X
শনিবার, ১৩ আগস্ট ২০২২
২৯ শ্রাবণ ১৪২৯

দিনাজপুর গণগ্রন্থাগারে পাঠক আছে, জায়গা নেই

বিপুল সরকার সানি, দিনাজপুর
২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১০:০০আপডেট : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১৪:৩৭

৪০ বছরের পুরনো দিনাজপুর গণগ্রন্থাগারে ৪০ হাজার বই রয়েছে। কিন্তু জায়গা ও জনবল সংকটের মধ্যে কোনও রকমে চলছে প্রতিষ্ঠানটি। পাঠক সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় কনফারেন্স কক্ষকে করা হয়েছে পড়ার কক্ষ। পড়ার কক্ষ ব্যবহৃত হচ্ছে স্টোর কক্ষ হিসেবে। এ অবস্থায় পাঠকরা এসে জায়গা না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন প্রতিদিন।

এদিকে, জনসাধারণের পাঠাভ্যাস বৃদ্ধি এবং গ্রন্থাগারের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য সম্প্রসারণমূলক কার্যক্রম হিসেবে রচনা প্রতিযোগিতা, হাতের সুন্দর লেখা প্রতিযোগিতা, পাঠ প্রতিযোগিতা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা করতে হয় পড়াশোনা বন্ধ রেখে।

দিনাজপুর গণগ্রন্থাগারের যাত্রা:

দিনাজপুর গণগ্রন্থাগারের যাত্রা শুরু হয়েছে ১৯৮২ সালের ১ সেপ্টেম্বর। পাঁচ হাজার ৫০ বর্গফুট আয়তনের গ্রন্থাগার ভবনটিতে রয়েছে অফিস কক্ষ, কনফারেন্স কক্ষ ও ৩০টি আসন বিশিষ্ট একটি পড়ার কক্ষ। কিন্তু পাঠক সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় এখন কনফারেন্স কক্ষটিকে পড়ার কক্ষ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এই কক্ষে আসন রাখা হয়েছে ৭০টি। পুরনো কাগজপত্র ও বইপত্র রাখার জন্য পড়ার কক্ষটিকে ব্যবহার করা হচ্ছে স্টোর কক্ষ হিসেবে।

আরও পড়ুন: দুই কর্মীতে চলছে ৪০ বছরের পুরনো গ্রন্থাগার

দিনাজপুর গণগ্রন্থাগারের অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী, গ্রন্থাগারে পদ সংখ্যা সাতটি। এর মধ্যে তিন পদে লোকবল রয়েছেন। সিনিয়র গ্রন্থাগারিকের পদ শূন্য, ক্যাটালগারের পদ শূন্য, বুক সর্টারের পদ শূন্য এবং অফিস সহায়ক কাম নাইটগার্ডের পদ শূন্য। আছেন শুধু সহকারী গ্রন্থাগারিক, গ্রন্থাগারিকের সহকারী ও অফিস সহায়ক কাম নিরাপত্তা প্রহরী।

পাঠক ও বইয়ের সংখ্যা:

এখানে বর্তমানে বইয়ের সংখ্যা ৪০ হাজারের বেশি। ভ্রাম্যমাণ পাঠক ও সদস্য মিলে দুই ধরনের পাঠক এখানে বই পড়তে আসেন। এর মধ্যে ভ্রাম্যমাণ পাঠকের সংখ্যা ২০০-২৫০ জন। সদস্য সংখ্যা ১৬২ জন। তবে করোনার পর থেকেই এখানে পাঠক সমাগমে ভাটা পড়েছে। প্রতিদিন ১০০-১২০ জন পাঠক বই পড়তে আসেন। 

দিনাজপুর সরকারি গণগ্রন্থাগার

গত পাঁচ বছরের হিসাবে, এখানে পাঠকের সংখ্যা বেড়েছে। ২০১৬ সালে পাঠক সংখ্যা ছিল ৮৫ জন, পাশাপাশি প্রতিদিন ভাসমান পাঠক আসতেন ১০০-১৫০ জন। এই গ্রন্থাগারের অধীনে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি জেলার ছয় উপজেলার ৩৮টি স্থানে বই বিতরণের কার্যক্রম চালায়।

এখানে প্রতিবছর ১২০০-১২৫০টি নতুন বই সংযোজন হলেও তা চাহিদা মাফিক নয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। স্থানীয়ভাবে চাহিদামাফিক বই অনেকক্ষেত্রে কিনতে হয়, সেটিও অপ্রতুল। প্রতিবছর অনুদান হিসেবে ৫০ শতাংশ বই এবং ৫০ শতাংশ অর্থ দেওয়া হয়। জেলায় এই সরকারি গণগ্রন্থাগারের পাশাপাশি বেসরকারি পাঠাগার আছে ৭৫টি।

গণগ্রন্থাগারের দায়িত্বশীলদের বক্তব্য:

দিনাজপুর সরকারি গণগ্রন্থাগারের গ্রন্থাগারিকের সহকারী রকিবুল ইসলাম বলেন, এখানে জনবলের সংকট রয়েছে। পাশাপাশি স্থানের সংকট রয়েছে। তবে ভালো দিক হলো দিনে দিনে পাঠক সংখ্যা বাড়ছে। করোনার কারণে পাঠক উপস্থিতি কম হলেও এখন উল্লেখযোগ্য পাঠক বই পড়তে আসেন। তবে আমাদের ভবন সম্প্রসারণ হলে এবং বইয়ের সংখ্যা বাড়ানো হলে আরও পাঠক আসবেন। পাশাপাশি স্থানীয় যেসব বইয়ের চাহিদা বেশি সেসবে গুরুত্ব দিয়ে বইয়ের সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন।

আরও পড়ুন: দুই গ্রন্থাগারে বই ৬৫ হাজার, পাঠক মাত্র ১০৭ জন

দিনাজপুর সরকারি গণগ্রন্থাগারের সহকারী গ্রন্থাগারিক সহিদুল হক বলেন, পাঠক সংখ্যা কমে যাওয়ার একটি কারণ করোনা। আরেকটি কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। জ্ঞানী আলোকিত সমাজ গঠন এবং সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হলে অবশ্যই বই পড়ার অভ্যাস করতে হবে। শুধুমাত্র জেলায় নয়, প্রতিটি উপজেলায় এমনকি প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে পাঠাগার নির্মাণ করতে হবে। বর্তমানে বড় সমস্যা একটি পড়ার কক্ষের। গ্রন্থাগার ভবনের সম্প্রসারণ হলে এটি সম্ভব। একইসঙ্গে লোকবল বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। কারণ করোনা সংকটের পরেই এখানে পাঠকরা আসতে শুরু করবেন। ওই সময়ে আসন সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা এখন থেকেই নিতে হবে।

পাঠক সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় কনফারেন্স কক্ষকে করা হয়েছে পড়ার কক্ষ

তিনি বলেন, গ্রন্থাগারকে মূল্যায়ন ও উন্নয়ন না করার কারণে অনেকেই মাদকের কবলে পড়ছে। নাগরিক শিক্ষিত ও সচেতন না হলে সমাজের শৃঙ্খলা বজায় রাখা সম্ভব নয়। এজন্য বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। এবারে মুজিব শতবর্ষ ও বিজয়ের ৫০ বছর উপলক্ষে জেলার ৫৮টি বেসরকারি পাঠাগারকে দুই লাখ টাকা করে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। যা দিয়ে বইয়ের চারটি সেলফ, ২০০টি বই, দুটি ভালো মানের চেয়ার ও গোলটেবিলসহ আনুষঙ্গিক কেনা হয়েছে। এখন গ্রন্থাগারে পাঠক সংখ্যা বাড়ছে। উন্নয়ন হচ্ছে। আমাদের এখন কারাগারেও পাঠাগার আছে, যাতে আসামিরা ভেঙে না পড়ে। বই পড়ে কিছুটা হলেও জ্ঞানী হয় তারা। প্রতিবছর বেসরকারি গ্রন্থাগারগুলোকে বিভিন্ন রকমের অনুদান দেওয়া হয়। এভাবেই আমাদের গ্রন্থাগারগুলোকে সম্প্রসারিত করতে হবে। সেই সঙ্গে বই পড়ার বিষয়ে আরও উৎসাহিত করতে হবে।

পাঠকের মতামত:

গ্রন্থাগারে বই পড়তে আসা দিনাজপুর সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী মোবাশ্বির হোসেন বলেন, এখানে মাঝেমধ্যে বই পড়তে আসি। অনেক ধরনের বই রয়েছে। এখন তো সিলেবাসের যে পড়া থাকে সেটাই আয়ত্ত করতে সময় চলে যায়। যেটুকু সময় পাই সেই সময়টাতে এখানে এসে বই পড়ি।

শহরের বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম বলেন, বই পড়ার অভ্যাস অনেক দিনের। মাঝেমধ্যে তাই এখানে আসি। তেমন কোনও ধরনের সমস্যা হয় না। বই পড়ে বাসায় চলে যাই।

গ্রন্থাগারে বইয়ের সংখ্যা ৪০ হাজারের বেশি

শিক্ষার্থী সফিকুল ইসলাম বলেন, সাধারণত প্রয়োজন হলেই আসি। অল্প সময় পড়াশোনা করে চলে যাই। তবে সবসময় আসার সময় পাই না।

লেখক ও গবেষকদের মতামত:

দিনাজপুরের লেখক ও গবেষক আজহারুল আজাদ জুয়েল বলেন, গণগ্রন্থাগারে আমরা যাই বিভিন্ন লেখা রেফারেন্স হিসেবে গ্রহণ করতে। এ জন্য স্থানীয় লেখকদের বই কিংবা স্থানীয় সংশ্লিষ্ট বই বেশি রাখা উচিত। ইতিহাসভিত্তিক বই থাকলেও সব লেখকের বই আছে এই কথা বলা যাবে না। এখানে কনফারেন্স কক্ষে পড়াশোনা করতে হয়। এতে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কিছুটা সমস্যা হয়। তবে সেসব অনুষ্ঠানও কিন্তু জ্ঞানের বিষয় থাকে। জেলা শহরে গণগ্রন্থাগারের পাশাপাশি উপজেলা শহরেও গণগ্রন্থাগার থাকলে আরও বেশি শিক্ষার্থী কিংবা মানুষ উপকৃত হতেন। তবে আগের তুলনায় এখন পাঠক কম। অনেক বই পড়ুয়া এখন ইন্টারনেটে ব্যস্ত থাকেন।

আরও পড়ুন: ৩৫ বছর ধরে তালাবদ্ধ বাসাইল গ্রন্থাগার 

দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকতা পেশার পাশাপাশি গবেষণা ও লেখালেখি করছেন বীরগঞ্জ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ ড. মাসুদুল হক। তিনি বলেন, গণগ্রন্থাগারগুলো অনেকটাই লুকায়িত অবস্থায় আছে। প্রচারণা না থাকায় অনেকেই জানেন না গণগ্রন্থাগারের অবস্থান। দায়িত্বশীলরা যদি প্রচারণা না চালান তাহলে গ্রন্থাগারের বিষয়ে মানুষ জানবে না। 

তিনি বলেন, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র যেভাবে বই পড়ার জন্য প্রণোদনা চালু করছে, সেখানে গণগ্রন্থাগারের দায়িত্বরতরা শুধুমাত্র চাকরি করছেন। জ্ঞান বিতরণের জন্য প্রচেষ্টা চালাতে হবে। আবার গ্রন্থাগারে বই থাকলেও ডিসপ্লে করার প্রক্রিয়া নেই। অনেক বই ভেতরে চাপা পড়ে থাকে। পাঠক খুঁজে পান না। এটি একটি সমস্যা। গ্রন্থাগারে ইন্টারনেট থাকা প্রয়োজন। গ্রন্থাগার চালু থাকে সকাল ১০টা থেকে ৫টা পর্যন্ত। অর্থাৎ অফিস সময়। আমাদের পাঠক শিক্ষার্থী, শিক্ষক, চাকরিপ্রত্যাশী এবং চাকরিজীবী। কিন্তু অফিস সময়ে যদি গ্রন্থাগার চলে তাহলে ওই সময়ে তারাও ব্যস্ত থাকেন। ওই সময়ে কেউ গ্রন্থাগারে সময় দিতে পারে না। যদি বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলতো তাহলে তারা বই পড়ার সময় পেতো। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের স্কুল-কলেজ শেষ করে বই পড়তে যেতে হবে, এটি কীভাবে হয়। মানুষ যতই ইন্টারনেটের মাধ্যমে বই পড়ে কিংবা তথ্য গ্রহণ করে। কিন্তু বইটা মানুষের উপকারে আসে। গভীর জায়গায় যেতে হলে বইয়ের সেলফের কাছে মানুষকে যেতে হবে। ইন্টারনেটের সুবিধা এবং সেলফের প্রয়োজনীয়তার গুরুত্বারোপ করলে গ্রন্থাগারের ভূমিকা অনেক। 

/এএম/
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
টিভিতে আজ
টিভিতে আজ
‘বিশ্ব জ্বালানি সংকট ও বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক শুরু
‘বিশ্ব জ্বালানি সংকট ও বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক শুরু
সালমান রুশদির হামলাকারী সম্পর্কে যা জানা গেছে
সালমান রুশদির হামলাকারী সম্পর্কে যা জানা গেছে
১০ টাকা কেজির চাল নিতে গুনতে হচ্ছে ৫০০ টাকা
১০ টাকা কেজির চাল নিতে গুনতে হচ্ছে ৫০০ টাকা
এ বিভাগের সর্বশেষ
১০ টাকা কেজির চাল নিতে গুনতে হচ্ছে ৫০০ টাকা
১০ টাকা কেজির চাল নিতে গুনতে হচ্ছে ৫০০ টাকা
বাড়িতে লাশ রেখে ‘ঘুষের টাকা’ উদ্ধার
বাড়িতে লাশ রেখে ‘ঘুষের টাকা’ উদ্ধার
দুর্ঘটনায় গৃহবধূ নিহত, ট্রাকে আগুন দিয়ে চালককে গণপিটুনি
দুর্ঘটনায় গৃহবধূ নিহত, ট্রাকে আগুন দিয়ে চালককে গণপিটুনি
পরিত্যক্ত প্লাস্টিক দিয়ে মিলেছে গাছের চারা
পরিত্যক্ত প্লাস্টিক দিয়ে মিলেছে গাছের চারা
যুক্তরাষ্ট্রে পরিচয়, দিনাজপুরে এসে বিয়ে
যুক্তরাষ্ট্রে পরিচয়, দিনাজপুরে এসে বিয়ে