বিয়ের আনন্দের রেশ কাটতে না কাটতেই নেমে এলো শোকের ছায়া

Send
সাইফুল ইসলাম, মৌলভীবাজার
প্রকাশিত : ০৪:১৭, জানুয়ারি ২৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৪:৫৩, জানুয়ারি ২৯, ২০২০

হতাহতদের পরিবারের সদস্যদের আহাজারিমৌলভীবাজার শহরের একটি বাড়িতে মঙ্গলবার (২৮ জানুয়ারি) সকালে আগুন লেগে জুতা দোকানদার সুভাষ রায়সহ তার পরিবারের পাঁচ সদস্যের মৃত্যু হয়েছে। গত ২২ জানুয়ারি সুভাষ রায়ের বড় মেয়ে প্রিয়াঙ্কা রায়ের বিয়ে হয়। সোমবার (২৭ জানুয়ারি) ছিল বউভাত অনুষ্ঠান। এ উপলক্ষে বাড়িতে আত্মীয়-স্বজন গমগম করছিল। এরই মধ্যে আগুন লেগে প্রাণ হারান সুভাষ রায় (৬৫), তার মেয়ে প্রিয়া রায় (১৯), ভাইয়ের স্ত্রী দিপ্তী রায় (৪৮), শ্যালকের বউ দিপা রায় (৩৫) ও দিপা রায়ের মেয়ে বৈশাখী রায় (৩)। মুহূর্তে আনন্দঘন পরিবারটিতে নেমে আসে শোকের ছায়া।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে কিছুদিন আগেই নিজ জেলা হবিগঞ্জ থেকে সপরিবারে মৌলভীবাজার এসেছেন দিপা রায়। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে দুই-এক দিনের মধ্যেই পরিবারের সঙ্গে হবিগঞ্জে ফেরার কথা ছিল তার। কিন্তু মেয়েকে নিয়ে আর বাড়ি ফেরা হলো না দিপা রায়ের। আকস্মিক আগুন যে মা-মেয়ের জীবন এভাবে কেড়ে নেবে তা হয়তো ভাবেননি দিপা রায়ের স্বামী সজল রায় ও তার ছেলে। বিয়ের আনন্দের রেশ কাটতে না কাটতেই পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না কেউই।
নিহতদের আত্মীয় কমল পাল জানান, দিপা রায় ও তার মেয়ে বৈশাখী রায় আগুন লাগার পর অন্য সদস্যদের সঙ্গে বাসায় আটকা পড়েন। ছেলে বাসার বাইরে বেরিয়ে আসতে পারলেও ছোট মেয়ে বৈশাখীকে নিয়ে বের হতে পারেননি মা দিপা।
ঘটনাস্থালে উৎসুক জনতাশহরের এম সাইফুর রহমান সড়কের পিংকী সু স্টোর নামের একটি জুতার দোকানে মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯টায় ভয়াবহ ওই আগুন লাগে। তখন দোকানের শাটার বন্ধ ছিল। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে ওপরের দুই তালার কাঠের ঘরে। সেখানে বসবাস করতো সুভাষ রায় ও তার ভাই প্রণয় রায়ের পরিবার। পাঁচ জনের মৃত্যুর পাশাপাশি দগ্ধ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছেন প্রণয় রায়ও।
যেভাবে আগুনের সূত্রপাত
সুভাষ রায়ের মামাতো ভাই সুনির্মল কুমার দাস জানান, সকাল সাড়ে ৯টার দিকে লিকেজ হওয়া গ্যাসের রাইজার ফেটে আগুনের সূত্রপাত হয়। পরে আগুন নিচ তলায় জুতার দোকানসহ আশপাশে ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় সবাই বাসায় ছিলেন। অল্প সময়ের মধ্যে ধোঁয়ায় পরিবারের সদস্যরা শ্বাসরুদ্ধ হয়ে পড়েন। বাঁচার জন্য চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত সবাই বের হতে পারেননি।
চিকিৎসাধীন প্রণয় রায় বলেন, ‘ আমি দোকানের দ্বিতীয় তলায় ঘুমিয়ে ছিলাম। বড় ভাইয়ের স্ত্রী আগুন বলে চিৎকার দিলে আমি ঘুম থেকে উঠি। কারেন্টের বোর্ড থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে চারদিক ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়লো। মুহূর্তে পুরো ঘরে আগুন দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকলো।
স্থানীয়রা জানান, খবর পেয়ে মৌলভীবাজার ও শ্রীমঙ্গল ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আড়াই ঘণ্টা চেষ্টায় দুপুর ১২টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এরপর দোতলার বাসা থেকে পুলিশ পাঁচ জনের লাশ উদ্ধার করে মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।
আগুন নেভানোর চেষ্টা করছে ফায়ার সার্ভিসমৌলভীবাজার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স উপ পরিচালক মো. আব্দুল্লাহ হারুন পাশা জানান, তাদের ধারণা ছিল বৈদ্যুতিক সর্ট সার্কিট থেকে প্রথমে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হতে পারে। ঘরের ভেতরে একটি গ্যাস রাইজার ছিল, পরে ওই রাইজারে আগুন লাগে।
মৌলভীবাজার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আলমগীর হোসেন এবং সিআইডি ইন্সপেক্টর বিকাশ দাস জানান, ঘটনার পর পরই পুলিশের সঙ্গে সিআইডির পুরো টিম উদ্ধার অভিযানে যোগ দেয়। প্রাথমিকভাবে তারা জানতে পারে, সর্ট সার্কিট থেকে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত। পরে গ্যাসের রাইজার বিস্ফোরিত হয়ে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। তবে তদন্ত সাপেক্ষে পুরো বিষয়টি জানা যাবে।
ঘটনা তদন্তে দুই কমিটি
এ ঘটনা তদন্তে মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসন ও পৌরসভা আলাদা দুটি কমিটি গঠন করেছে। জেলা প্রশাসনের কমিটির বিষয়ে জেলা প্রশাসক বেগম নাজিয়া শিরিন বলেন, ‘আগুনে ৫ জনের মৃত্যুর ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে কারণ ও প্রতিকারের সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তানিয়া সুলতানার নেতৃত্বে কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন—পুলিশ সুপারের প্রতিনিধি অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) জিয়াউর রহমান, পিডিবির প্রতিনিধি, পল্লী বিদুৎ সমিতির প্রতিনিধি, পৌরসভার প্রতিনিধি কাউন্সিলার মনবির রায় মনজু, মৌলভীবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের প্রতিনিধি ও বিজনেস ফোরামের প্রতিনিধি। এই কমিটি চাইলে সংশ্লিষ্ট স্টেক হোল্ডার প্রতিনিধি সংযোজন করতে পারবে।’
তিনি বলেন, ‘কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে এই ধরনের ঘটনা যাতে না ঘটে, সে ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে ফায়ার সার্ভিসঅপর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন পৌরসভার মেয়র মো. ফজলুর রহমান। তিনি জানান, এই কমিটির আহ্বায়ক হলেন কাউন্সিলর জালাল আহমদ। কমিটির সদস্যরা হলেন— কাউন্সিলর ফয়ছল আহমদ, কাউন্সিলর স্বাগত কিশোর দাস চৌধুরী, পৌরসভার সচিব, মৌলভীবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডস্ট্রিজের প্রতিনিধি, বিজনেস ফোরামের প্রতিনিধি ও পৌরসভার বিদ্যুৎ বিভাগের প্রতিনিধিসহ অন্যরা।
এদিকে, এ ঘটনায় পুলিশের সিলেট রেঞ্জর ডিআইজি কামরুল আহসান বিপিএম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। এছাড়াও জেলা প্রশাসক বেগম নাজিয়া শিরিন, পুলিশ সুপার মো. ফারুক আহমেদ পিপিএম (বার), পৌরসভার মেয়র মো. ফজলুর রহমান, চেম্বার সভাপতি মো. কামাল হোসেন, বিজনেস ফোরামের সভাপতি নূরুল ইসলাম কামরানসহ প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।

মন্ত্রী-এমপিদের শোক
আগুনে মৃত্যুর ঘটনায় শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন পরিবেশ ও বন মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন, সদর আসনের সংসদ সদস্য নেছার আহমদ এবং অনুমিত হিসাব সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা ড. আব্দুস শহীদ এমপি। তারা নিহতদের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন।



/আইএ/

লাইভ

টপ