নৈশপ্রহরী ও আয়া পদে নিয়োগে ১০ লাখ টাকা দাবি মাদ্রাসা সভাপতির! (অডিও)

Send
পাবনা প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ২১:১৮, জুলাই ০৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:৪৭, জুলাই ০৭, ২০২০

মাদ্রাসার সাইনবোর্ড

পাবনার চাটমোহরে এম কে আর আহাম্মদীয়া দাখিল মাদ্রাসায় নৈশপ্রহরী ও আয়া পদে নিয়োগে অনিয়ম-দুর্নীতি চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে মাদ্রাসার সভাপতি ও সুপারের বিরুদ্ধে। সম্প্রতি নিয়োগদানের আগে ১০ লাখ টাকার নিয়োগ বাণিজ্যের একটি কথোপকথন (অডিও রেকর্ড) ফাঁসের ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।

মাদ্রাসার সভাপতি ও মূলগ্রাম ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ নজরুল ইসলাম মল্লিক এবং এক চাকরি প্রত্যাশী ও তার ভাইয়ের প্রায় ১৫ মিনিটের অডিও রেকর্ডে ১০ লাখ টাকা নিয়োগ বাণিজ্যের স্পষ্ট কথোপকথন এখন এলাকার মানুষের মোবাইলে মোবাইলে ঘুরছে। শুধু মাদ্রাসার সভাপতিই নন, মাদ্রাসা সুপার মাওলানা আব্দুল লতিফের বিরুদ্ধেও চাকরি প্রত্যাশীদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

অডিও রেকর্ডিং ও সংশ্লিষ্ট তথ্যে জানা গেছে, এম কে আর আহাম্মদীয়া দাখিল মাদ্রাসার নৈশপ্রহরী ও আয়া পদে দরখাস্ত আহ্বান করে গত ২৬ মার্চ স্থানীয় পত্রিকায় একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ। দু’টি পদের বিপরীতে বেশ কিছু নারী ও পুরুষ আবেদন করেন। এরপর মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সভাপতি নজরুল ইসলাম মল্লিক ও মাদ্রাসা সুপার মাওলানা আব্দুল লতিফ আবেদনকারী বেশ কয়েকজনকে চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে আলাদাভাবে অগ্রিম টাকা গ্রহণ করা শুরু করেন বলে আবেদনকারীদের অভিযোগে জানা গেছে।

মাদ্রাসায় গড়ে তোলা হচ্ছে নতুন ভবন

অডিও রেকর্ডিংয়ে শোনা যায়, সভাপতি নজরুল ইসলাম ও এক আবেদনকারী তার এক অভিভাবকসহ দুই জনের সঙ্গে নিয়োগ দেওয়া নিয়ে দরদাম করছেন। সেখানে সভাপতি ১০ লাখ টাকা হলে চাকরি দেবেন মর্মে জানান এবং প্রার্থী পরিচিত বলে কিছু টাকা ছাড় দিয়ে ৯ লাখ টাকা নির্ধারণ করে দেন। ১০ লাখ টাকার দুই পার্টি দুই লাখ করে জমা দিয়ে রেখেছেন, এমনটাও উল্লেখ করেন তিনি। সভাপতি তাদের জানান, চাকরি দেওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষা অফিসার, ডিজির প্রতিনিধি, সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি খরচ, ম্যানেজিং কমিটির অন্যান্য সদস্যকে ম্যানেজ ও মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদফতর ঢাকায় মোটা অংকের টাকা প্রদান করা বাবদ প্রায় ৬-৭ লাখ টাকা খরচ হয়। নিয়োগের টাকা নিয়ে তিনি স্থানীয় গোরস্তানের জন্য জমি কিনবেন বলেও জানান। তখন চাকরি প্রার্থীর অভিভাবক গরিব মানুষ উল্লেখ করে আরও কমানোর অনুরোধ করেন।

কিন্তু মাদ্রাসার সভাপতি ও সুপার একেকটি পদের জন্য ১০ লাখ টাকা করে নির্ধারণ করে দু’জন আবেদনকারীর কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নিয়েও তাদের এখন চাকরি না দিয়ে সভাপতির এক আত্মীয়কে নিয়োগ দেওয়ার অপচেষ্টা করছেন বলেও আবেদনকারীদের অভিযোগ।

চাকরি প্রত্যাশী ফারহানা খাতুনের স্বামী মুকুল হোসেন জানান, ‘আমার স্ত্রীর জন্য আমি ও আমার এক ভাই মাদ্রাসার সভাপতি নজরুল মল্লিকের কাছে গিয়েছিলাম। যে অডিও রেকর্ড শোনা যাচ্ছে সেখানে আমাদের সঙ্গে তার কথা হয়। তাকে অনুরোধ করলেও তিনি ৯ লাখের কম দিলে নিয়োগ হবে না বলে জানান। এমন অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়টি খতিয়ে দেখা দরকার।’

চাকরি প্রত্যাশীদের আরেকজন রতনপুর গ্রামের রজনী খাতুনের স্বামী আব্দুর রহিম জানান, ‘আমি ছোট একটা ব্যবসা করি। ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে স্ত্রীকে ওই মাদ্রাসায় আয়া পদে চাকরি নিয়ে দিতে সভাপতি ও সুপারের সাথে কথা বলি। তারা আশ্বাস দিয়ে আমার কাছ থেকে ইতোমধ্যে দুই লাখ টাকাও নিয়েছেন। ব্যবসার পুঁজি দিয়ে, জমি ও গরু বিক্রি করে তাদের টাকা দিয়েছি। আমার মতো আরও কয়েকজনের কাছ থেকেও তারা টাকা নিয়েছে। এখন শুনছি অন্যজনকে নিয়োগ দেবে।’

মাদ্রাসার পুরনো ভবন

মুলগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি রাশিদুল ইসলাম বকুল বলেন, ‘নিয়োগের নামে এমন বাণিজ্য আসলে দুঃখজনক। বিষয়টি তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। আর মাদ্রাসার সভাপতি যেহেতু আওয়ামী লীগের এক নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি, সে কারণে দলীয় সভা ডেকে সবার মতামতের ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে দলীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

অভিযোগের বিষয়ে মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সভাপতি আলহাজ নজরুল ইসলাম মল্লিকের সঙ্গে মোবাইলে বারবার ফোন দিলেও তিনি তা রিসিভ করেননি।

মাদ্রাসার সুপার মাওলানা আব্দুল লতিফ বলেন, ‘আমি কিছুই জানি না। এ বিষয়ে আমার কোনও বক্তব্য নাই।’ এর বেশি কিছু বলতে রাজি হননি তিনি।

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মগরেব আলী বলেন, ‘ওই মাদ্রাসার নিয়োগের বিষয়ে শিক্ষা অফিসের কোনও সম্পৃক্ততা নেই। এখনও নিয়োগ প্রক্রিয়া চলমান। ডিজি অফিস কাকে নিয়োগ দেবে সেটা তাদের বিষয়। তবে যদি শিক্ষা অফিসকে নিয়োগের বিষয়ে দেখার নির্দেশ দেওয়া হয় তাহলে স্বচ্ছতার সঙ্গে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। অডিও রেকর্ড ফাঁসের বিষয়টি তিনি জেনেছেন বলে জানান। 

/আরআইজে/টিএন/এমওএফ/

লাইভ

টপ