ইন্টার্নদের বিষয়ে বিতর্কিত চিঠি প্রত্যাহার‘জাতির কাছে আমাদের ভিলেন বানানো হয়েছে’

Send
ময়মনসিংহ প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ১৭:৩২, এপ্রিল ০৮, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৪১, এপ্রিল ০৮, ২০২০

ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এম-৫২ ব্যাচের চিকিৎসকদের ইন্টার্নশিপ কোর্সে যোগদান নিয়ে সৃষ্ট সমস্যার সমাধান হয়েছে। লকডাউন পরিস্থিতি উঠে গেলে তারা কাজে যোগ দেবেন বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. লক্ষী নারায়ণ মজুমদার। তবে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কাজে যোগ দেওয়ার বিষয়ে স্বাস্থ্য ও সেবা বিভাগের সচিবের কাছে পাঠানো হাসপাতাল পরিচালকের চিঠি নিয়ে সমালোচনা চলছে। এম-৫২ ব্যাচের ইন্টার্ন চিকিৎসকদের অভিযোগ ওই চিঠি দিয়ে তাদের জাতির কাছে ভিলেন বানানো হয়েছে। পরে অবশ্য ওই চিঠি বাতিল করে স্বাস্থ্য সচিবের কাছে নতুন চিঠি পাঠান পরিচালক।

ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজের এম-৫২ ব্যাচের শিক্ষার্থী শামস আবরার রিদমের দাবি, ‘আমরা পরিস্থিতির শিকার। একটি চিঠির মাধ্যমে আমাদেরকে জাতির কাছে ভিলেন বানানো হয়েছে।’

তিনি বলেন, পরীক্ষার ফলাফল বের হওয়ার পর সবাই কলেজ ছাত্রাবাসে অবস্থান করছিলাম, এরইমধ্যে করোনা ভাইরাসের কারণে সরকারের নির্দেশে গত ১৮ মার্চ কলেজ বন্ধ দিয়ে হল ছাড়ার নির্দেশ দেয় কর্তৃপক্ষ। পরে আমরাসহ সব মেডিক্যাল শিক্ষার্থীরা যার যার বাড়িতে চলে যাই। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ২৫ মার্চের মধ্যে ইন্টার্নশিপ প্রশিক্ষণে যোগদানের জন্য নোটিশ দিলেও আমরা কেউ জানতে পারিনি। এজন্য যোগদান করা সম্ভব হয়নি। পরে ২ এপ্রিল দুপুরে যোগদান করতে এসে জানতে পারি হাসপাতালের পরিচালক আমাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সচিব বরাবর চিঠি পাঠিয়েছেন। ওই চিঠির বিষয়টি আবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।

রিদম বলেন, চিঠিতে যে ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, এতে আমরা সমাজের কাছে ছোট হয়ে গেছি। এসবের পরও আমরা যোগদানের সময় বাড়ানোর জন্য আবেদন করেছি। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আগের পাঠানো চিঠি বাতিল করে নতুন করে সচিবের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজের এম-৫২ ব্যাচের ১৮৫ জন শিক্ষার্থী এমবিবিএস ফাইনাল পরীক্ষায় পাশ করেন। তাদের পরীক্ষার ফলাফল বের হয় ৮ মার্চ। এরই মধ্যে দেশে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় সরকারের নির্দেশে ১৮ মার্চ মেডিক্যাল কলেজ বন্ধ ঘোষণা করে শিক্ষার্থীদের হল ছাড়ার নির্দেশ দেয় কর্তৃপক্ষ। পাশ করা চিকিৎসকসহ শিক্ষার্থীরা হল ছেড়ে বাড়ি চলে যান। পরে ২৫ মার্চের মধ্যে ইন্টার্নশিপ প্রশিক্ষণে যোগ দেওয়ার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নোটিশ দেয়। তবে করোনা প রিস্থিতির কারণে নির্ধারিত সময়ে কেউ যোগদান করতে পারেননি। পরে নির্ধারিত সময়ে ইন্টার্নশিপ প্রশিক্ষণে যোগ না দেওয়ায় চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ২ এপ্রিল হাসপাতালের পরিচালক ব্রি. জেনারেল মো. নাছির উদ্দীন আহমদ (স্মারক-২৬৪৮/১(২০০) ) স্বাস্থ্য ও সেবা বিভাগের সচিবের কাছে চিঠি পাঠান।

চিঠিতে বলা হয়, ‘মানব সেবাই একজন চিকিৎসকের ধর্ম। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় ডাক্তার হয়ে এমন মহৎ পেশায় নিয়োজিত থেকে বর্তমান প্রাণঘাতী করোনা আক্রান্ত দেশের ক্রান্তিলগ্নে চরম মুহূর্তে জনগণের পাশে না থেকে করোনা সংক্রমণের ভয়ে এম-৫২ ব্যাচের ইন্টার্ন চিকিৎসকরা কাজে যোগদান করেননি। যা মানবতাবিরোধী এবং ডাক্তারি পেশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এটা কোনোভাবেই কাম্য না। এ বক্তব্যের আলোকে এম-৫২ ব্যাচের শিক্ষার্থীরা যাতে কোনও প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নশিপ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করার সুযোগ না পায়, এ জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করা হলো।’

এই চিঠি সচিবের কাছে পাঠানোর পরই এম-৫২ ব্যাচের চিকিৎসকদের কাছে খবরটি চলে যায় এবং এ বিষয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এই নিয়ে চিকিৎসক সমাজসহ নানা মহলে চলছে সমালোচনার ঝড়।

সচিবের কাছে চিঠি পাঠানোর বিষয়ে হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. লক্ষী নারায়ণ মজুমদার বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, একটি ভুল বোঝাবুঝি থেকেই চিঠি দেওয়া হয়েছিল। পরে চিকিৎসকদের আবেদনের প্রেক্ষিতে সেটা বাতিল করে নতুন চিঠি দেওয়া হয়েছে। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এবং লকডাউন উঠে গেলেই ইন্টার্নশিপ প্রশিক্ষণের জন্য পাশ করা চিকিৎসকরা যোগ দেবেন বলে জানান তিনি।

এদিকে নির্ধারিত সময়ে ইন্টার্নশিপ প্রশিক্ষণে যোগ না দেওয়ায় স্বাস্থ্য সচিবের কাছে পাঠানো চিঠির বিষয়ে সমালোচনা করেছেন জেলা বিএমএ’র সভাপতি ডা. মতিউর রহমান ভূঁইয়া। তিনি বলেন, এম-৫২ ব্যাচের এমবিবিএস পাশ করা চিকিৎসকরা ইন্টার্নশিপ প্রশিক্ষণে যোগ না দেওয়ায় স্বাস্থ্য বিভাগের সচিবের কাছে পাঠানো চিঠির ভাষা খুবই কঠিন ছিল। এভাবে চিঠি না দিয়ে আরেকটু সহনশীল হয়ে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি সমাধান করা যেতো। তবে আগের চিঠিটি বাতিল করে নতুন চিঠি দেওয়ায় ভুল বোঝাবুঝির সমস্যা থাকবে না বলেও জানান তিনি।

এ বিষয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জেলা বিএমএ’র সদস্য ও ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজের সাবেক উপাধ্যক্ষ ডা. একেএম আবুল হোসাইন। তিনি বলেন, এমন কঠিন এবং অশালীন ভাষায় চিঠি পাঠানোর আগে কলেজের অধ্যক্ষের সঙ্গে পরামর্শ করে ব্যবস্থা নেওয়া হলে সমস্যার সৃষ্টি হতো না। পরিচালকের এমন আচরণে চিকিৎসক সমাজ খুবই ক্ষুব্ধ।

তিনি আরও জানান, এমবিবিএস পাশ করার পর দেরিতে ইন্টার্নশিপ প্রশিক্ষণ করলেও কোনও সমস্যা নেই। একজন চিকিৎসককে ইন্টার্নশিপ প্রশিক্ষণ করতে হয় শুধুমাত্র বিএমডিসির রেজিস্ট্রেশনের জন্য।

এ বিষয়ে জেলা নাগরিক আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার নুরুল আমিন কালাম জানান, এক হাজার শয্যার ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার রোগী চিকিৎসা নেন। এই হাসপাতালে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা না থাকলে চিকিৎসা সেবা দিতে কর্মরত চিকিৎসকদের হিমশিম খেতে হবে। পাশ করা চিকিৎসকরা সময়মতো ইন্টার্নশিপ প্রশিক্ষণে যোগ না দেওয়ায় হাসপাতালের পরিচালক এ চিঠি দিয়েছেন। তবে চিঠির ভাষা আরও মার্জিত হলে চিকিৎসক সমাজ কষ্ট পেতো না। জাতির এই কঠিন সময়ে দু’পক্ষের মধ্যে আলোচনা করে সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানান এ নাগরিক নেতা।

 

/টিটি/

লাইভ

টপ