আইসোলেশনে করোনা রোগী ৬ জন, তিন মাসে হাসপাতালের খরচ ৮ লাখ টাকা!

Send
এস এম রেজাউল করিম, ঝালকাঠি
প্রকাশিত : ২২:১৪, আগস্ট ১৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:৩৭, আগস্ট ১৩, ২০২০

সদর হাসপাতাল, ঝালকাঠি করোনাভাইরাসের মহামারির সময়ে সরকারের দেওয়া প্রণোদনার টাকা হরিলুট হয়েছে ঝালকাঠি সদর হাসপাতালে—এমন অভিযোগ উঠেছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে এ হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগী ছিল মাত্র ৬ জন, তবু মার্চ থেকে করোনা প্রতিরোধ প্রস্তুতি ও এই রোগীদের চিকিৎসায় জুন পর্যন্ত ৩ মাসে খরচ দেখানো হয়েছে ৮ লাখ টাকা। এরমধ্যে ৫ লাখ টাকা দেখানো হয় জুনে রোগীদের খাবার খরচ ছাড়াও চিকিৎসক ও নার্সদের হোটেল ভাড়া, খাবার বিল ও যাতায়াত ভাতা খাতে। অথচ এ হাসপাতালের চিকিৎসকরা যাতায়াত করেছেন হাসপাতালের সরকারি অ্যাম্বুলেন্সে। কেউ হোটেলে অবস্থান না করলেও দেখানো হয়েছে হোটেল ভাড়া ও খাবারের বিল। নার্সরা অভিযোগ করেছেন, তাদের কাউকে দুই হাজার, কাউকে ৪ হাজার টাকা ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর চিকিৎসকদের মধ্যে মাস্ক নিয়ে অভিযোগ থাকলেও বাকি ৩ লাখ টাকার মাস্ক ও জীবাণুনাশক কেনার বিল দেখিয়ে টাকা উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন, প্রকৃত খরচ অনেক কম হলেও দুর্নীতি করতেই এমন বিশাল বিল দেখিয়েছেন তদানীন্তন জেলা সিভিল সার্জন শ্যামল কৃষ্ণ হালদার। এ হাসপাতাল থেকেই অবসরকালীন প্রস্তুতি ছুটিতে গেছেন তিনি।

এদিকে সম্প্রতি চিকিৎসা ব্যবস্থা ও স্বাস্থ্য বিভাগের অনিয়মের কথা লিখে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ায় দপদপিয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সহকারী সার্জন মো. টিপু সুলতানকে ১৭ জুলাই শোকজ করা হয়েছিল। বর্তমানে তিনি নলছিটি উপজেলায় কর্মরত রয়েছেন। তিনি করোনা রোগীদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে নিজে ১ জুলাই আক্রান্ত হয়েছিলেন।

তদানীন্তন সিভিল সার্জন শ্যামল কৃষ্ণ হাওলাদার

সহকারী সার্জন মো. টিপু সুলতান বলেন, এন-৯৫ মাস্ক ছিল সরকারের বাজেটে, কিন্তু চিকিৎসকদের দেওয়া হয়েছে সার্জিক্যাল মাস্ক। কোভিড-১৯ চলাকালে চিকিৎসকদের থাকার জন্য হোটেল ভাড়া, খাবার ও যাতায়াত খরচ বরাদ্দ থাকলেও কোনও কিছুই তারা পাননি। এমন সুবিধা কোনও চিকিৎসককে দেওয়া হয়নি। 

হাসপাতালের একটি সূত্র অভিযোগ করেছে, গত মার্চ এপ্রিল মাসে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার শুরুর সময়ে ঝালকাঠি সদর হাসপাতালে করোনা পজিটিভ রোগীদের চিকিৎসা না দিয়ে বরিশালে রেফার করা হয়েছে। এ নিয়ে রোগীদের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ জানালেও সিভিল সার্জন কোনও উদ্যোগ নেননি। আসলে তখন কোনও রোগীকে এই হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা দেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী ছিল না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। যদিও গণমাধ্যমকর্মীদের সিভিল সার্জন শ্যামল কৃষ্ণ বলতেন, আমাদের আইসোলেশন ওয়ার্ড প্রস্তুত রাখা হয়েছে। তবে অনেকেই বাসায় কোয়ারেন্টিনে থাকতে চাওয়ায় তাদের ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয় না।

সূত্রটির দাবি, কিন্তু, গত জুন মাসে যখন করোনার বরাদ্দ টাকা ফেরত পাঠানোর নির্দেশনা আসে তখনই লুটপাটের প্রক্রিয়া শুরু করতে আইসোলেশন ওয়ার্ডটি চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়। তাই মে-জুন মাসে পজিটিভ রোগী ভর্তি করে বরাদ্দের ৮ লাখ টাকা ভুয়া বিল ভাউচারের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সরকার ফেরত পাঠানোর নির্দেশ না দিলে বরাদ্দের পুরোটাই লুটপাট হতো বলে এমন অভিযোগ করছেন খোদ ঝালকাঠির স্বাস্থ্য বিভাগে কর্মরতরা।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসা খরচ বাবদ গত অর্থবছরে বরাদ্দ পাওয়া গেছে ২০ লাখ টাকা। চলতি বছরের মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত বরাদ্দ থেকে খরচ দেখানো হয়েছে ৮ লাখ টাকা। অবশিষ্ট ১২ লাখ টাকা ফেরত পাঠানো হয়েছে।

আইসোলেশন ওয়ার্ড, ঝালকাঠি সদর হাসপাতাল

অনুসন্ধানে জানা যায়, উল্লেখিত সময়ে কর্তব্যরত থাকা অবস্থায় চিকিৎসকসহ ২১ জনের খাবার খরচ দেখানো হয়েছে জনপ্রতি ৫০০ টাকা। এই হারে মোট ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়। ওই সময় কর্মরত নার্সদের অভিযোগ, তাদের জন্য খাবার বিলের বরাদ্দ টাকা দেওয়া হয়নি।

এ বিষয়ে নার্স শাহারুন্নেসা, রেখা রানী, শিপ্রা মালোসহ ৬ জন জানান, প্রধান সহকারী মতিন আমাদের জনপ্রতি ২ হাজার টাকা এবং রিনা মিস্ত্রি, তাছলিমাসহ আরও ৬ জনকে ৪ হাজার টাকা করে ধরিয়ে দেন। এ টাকা কীসের জানতে চাইলে কোনও স্বাক্ষর ছাড়াই মতিন আমাদের টাকা দিয়ে বলেন, করোনা ডিউটির জন্য মানবিক কারণে এটা দেওয়া হয়েছে।

সূত্রমতে, মে-জুন দুই মাসে চিকিৎসকদের ঝালকাঠি থেকে বরিশালে পরিবহন খরচ বাবদ ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা ভাউচার দিয়ে উত্তোলন করা হয়েছে। যদিও ওই সূত্রটির দাবি, হাসপাতালের সরকারি অ্যাম্বুলেন্সে করেই চিকিৎসকদের আনা নেওয়া করা হয়েছে।

গত অর্থবছরে করোনাকালীন যাতায়াত বাবদ কত টাকা বিল পেয়েছেন জানতে চাইলে বরিশাল থেকে ঝালকাঠিতে আসা-যাওয়া করা চিকিৎসক আবুয়াল হাসান বলেন, মনে নেই। কীভাবে বরিশাল থেকে আসা যাওয়া করেছেন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রাইভেট গাড়ি ভাড়া করে।

অথচ ঝালকাঠি সদর হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স চালক আনোয়ার হোসেন ও মহসীন জানান, বরিশালে থাকা ঝালকাঠির কর্মরত চিকিৎসকদের সরকারি অ্যাম্বুলেন্সে আনা-নেওয়া করেছি আমরা, কিন্তু কোনও পারিশ্রমিক পাইনি।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, উল্লেখিত খাত ছাড়াও ৬ রোগীর চিকিৎসাকালীন বিল ভাউচারের মাধ্যমে শুধু আনুষঙ্গিক খাতেই খরচ দেখানো হয়েছে প্রায় ৩ লাখ টাকা। জীবাণুনাশক বিল উত্তোলন করা হয়েছে ৩৬ হাজার টাকা। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন খাতে ৬৬ হাজার টাকা খরচ দেখানো হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে হাসপাতালের প্রধান সহকারী আব্দুল মতিন ( হেড ক্লার্ক) বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, গত অর্থবছরে বরাদ্দ করা ২০ লাখ টাকা থেকে ৮ লাখ টাকা সঠিকভাবেই খরচ হয়েছে। বাকি টাকা ফেরত পাঠানো হয়েছে। খরচের খাতে কোনও অনিয়ম বা ত্রুটি নেই। খাবার খরচ নিয়ে নার্সদের অভিযোগ সঠিক নয়।

তিনি স্বীকার করেন, চিকিৎসকদের ভাড়া গাড়িতে বরিশাল-ঝালকাঠি আসা যাওয়ার ভাউচার দাখিলের মাধ্যমে খরচের টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে সাবেক সিভিল সার্জন শ্যামল কৃষ্ণ হালদার বলেন, আমি প্রধান সহকারীর সঙ্গে কথা না বলে এই খরচ করা বরাদ্দের বিষয়ে কিছুই বলতে পারবো না। তিনি হাসপাতালের প্রধান সহকারী আব্দুল মতিনের সঙ্গে এ ব্যাপারে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। 

এ বিষয়ে ঝালকাঠির নবাগত সিভিল সার্জন রতন কুমার ঢালী সাংবাদিকদের বলেন, আমাকে বলা হয়েছে গত অর্থবছরে ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ এসেছিল। এরমধ্যে ৭ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। তার মধ্যে ৩ লাখ টাকার নাকি মাস্ক, জীবাণুনাশক ইত্যাদি কেনা হয়েছে। বাকি ৪ লাখ টাকা বিভিন্ন খাতে খরচ দেখানো হয়েছে।

হাসপাতালের প্রধান সহকারী আব্দুল মতিনের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে নতুন সিভিল সার্জনের দেওয়া হিসাবেও গরমিল এক লাখ টাকার!

/টিএন/এমওএফ/

লাইভ

টপ