যেসব কারণে ভারত থেকে আসা চাল কিনছেন না পাইকাররা

হালিম আল রাজী, হিলি
২২ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ২২:৪৪আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ১৩:৪২

হিলি বন্দরে খালাস করা হচ্ছে আমদানি করা চাল ভারত সরকার ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত আড়াই মাস বাংলাদেশে কোনও চাল রফতানি করবে না, এমন গুজবের কারণে গত কয়েকদিন ধরে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে হিলিতে চালের মোকামে আসা ক্রেতারা চাহিদার চেয়েও বেশি চাল কিনে নিয়েছেন। তার ওপর সম্প্রতি চালের দামের ঊর্ধ্বগতি রুখতে দেশের বিভিন্ন চালকল ও মিলগুলোতে মজুদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযানে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। ফলে অনেকটা আতঙ্কগ্রস্ত হয়েও চাল কেনা কমিয়ে দিয়েছেন তারা। হিলি স্থলবন্দরের আমদানিকারক ও চাল কিনতে আসা পাইকাররা বাংলা ট্রিবিউনকে এই তথ্য জানিয়েছেন।

এদিকে ক্রেতা না থাকার কারণে একদিনের ব্যবধানে আবারও আমদানিকৃত ভারতীয় স্বর্ণা ও রত্না জাতের চাল প্রকারভেদে কেজিতে দুই থেকে তিন টাকা করে কমেছে। পাঁচ দিনের ব্যবধানে প্রকারভেদে চালের দাম প্রতি  কেজিতে  কমেছে ছয় থেকে আট টাকা করে। এদিকে বাংলাদেশে চালের দাম কমতির দিকে থাকায়, ভারতীয় রফতানিকারকরাও চালের দাম ৫০ থেকে ৫৫ ডলার করে কমিয়ে দিয়েছে।

ভারত বাংলাদেশে চাল রফতানি করবে না, এ সংক্রান্ত একটি ভুয়া চিঠির খবর ছড়িয়ে পড়ে গত ১২ সেপ্টেম্বর। এ কারণে মুহূর্তের মধ্যেই বিভিন্ন স্থানের পাইকারদের মধ্যে চাল সংগ্রহের প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। একারণে সেসময় চালের দাম সাত থেকে আট টাকা পর্যন্ত বেড়ে যায়। যে চালের দাম প্রতি কেজি  ৩৯ টাকা থেকে ৪২ টাকায় ওঠানামা করতো, কয়েকদিনের ব্যবধানে সেই চালের দাম প্রতি কেজি ৪৭/৪৮ টাকা পর্যন্ত উঠে যায়।

কুড়িগ্রাম ও পঞ্চগড় থেকে হিলি স্থলবন্দরে চাল কিনতে আসা পাইকারী ক্রেতা সাইফুল ইসলাম ও সিরাজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ভারত চাল রফতানি করবে না এমন খবরে মুহূর্তের মধ্যে চালের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়। আমরাও যেখানে  এক ট্রাক চাল কিনতাম সেখানে তিন থেকে চার ট্রাক কিনে নিয়ে গেছি। এলাকায় গিয়ে বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করে দিয়েছি। ব্যাপক চাহিদার কথা মাথায় রেখে আমরা বন্দর থেকে চাহিদার তুলনায় বেশি পরিমাণে চাল কিনেছি। তবে সম্প্রতি সরকার মিলগুলোতে চালের মজুদ কমাতে অভিযান পরিচালনা করে। এ কারণে আমরা যাদের কাছে বন্দর থেকে চাল কিনে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করতাম, তারাও আর চাল নিচ্ছেন না। এরকম অবস্থা দেশের বিভিন্ন স্থানেই চলছে। যার কারণে আগে যেসব চাল কিনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, সেসব চালই বিক্রি করা হচ্ছে। এছাড়া চালের দাম কমে যাওয়ার কারণে আমরাও খানিকটা সতর্কাবস্থায় আছি। চাহিদার ওপর নির্ভর করে এক-দুই গাড়ি করে চাল কিনছি।’

হিলি স্থলবন্দরের চাল আমদানিকারক ললিত কেশেরা, হারুন উর রশিদ ও মামুনুর রশীদ বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ভারত চাল রফতানি করবে না-এই খবর ছড়িয়ে পড়ার ফলে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অনেকেই হিলি স্থলবন্দরে চাল সংগ্রহ করতে আসেন। আর এই সুযোগে ভারতীয় রফতানিকারকরাও চালের রফতানি মূল্য বাড়িয়ে দেন। পুরনো যেসব এলসি ছিল সেগুলোর রফতানি বন্ধ করে দেয়। তারা একই এলসির বিপরীতে নতুন করে ডলার বাড়িয়ে দেয় এবং আগের এলসির বিপরীতে বেশি দামে চাল রফতানি করে। এতে করে দেশের বাজারে চালের দাম বাড়তে থাকে। চালের দাম বাড়তে থাকলেও  আমদানি বন্ধ হয়ে যেতে পারে,  এমন খবরের কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানের পাইকাররা চাহিদার তুলনায় বেশি পরিমাণে চাল কিনে নেন। যারা এক ট্রাক চাল কিনতেন তারাও সেসময় চার থেকে পাঁচ ট্রাক করে চাল কিনেছেন। যদিও পরে সেই চিঠি ভুয়া বলে প্রমাণিত হয়। কিন্তু ভারতীয় ব্যবসায়ীদের চালের রফতানিমূল্য বাড়ানোয় দেশে চালের দামে ঊর্ধ্বগতি লেগেই থাকে।

আমদানিকারকরা আরও জানান, সম্প্রতি দেশের বাজারে চালের দামের ঊর্ধ্বগতি রুখতে দেশের বিভিন্ন স্থানে চালের মিলে এবং চালের মজুদের বিরুদ্ধে সরকারের অব্যাহত অভিযানের ফলে যেসব ব্যবসায়ী হিলি স্থলবন্দর থেকে চাল কিনতেন, তারা চাল কেনা বন্ধ করে দিয়েছেন। যারা দুই-এক ট্রাক চাল কিনতেন তারাও প্রশাসনিক অভিযানের কারণে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে চাল কিনছেন না। এর ফলে হিলি স্থলবন্দরে বর্তমানে চালের ক্রেতা নেই বললেই চলে। কয়েক দিন আগে চালের যে পরিমাণ চাহিদা ছিল, এখন তার এক ভাগও নেই। সম্প্রতি নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য ওএমএসের মাধ্যমে সরকার চাল বিতরণ করার কারণেও বাজারে চালের ক্রেতা কমে গেছে।

জানা গেছে, মাত্র একদিনের ব্যবধানে চালের দাম কেজিতে কমেছে দুই থেকে তিন টাকা। বুধবার ভারত থেকে আমদানিকৃত যে স্বর্ণা চাল প্রকারভেদে ৪৪ টাকা থেকে ৪৫ টাকা দরে প্রতি কেজি বিক্রি হয়েছিল, পরদিন  বৃহস্পতিবার সেই  চাল ৪২ টাকা থেকে ৪৩ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। তিন -চারদিন আগে একই জাতের চাল প্রকারভেদে ৪৮-৪৯ টাকা করে বিক্রি হয়েছিল। আর রত্না জাতের চাল বুধবারও ৪৮ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। তবে বৃহস্পতিবার তা বিক্রি হয় ৪৫ টাকা থেকে ৪৬ টাকা কেজি দরে। চারদিন আগে একই জাতের চাল ৫২-৫৩ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছিল। এতে করে পাঁচ দিনের ব্যবধানে চালের দাম প্রকারভেদে কেজি প্রতি কমেছে ছয় থেকে আট টাকা করে।

ব্যবসায়ীরা আরও জানান, বর্তমানে দেশের বাজারে চালের দাম পড়ে যাওয়ার কারণে দেশের কোনও আমদানিকারক চাল আমদানির জন্য নতুন করে আর এলসি খুলছেন না। এর ফলে ভারত থেকে চাল আনার চাহিদা কমে যাওয়ায় ভারতের ব্যবসায়ীরা চালের দাম খানিকটা কমিয়ে দিয়েছেন। আগে প্রতিটন চাল ৫৬০ থেকে ৫৭০ ডলার মূল্যে রফতানি করলেও, বর্তমানে তারা প্রতি টন চালের দাম চাইছেন ৫১০ থেকে ৫১৫ ডলার করে। তবে এখনও বন্দর দিয়ে যে চাল দেশে প্রবেশ করছে, সেগুলোর এলসি আগের বাড়তি দামেই করা ছিল।  যেহেতু দেশের বাজারে চালের দাম পড়ে গেছে, আবার ভারতের বাজারেও চালের দাম কমেছে, সে কারণে অনেক আমদানিকারক আগের বাড়তি মূল্যে করা এলসিগুলো বাতিল করে, ফের নতুন মূল্যে চাল আমদানির জন্য এলসি খুলবেন বলে জানিয়েছেন।

হিলি স্থলবন্দরের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. সোহরাব হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হিলি স্থলবন্দর দিয়ে গড়ে প্রতিদিন ৭০ থেকে ৮০ ট্রাক চাল আমদানি হচ্ছে। যা এখনও অব্যাহত রয়েছে। আর যথাসময়ে  এসব চাল আমদানিকারকরা বন্দর থেকে খালাস করে নিচ্ছেন। এছাড়া দেশের বাজারে চালের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে, চাল খালাসের জন্য গত ১৫ সেপ্টেম্বর (শুক্রবার) সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও  বন্দরের কার্যক্রম খোলা রাখা হয়েছিল। ২২ সেপ্টেম্বর শুক্রবারেও বন্দর খোলা রাখা হবে। চলতি মাসের ৬ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বন্দর দিয়ে ৪৪ হাজার ৮৭৪ টন চাল আমদানি হয়েছে।’

আরও পড়ুন: সোনার বাংলা নির্মাণে ভেদাভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান কাজী নাবিলের

 

/এফএস/ এপিএইচ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
ড্রোন কিনতে ২০০০ বিলিয়ন রুপি ব্যয়ের পরিকল্পনা ভারতের
ড্রোন কিনতে ২০০০ বিলিয়ন রুপি ব্যয়ের পরিকল্পনা ভারতের
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম