়? মোটা সোয়েটার না হলে জ্যাকেট হলে সবসময় পরা যাবে। কম্বল গায়ে দিয়ে কি সব জায়গায় যাওয়া যায়?’

পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, ‘সরকারি-বেসরকারিভাবে যেসব শীতবস্ত্র বরাদ্দ পাওয়া গেছে তা পাঁচ উপজেলার ইউএনওদের মাধ্যমে প্রত্যন্ত এলাকায় বিতরণ করা হয়েছে। আরও ২৫ হাজার শীতবস্ত্র বরাদ্দ চেয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। ইতোমধ্যে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী পঞ্চগড়ের বিভিন্ন এলাকা সরেজমিন ঘুরে গেছেন। আশা করছি শিগগির আরও শীতবস্ত্র বরাদ্দ পাওয়া যাবে।’

দিনাজপুর

দিনাজপুরে প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনও অনেক দুস্থ মানুষের ভাগ্যে জোটেনি সরকারি শীতবস্ত্র এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে।তবে অভিযোগ অস্বীকার না করে জেলার ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা বলেছেন চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ অপ্রতুল।  

দিনাজপুর সদর উপজেলার ৪নং শেখপুরা ইউনিয়নের কিষাণবাজার এলাকায় কথা হয় ৬০ বছর বয়সী কাঞ্চু রায়ের সঙ্গে। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত কেউ আমাদের এলাকায় কম্বল বিতরণ করেনি। সরকার গরিব ও দুস্থ মানুষদের জন্য কম্বল দেয় এটা শুধু শুনেছি, পাইনি কখনও। শীতে তো গ্রামের লোকজনের কষ্টই বেশি।

দিনাজপুর জেলার ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোখলসেুর রহমান বলেন, ‘জেলায় এক লাখ কম্বলের চাহিদার কথা জানানো হয়েছিল। এর মধ্যে প্রায় ৭৭ হাজার কম্বল পাওয়া গেছে। এছাড়া কম্বল কেনার জন্য নগদ ১০ লাখ টাকা পাওয়া গেছে।’

 লালমনিরহাট

এবার লালমনিরহাট জেলার ৫টি উপজেলা ও ২টি পৌরসভার এলাকার শীতার্ত মানুষের মাঝে ১৪ জানুয়ারি পর্যন্ত ৪৫ হাজার ৭শ’ কম্বল সরকারিভাবে বিতরণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা ত্রাণ ও পুনবার্সন কর্মকর্তা আলী হায়দার। জেলায় আপাতত কোনও শীতবস্ত্র মজুত নেই। তবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, দূরবর্তী অঞ্চলগুলোতে যাতায়াতে যোগাযোগ ব্যবস্থা খারাপ হওয়ায় এবং দুস্থ লোকজনের তুলনায় পর্যাপ্ত ত্রাণ না থাকায় তৃণমুলের লোকজনের কাছে কেউ শীতবস্ত্র নিয়ে কেউ যেতে আগ্রহী নয়। এসব কারণে তৃণমূলের লোকজন শীতবস্ত্র পাচ্ছে না।

হাতীবান্ধা উপজেলার সিঙ্গিমারী ইউনিয়নের ইউপি চেয়ারম্যান মনোয়ার হোসেন দুলু বলেন, ‘পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র পাওয়া যায়নি। যেটুকু পাওয়া গেছে, তা আমার তিস্তার চরের একটা ওয়ার্ডের দুস্থদের মাঝেই হয় না। আমরা বিভিন্ন লোকজনের কাছ থেকে শীতবস্ত্র নিয়ে দুস্থদের মাঝে দিচ্ছি।’

লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক আবু জাফর বলেন, ‘আমরা আরও শীতবস্ত্র চেয়েছি। এবার ১০ হাজার পিস কম্বল, ১০ হাজার পিস সোয়েটার ও ১০ হাজার পিস জ্যাকেট চেয়েছি। বরাদ্দ পেলে শীতার্তদের মাঝে বিতরণ করা হবে।’

নীলফামারী 

তীব্র শীতে নীলফামারীতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। শীতে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাচ্ছে হতদরিদ্র ও খেটে খাওয়া মানুষ। এদিকে বরাদ্দ কম থাকায় অধিকাংশ অসহায় ও দুস্থরা শীতবস্ত্র থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

নীলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলার পূর্ব ছাতনাই ইউনিয়নের ওয়াজ উদ্দিন (৭০) বলেন,‘পাহাড়ের কাছে আমার বাড়ি,খালি ঠাণ্ডা লাগে। গেলবার মেম্বারের তরফ থেকে একটা কম্বল পেয়েছিলাম কিন্তু এবার তো কোনও খবর পেলাম না। ভাঙা ঘর দিয়ে বাতাস আসে। মানুষ বলে অনেক কম্বল পেয়েছে, আমারতো একটাও নাই।’

জেলা ত্রাণ ও পুর্নবাসন কর্মকর্তা এসএ হায়াত বলেন,‘জেলার ছয় উপজেলা ও চার পৌরসভায় শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়েছে ৪৪ হাজার। এরমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে ২৯ হাজার ৫০০ এবং ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে ১৪ হাজার ৫০০ কম্বল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।’

 কুড়িগ্রাম

নদ-নদী বিধৌত এ জেলায় শীতে নিদারুণ কষ্ট ভোগ করছেন চরাঞ্চলের বাসিন্দারা। সরকারি ও বেসরকারি ভাবে কম্বল বিতরণ হলেও তা পর্যাপ্ত নয় বলে জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার জনপ্রতিনিধিরা।

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের চিড়া খাওয়ার চরের সিরাজুল, রেজাউল ও মমিরন বেওয়া জানান, শীতের তীব্রতা বেশি। রাতে কম্বল গায়ে দিয়ে থাকি। দিনে ঠাণ্ডায় বাইরে বের হওয়া যায় না। কাজ না করলে খাবো কী? জাম্পার ( সোয়েটার), চাদর আর সঙ্গে কিছু খাবার দিলে উপকার হতো।

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিলুফা ইয়াসমিন বলেন, ‘শীতবস্ত্র হিসেবে কম্বলের পাশাপাশি শীতের পোশাকের চাহিদা পাঠানো হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন থেকে জেলা প্রশাসনকে বিষয়টি জানানো হয়েছে।’

রংপুর

রংপুর জেলায় তিন লাখ হতদরিদ্র শীতার্ত পরিবারের জন্য বরাদ্দ হয়েছে মাত্র ৭১ হাজার কম্বল। শীতবস্ত্র না পেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে নিম্নআয়ের অনেক মানুষ।  এদিকে শীতে আগুনে পোহাতে গিয়ে দগ্ধ হয়ে রংপুর মেডিক্যাল কলেজে বেশ কয়েক ব্যক্তি নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

মৃত আরেফা বেগমের মেয়ে মমতাজ বেগম জানান, তার মা ৯০ বছরের বৃদ্ধা ছিলেন। এই শীতে প্রয়োজনীয় শীতবস্ত্র তাদের ছিল না। দুটি কাঁথা আর একটা পাতলা কম্বল দিয়ে শীত নিবারণ না হওয়ায় বাধ্য হয়ে আগুন পোহাতে গিয়ে দগ্ধ হয়ে তার মা মারা যান।

একই কথা জানালেন মনোয়ারা বেগমের ছেলে জামান। তিনি রিকশা চালান। বলেন, যা আয় তা দিয়ে সংসার চলাই দুষ্কর, শীতবস্ত্র কেনার সামর্থ্য নেই। ফলে আগুন পোহাতে গিয়ে দগ্ধ হয়ে তার মা মারা যান। তাদের বাড়ি রংপুর নগরীর স্টেশন ও কোটারপাড়া এলাকায়।

জেলা প্রশাসক আসিব আহসান বলেন, ‘শীতার্তদের গরম পোশাক দিতে পারলে ভালো হতো। তারপরও আমরা অনেককেই শিশুদের পোশাকসহ টাকা দিয়েছি। মন্ত্রণালয় আরও শীতবস্ত্র দেবে বলে জানিয়েছে।’

 বগুড়া

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আজাহার আলী মন্ডল জানান, জেলায় সোয়া লক্ষাধিক মানুষ ছিন্নমূল ও দুস্থ। ত্রাণ মন্ত্রণালয় গত নভেম্বর থেকে ২ জানুয়ারি পর্যন্ত তিন দফায় ৭৭ হাজার ৭০০ কম্বল পাঠিয়েছে। নতুন করে আরও ৩৬ হাজার কম্বলের চাহিদা পাঠানো হয়েছে। বেসরকারি সংস্থাগুলো জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার কার্যালয়ের মাধ্যমে শীতবস্ত্র বিতরণের কথা থাকলেও তা করছে না। এজন্য তাদের চিঠি দেওয়ার চিন্তা-ভাবনা করা হচ্ছে।

এদিকে শীতে রেল স্টেশন, টার্মিনাল, খোলা মাঠ ও রোড ডিভাইডারে আশ্রয় নেওয়া ছিন্নমূল মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। বগুড়া স্টেশনের পূর্ব ও পশ্চিম পাশে আশ্রয় নেওয়া গাবতলীর সুখানপুকুরের ভিক্ষুক আফজাল হোসেন (৬৫) জানান, তিনি কম্বল পাননি। বাড়িতে তার স্ত্রী ও চার সন্তানকে কেউ কম্বল দেয়নি। শহরের রিকশাচালক সোনাতলার আসাদ আলী একটা কম্বল পেয়েছেন। কিন্তু কম্বল গায়ে জড়িয়ে রিকশা চালানো কঠিন। তাই কম্বলটি বাড়িতে রেখে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘কম্বলের পরিবর্তে সোয়েটার বা অন্য গরম কাপড় দিলে ভালো হতো।’ স্টেশনের প্লাটফরমে থাকা পথশিশু সোলায়মান (১৪) জানায়, সে একটা কম্বল পেয়েছে; কিন্তু সেটা সব সময় গায়ে দেওয়া যায় না। একই কথা বলেছেন আরও অনেকে।

নাটোর

নাটোর জেলার দরিদ্র, দুস্থ ও অসহায় জনসংখ্যার অনুপাতে অপ্রতুল কম্বল পৌঁছেছে। এ অবস্থায় আরও কম্বল বরাদ্দের দাবি জানিয়েছেন শীতার্তরা।

তথ্যমতে, ২০১১ সালের জনসংখ্যা জরিপ অনুযায়ী নাটোরের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৮ লাখ। এর মধ্যে প্রায় ১৫ ভাগ মানুষ অতি দরিদ্র। চলতি শীত মৌসুমে ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে জেলায় কম্বল পাঠানো হয়েছে ৩৭ হাজার ৩০০। অপরদিকে শিশুদের জন্য খাদ্য ও পোশাক কেনার জন্য জেলায় বরাদ্দ পাঠানো হয়েছে দুই লাখ টাকা। এ বরাদ্দ চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল হওয়ায় বিতরণে সমস্যায় পড়ছেন কর্তৃপক্ষ।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আলাউদ্দিন জানান,  জেলায় এ পর্যন্ত কম্বল এসেছে ৩৭ হাজার ৩০০। অপরদিকে শিশু খাদ্য ও পোশাক কেনার জন্য বরাদ্দ এসেছে দু'লাখ টাকা। কম্বল ও শিশু খাদ্য কেনার টাকা সাতটি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে জনসংখ্যার অনুপাতে বিতরণের জন্য পাঠানো হয়েছে।

বড়াইগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আনোয়ার পারভেজ জানান,উপজেলার মোট জনসংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন লাখ। এর মধ্যে দরিদ্র ও অসহায় জনসংখ্যা ১৫ ভাগ। কিন্তু তিনি এ পর্যন্ত কম্বল পেয়েছেন মাত্র সাড়ে পাঁচ হাজার। আর শিশুখাদ্য ও শিশুর পোশাক কেনার জন্য বরাদ্দ পেয়েছেন মাত্র ১১ থেকে ১২ হাজার টাকা। দরিদ্র জনসংখ্যার মধ্যে বিতরণের জন্য এই বরাদ্দ এক থেকে দেড় ভাগ মাত্র।

জেলার অন্য উপজেলাগুলোর অবস্থাও একইরকম। জেলা টিআইবির সচেতন নাগরিক কমিটির সভাপতি রণেন রায় জানান, দুস্থ মানুষদের জন্য শীতকালীন বরাদ্দ হিসেবে যে পরিমাণ কম্বল সরকার পাঠিয়েছে তা অত্যন্ত অপ্রতুল। তবে সরকারের পাশাপাশি অসহায় মানুষের পাশে বিভিন্ন এনজিওসহ সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন এগিয়ে এসেছে।

 কুমিল্লা

কুমিল্লা জেলায় শীতার্তদের জন্য সরকার এক লাখ ২৪ হাজার কম্বল বরাদ্দ দিয়েছে। তিন লাখ শীতার্তের জেলায় প্রয়োজনের তুলনায় কম্বলের পরিমাণ কম হওয়ায় গ্রামগঞ্জের অধিকাংশ ছিন্নমূল, হতদরিদ্র ও অসহায় মানুষ বঞ্চিত হয়েছে।

কুমিল্লা জেলার প্রায় তিন লাখের বেশি শীতার্ত মানুষ সরকারের এই কম্বল পাওয়ার যোগ্য বলে দাবি করেন জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মনিরুল হক।

তীব্র শীতেও কাজের জন্য ছুটছেন শ্রমজীবীরাচাঁদপুর

চাঁদপুরে এ বছর ত্রাণ মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে হতদরিদ্রদের জন্য ৬৭ হাজার কম্বল বরাদ্দ মিলেছে। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।শীতবস্ত্র না পেয়ে অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। অনেকেই আবার নিম্নমানের কম্বল বিতরণের অভিযোগও তুলেছেন।

জেলার পরিসংখ্যান অধিদফতরের কার্যালয়ের তথ্য মতে, জেলায় হতদরিদ্র মানুষের সংখ্যা আড়াই লাখের বেশি। তবে কম্বল বরাদ্দ করা হয়েছে মাত্র ৬৭ হাজার।

চাঁদপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কানিজ ফাতেমা বলেন, ‘এখানে অনেক গরিব মানুষ রয়েছে। যে পরিমাণ কম্বল এসেছে তা সবাইকে দেওয়া সম্ভব না। সরকার আরও কম্বল দিলে আমরা সেগুলো বিতরণ করে দেবো।’

গোপালগঞ্জ

তীব্র শীতে গোপলগঞ্জে খেটে খাওয়া মানুষ পড়েছে বেকায়দায়। তারা একদিকে  যেমন কাজে যেতে পারছেন না, আবার বেশি টাকা খরচ করে গরম কাপড়ও কিনতে পারছেন না। 

গোপালগঞ্জ শহরের রিকশাচালক আব্দুর রহমান জানান,কম্বল গায়ে দিয়ে রিকশা চালানো যায় না। যদি কেউ কম্বল বাদ দিয়ে তাদের মতো দরিদ্রদের জাতীয় গরম কাপড় দিতো তাহলে তাদের জন্য ভালো হতো।

গোপালগঞ্জ জেলার পাঁচটি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ৪০ হাজার ২০০ কম্বল বিতরণ করা হয়েছে।

তবে, পরিসংখ্যান অধিদফতরের উপ-পরিচালক রেজাউল করিম জানান, জেলায় ১ লাখ ৮৮ হাজার ৮০০ জন লোক অতিদরিদ্র রয়েছেন।

 মাগুরা

মাগুরায় সরকারিভাবে হতদরিদ্রদের মধ্যে কম্বল বিতরণ করা হলেও চাহিদার তুলনায় তা যথেষ্ট নয়। অনেকে শীতে কষ্ট পেলেও তারা কম্বল বিতরণের বিষয়টি জানে না। আবার অনেকেই সরকারি কম্বলের জন্য জেলা প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের কাছে ধরনা দিয়েও তা পাচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।

শহরের ছায়াবীথি সড়কের বস্তিবাসী সালেহা বেগম বলেন, আমি বিভিন্ন বাড়িতে কাজ করে সংসার চালাই। শুনেছি জেলা প্রশাসকের অফিস এবং উপজেলা পরিষদে কম্বল দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু,আমরা খবর পেয়ে সেখানে গিয়েও তা পাইনি।সেখান থেকে বলা হচ্ছে কম্বল বিতরণ শেষ হয়ে গেছে।

মাগুরা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা নুরুজ্জামান বলেন,‘আমরা নিজেরা কম্বল বিতরণ করি না। এগুলো সরকারি দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের মাধ্যমে বিতরণ হয়। যেহেতু চাহিদার তুলনায় কম্বলের সংখ্যা সীমিত তাই কেউ কেউ নাও পেয়ে থাকতে পারেন। তবে অধিকাংশ দরিদ্র মানুষ তা পেয়েছে। আমরা এবার ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ পাচ্ছি। আশা করছি এবার কম্বল ছাড়াও শীতের পোশাকও দিতে পারবো।’

সিরাজগঞ্জ

সিরাজগঞ্জে হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীরা সরকারি বরাদ্দ শীতবস্ত্র পায়নি বলে অভিযোগ তুলেছেন। এতে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে তাদের।সিরাজগঞ্জ সদর পৌরসভাধীন বিয়ারা গ্রামের বানু বেওয়া জানান, এ গ্রামের কেউই এবার শীতের কম্বল পাননি।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আব্দুর রহিম বলেন, ‘নিজ নিজ উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে এসব কম্বল হতদরিদ্র ও দুঃস্থদের মধ্যে বণ্টন করা হয়েছে।’ তবে, চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ অপ্রতুল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

টাঙ্গাইল

তীব্র শীতে টাঙ্গাইলে বরাদ্দ কম থাকায় অধিকাংশ অসহায় ও দুস্থরা শীতবস্ত্র থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অপরদিকে সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যান-মেম্বারদের বিরুদ্ধে শীতবস্ত্র বিতরণেও অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ রয়েছে দুস্থদের।

বাসাইল উপজেলার কাউলজানী উত্তরপাড়া এলাকার রওশান আরা বেগম বলেন,  আমার স্বামী মারা গেছে পাঁচ বছর আগে। এক মেয়েকে নিয়ে কষ্টে দিন কাটাচ্ছি। শুনেছি কম্বল বিতরণ হয়েছে, কিন্তু আমি পাইনি। যারা কম্বল পায় তাদের দুই-তিনটা করে ছেলে বিদেশ থাকে।’

মির্জাপুর উপজেলার তক্তারচালা গ্রামের আব্দুল মান্নানের স্ত্রী আয়শা বেগম বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ তারপরও কম্বল পাইনি। কবে কম্বল বিতরণ হয়েছে, তাও জানি না।’

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আব্দুল গণি বলেন, ‘এবার জেলার ১২টি উপজেলার জন্য প্রায় ৭৫ হাজার শীতবস্ত্র বরাদ্দ এসেছে। ছিন্নমূল মানুষদের মাঝে পৌঁছে দিতে শীতবস্ত্র বিভিন্ন উপজেলা প্রশাসনের কাছে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যেই সংশ্লিষ্টরা বিতরণ করেছেন।’

মুন্সীগঞ্জ

তীব্র শীতে মুন্সীগঞ্জে দুঃস্থ ও হতদরিদ্রের জন্য সরকারি বরাদ্দের কম্বল কেউ পাচ্ছে না, আবার কেউ প্রতিবছরই পাচ্ছে। মুন্সীগঞ্জের সদরের চরকিশোরগঞ্জ, মীরকাদিম এবং সিরাজদিখান উপজেলা ও লৌহজং উপজেলার বেদে সম্প্রদায় প্রায় প্রতি বছর বিভিন্ন উৎস থেকে শীতের কম্বল পায়। আবার, সদর উপজেলার আধারা ইউনিয়নের চরজাজিরার দরিদ্র মানুষের মধ্যে কেউ কম্বল পায়নি। 

মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার আধারা ইউনিয়নের চরজাজিরা নিবাসী শিক্ষার্থী আবু জাফর বলেন, এই গ্রামে অনেক হতদরিদ্র মানুষ আছে। কিন্তু সরকারি কম্বল কেউ পায়নি। বেসরকারিভাবেও কেউ কম্বল দেয়নি।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. রইসউদ্দিন মুকুল বলেন,  শীতে জেলায় সরকারি কম্বল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৩২ হাজার ২০০টি। এরমধ্যে ২৭ হাজার ৫৭২টি কম্বল হাতে পেয়েছি এবং বিতরণও হয়ে গেছে। মুন্সীগঞ্জে ৬৭টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভায় গড়ে ৪৬০টি কম্বল দেওয়া হয়েছে। গতবছর (২০১৮ সালে) ২৭ হাজার ৭০০টি সরকারি কম্বল দেওয়া হয়েছিল।

 শেরপুর

সরকারিভাবে শেরপুর জেলার বিভিন্ন উপজেলায় শীতার্তদের মাঝে শীতবস্ত্র কম্বল বিতরণ করা হলেও,তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। এদিকে কম্বল ছাড়া সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে সোয়েটার বা অন্যান্য শীতবস্ত্র বিতরণের উদ্যোগ দেখা যায়নি ।

ঝিনাইগাতী উপজেলার নলকুড়া ইউনিয়নের হলদীগ্রামের সাদা মিয়া (৬০) বলেন, আমরা তীব্র শীতের মধ্যে পাহাড়ি এলাকায় বসবাস করছি । এখনও কোনও শীতবস্ত্র পাইনি তবে শুনেছি ইউপি চেয়ারম্যান কম্বল বিতরণ করেছেন। একই অভিযোগ ওই গ্রামের রমেছা বেগমেরও (৫৫)।

জেলা ত্রাণ কর্মকর্তা এ এইচ এম আব্দুর রউফ বলেন, ‘বিগত সময়ের চেয়ে এবার শেরপুর জেলায় সরকারিভাবে শীতার্তদের জন্য অনেক বেশি শীতবস্ত্র কম্বল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। শীতবস্ত্রের কোনও চাহিদা ত্রাণ মন্ত্রাণালয়ে পাঠানো হয়নি। বরাদ্দ দেওয়া হলে এমনিতেই আসবে।’

সুনামগঞ্জ

জেলা ত্রাণ ও পুর্নবাসন অফিস সূত্রে জানা যায়, জেলার ১১টি উপজেলায় ৭ লাখ ১৭ হাজার ৩৮৩টি দুস্থ পরিবার রয়েছে। অথচ সুনামগঞ্জে ১১ জানুয়ারি পর্যন্ত মাত্র ৫৫ হাজার ৪০০টি কম্বল বিতরণ করা হয়েছে। হাওর, নদী ও পাহাড়বেষ্টিত এ জেলায় শীতের কারণে নিম্ন আয়ের লোকজন ও কৃষিজীবীরা বিপাকে পড়েছেন।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের এখানে যত কম্বল এসেছে তার সবই বিতরণ করা হয়েছে।  নুতন করে আরও ২০ হাজার কম্বলের জন্য আবেদন করা হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেগুলোর প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী বিতরণ করা হবে।’

 মৌলভীবাজার

মৌলভীবাজারে শীতের তীব্রতায় কষ্টদায়ক হয়ে পড়েছে মানুষের জীবনযাত্রা। বিশেষ করে চা-বাগান এলাকায় শীত সবচেয়ে বেশি। চা-গাছগুলো ঘন কুয়াশার আবরণে ঢাকা পড়ছে। শীতে স্বাভাবিক জনজীবনের কার্যক্রম ব্যাহতের পাশাপাশি জেলার বিভিন্ন স্থানে জ্বর-সর্দিসহ ডায়রিয়া ও ঠাণ্ডাজনিত রোগ দেখা দিয়েছে।

মৌলভীবাজার জেলা দুর্যোগ ও ত্রাণ পুনর্বাসন কর্মকর্তা আশরাফ আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মৌলভীবাজার জেলা সদরসহ সাতটি উপজেলায় ৪১ হাজার ২০০ কম্বল বিতরণ করা হয়েছে। আরও দুই হাজার বরাদ্দ আসছে। সেগুলোও বিতরণ করা হবে। নগদ ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ আসছে। সেখান থেকে শিশুদের পোশাক কেনা হবে দুই লাখ। বাকি টাকা দিয়ে শীতবস্ত্র (কম্বল) কিনে বিতরণ করা হবে।’

যশোর

যশোর জেলায় প্রধানমন্ত্রীর দফতর এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে এবার শীতে ৫৮ হাজার ৩০০ কম্বল বরাদ্দ হয়েছে। যেগুলো ইতোমধ্যে বিভিন্ন উপজেলা নির্বাহী অফিসারের মাধ্যমে বিতরণও করা হয়েছে।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. সানোয়ার হোসেন বলেন, ‘জনসংখ্যা, আয়তন ও দুস্থদের সংখ্যা নিরূপণ করে চাহিদাপত্র তৈরি করা হয়। সেক্ষেত্রে চাহিদা অনুযায়ী প্রাপ্ত কম্বল ঠিক আছে। এছাড়া, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে সম্প্রতি আরও দুই হাজার কম্বল এসেছে। সেগুলোও বিতরণ শুরু করা হয়েছে।’

গত ১০ জানুয়ারি দুপুরে যশোর সদর-৩ আসনের সংসদ সদস্য কাজী নাবিল আহমেদ তার পুরাতন কসবার কাজীপাড়ার অফিস ‘কাজী শাহেদ সেন্টার’-এ দুস্থদের মাঝে তিনশ’ কম্বল বিতরণ করেন।  এছাড়া বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রায় প্রতিদিনই শহর ও শহরের বাইরে কম্বল বিতরণ করা হচ্ছে।

 

/এনএস/এআর/এমএএ/এমআর/এমএনএইচ/ টিএন/

সম্পর্কিত

লাইভ

টপ