নির্মাণ করে বাড়ি ফেরার আগেই ভেঙে যাচ্ছে বাঁধ

Send
আসাদুজ্জামান সরদার, সাতক্ষীরা
প্রকাশিত : ০২:৫৯, মে ২৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৩:১৪, মে ২৭, ২০২০

বাঁধ নির্মাণে নেমেছেন এলাকাবাসীসাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার  উপকূলীয় এলাকায় ঘূর্ণিঝড় আম্পানের প্রভাবে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাস ও অতিবৃষ্টিতে বেড়িবাঁধ ভেঙে যায়। এতে করে জোয়ারের পানি প্রবেশ করতে থাকে মানুষের বাড়িঘরে। এক সপ্তাহ পার হলেও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে (পাউবো) না পেয়ে অধিকাংশ এলাকায় স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ নির্মাণে নেমে পড়েছেন স্থানীয়রা। কিন্তু নদীতে প্রবল জোয়ারের কারণে বাঁধ টেকানো যাচ্ছে না। এক পাশে বাঁধ নির্মাণ করে বাড়ি ফিরতে না ফিরতেই আরেক পাশের বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হচ্ছে।

জানা যায়, মঙ্গলবার (২৬ মে) ভোর থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের লেবুবুনিয়ায় স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মাসুদুল আলমের নেতৃত্বে তিন কিলোমিটার বেড়িবাঁধ আট হাজার জনগণকে সঙ্গে নিয়ে নির্মাণ করে বাড়ি ফিরতেই প্রবল জেয়ারে সেটা ভেঙে আবারও লোকালয়ে পানি প্রবশ করেছে। বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের দাতিনাখালী এবং কাশিমাড়ি ইউয়িনের ঘোলা এলাকায় স্বেচ্ছাশ্রমে রিংবাঁধ নির্মাণ করে বাড়ি ফিরতে না ফিরতে আবারও ভেঙে যায়।

বাঁধ নির্মাণে নেমেছেন এলাকাবাসীগাবুরা গাইনবাড়ি এলাকার আব্দুল হাসান বলেন, 'এলাকায় পানি প্রবাহিত হচ্ছে। গ্রামের ৭-৮ হাজার মানুষ সাত ঘণ্টা কাজ করে বাঁধ দিয়ে বাড়ি ফিরতে না ফিরতেই তা ভেঙে এলাকা নতুন করে প্লাবিত হয়েছে। কতবার ভাঙবে আর আমরা কতবার ঠিক করবো, বুঝতে পারছি না। আবার শুনছি, নতুন কোনও ঝড় আসছে। কী হবে আমদের? ঝড়ে বা জলোচ্ছ্বাসে গ্রাম প্লাবিত হলে এমপি-মন্ত্রীরা পরিদর্শনে এসে দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দিয়ে চলে যান। পরে আর খোঁজ থাকে না।'

বুড়িগোয়ালিনী এলাকার আব্দুল হালিম বলেন, 'ঘূর্ণিঝড় আম্পানের দিন দাতিনাখালী এলাকায় পাউবোর বেড়িবাঁধ ভেঙে যায়। সেখান থেকে আজ পর্যন্ত নদীর সঙ্গে লোকালয়ের জোয়ার ভাটা চলছে। পাউবোর কোনও খবর নেই। নিজেদেরকে নিজেদেরই বাঁচাতে হবে। তাই স্বেচ্ছাশ্রমে মঙ্গলবার ভোর থেকে বাঁধ মেরামত করছি। পুরো এলাকা এখনও মেরামত করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু মাটিতে বাঁধ খুব বেশি শক্ত হচ্ছে না। পানির চাপে আবার ভেঙে যাচ্ছে।'

জোয়ারের পানিতে তালিয়ে গেছে টিউবওয়েলশ্যামনগরের গাবুরা ইউপি চেয়ারম্যান মাসুদুল আলম বলেন, 'ঝড়ের পর বাঁধ ভেঙে এখনও এলাকায় জোয়ার ভাটা হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাউকে পাইনি। তবে তারা বাঁশ আর বস্তা দিয়ে আমাদের সাহায্য করেছে। আম্পানে গাবুরার লেবু বুনিয়ায় বাঁধের তিন কিলোমিটার নদীতে বিলিন হয়ে যায়। ঈদের দিনও আমার বাঁধ নির্মাণে কাজ করেছি। আজ আট হাজার জনকে নিয়ে চার জায়গা মেরামতের পর আবারও নতুন করে ভেঙে গেছে। আগামীকাল সকালে আবারও কাজে নেমে পড়বো।  নদীতে ব্যাপক জোয়ার, কোনও কিছু থাকছে না। রিংবাঁধ দিয়েও টিকছে না। আবার শুনছি ৩ নম্বর সিগন্যাল চলছে। কী হবে আল্লাহ জানেন।'

শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনী ইউপি চেয়ারম্যান ভবোতোষ কুমার মণ্ডল বলেন, 'আমার ইউনিয়নের দাতিনাখালী এলাকায় জনগণকে সঙ্গে নিয়ে স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করেছি। কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে। জোয়ারের চাপ কমলে আমরা আবারও কাজ করবো।'

নির্মাণের পর ভেঙে গেছে বাঁধতিনি আরও বলেন, 'পানি উন্নয়ন বোর্ডের গাফিলতির কারণে আমাদের এই অবস্থা। পানিতে ডুবে মরতে হচ্ছে উপকূলের কয়েক লাখ মানুষকে। তাদের জোড়াতালি দেওয়ার কারণে নদীতে একটু পানির চাপ হলেই বাঁধ ভেঙে এলাকায় পানি প্রবেশ করে। জনগণকে এসবের জবাবদিহিতা আমাদের দেওয়া লাগে। খুব বিপদে আছি।'

শ্যামনগরের কাশিমাড়ি ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুর রউফ বলেন, 'ঝড় হয়ে গেছে আজ ছয় দিন হয়ে গেলো। নদীর বাঁধ ভেঙে এলাকা একাকার হয়ে আছে পানিতে। কেউ  কোনও খবর নিচ্ছে না। তাই বাধ্য হয়ে পাঁচ হাজার জনকে নিয়ে বাঁধ নির্মাণের চেষ্টা করছি । এখন রিংবাঁধ দিয়ে পানি ঠেকাতে হচ্ছে। না হলে অনেক গ্রাম নদীগর্ভে বিলিন হয়ে যাবে। পানি উন্নয়ন বোর্ড জিও ব্যাগ দেয়। এছাড়া তাদের কোনও খোঁজ নেই। দেখতে আসে না, আমাদের কাজে সাহায্য পর্যন্ত করে না। তাদের ফোন দিলে তারা বলে, সেনাবাহিনী কাজ করবে। লুকোচুরি খেলার মতো, এক জায়গায় বাঁধ দিয়ে বাড়ি ফিরছি, অন্য দিকে ভেঙে যাচ্ছে।’

বাঁধ নির্মাণ করছেন এলাকাবাসীসাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ড-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবুল খায়ের বলেন, 'গাবুরা এলাকার মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করতে চেয়েছেন। তাদের আমরা বস্তা দিয়ে সাহায্য করেছি। তারা যেটা চাচ্ছে তখন সেটা সরবরাহ করছি। আমরা তো কাজ করি না। ঠিকাদাররা কাজ করবে, কিন্তু ঠিকাদার নিয়োগ করা সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। তারপরও আপাতত এলাকায় পানি বন্ধ করতে তাদের সাহায্য করছি।'

সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ড-২  এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নাহিদুল ইসলাম বলেন, 'আমরা ঈদের দিনও কাজ করেছি। সেনাবাহিনী কাজ করবে। সে কারণে রিপোর্ট করতে হচ্ছে। তাই আজ ছিলাম না। তবে যারা স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করেছেন, তাদের সব ধরনের বস্তা ও বাঁশ দিয়ে সাহায্য করছি।'

 

/আইএ/

লাইভ

টপ