X
সোমবার, ০৩ অক্টোবর ২০২২
১৭ আশ্বিন ১৪২৯

দুই কর্মীতে চলছে ৪০ বছরের পুরনো গ্রন্থাগার

আবদুল্লাহ আল মারুফ, কুমিল্লা 
১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০৯:৫৯আপডেট : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১৬:৩৩

৪০ বছরে পা দিয়েছে কুমিল্লার সরকারি গণগ্রন্থাগার। গ্রন্থাগারের মানোন্নয়নের সঙ্গে বেড়েছে পাঠক সংখ্যা। কিন্তু জনবল সংকটে সময়মতো সব সেবা মেলে না। গ্রন্থাগারটিতে ৯ জনের স্থলে মাত্র দু’জন কাজ করেন। তারাই কম্পিউটার অপারেটরের কাজ করেন। তারাই খুলছেন দরজা-জানালা। আবার তারাই পাঠকদের বই খুঁজে দেন। নিজেদের কাজের সুবিধার জন্য একজন অস্থায়ী অফিস সহায়ক নিলেও তার পক্ষে বাকি ছয় জনের কাজ করা সম্ভব হয় না। 

পরিবর্তনের ছোঁয়া ও পাঠক সংখ্যা:
২০০৯ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত দিনে ২০ জন পাঠকও আসতো না। নারী পাঠকের কথা ভাবাই যেতো না। পরিচিতির অভাবে অনেকটা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়েছিল। ২০১৫ সালে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে গ্রন্থাগারের মানোন্নয়নে কাজ শুরু হয়। সেই সঙ্গে শুরু হয় প্রচার-প্রচারণা। বাড়ানো হয় বইয়ের সংখ্যা। বাড়ানো হয় পাঠকদের আসন সংখ্যাও। পাঠকদের বই, ব্যাগ, খাবার রাখার জন্য তৈরি করা হয় প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র। এরপরই গ্রন্থাগারটি পায় নতুন রূপ। দিন বদলের সঙ্গে বাড়তে থাকে পাঠক সংখ্যা। বর্তমানে গ্রন্থাগারে ১৫০ জনের বসার জায়গা আছে। ২২টি আসন নারী পাঠকদের জন্য সংরক্ষিত। এখন প্রতিদিন তিন শতাধিক পাঠক আসেন। এর মধ্যে নারী পাঠকও রয়েছেন ১০ এর অধিক।
 
গ্রন্থাগারে বই সংখ্যা:
বর্তমানে গ্রন্থাগারে ৪৬ হাজারের বেশি বই আছে। এর মধ্যে বাংলা ভাষার বই আছে ৪০ হাজার ৮৪৭টি। আরবি ভাষার বই আছে ২০০টি। ইংরেজি ভাষার বই পাঁচ হাজার ৫৯৪টি। অন্যান্য ভাষার বই আছে ৪৪টি। 

বইয়ের জন্য রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন কর্নার: 
জবস কর্নারে আছে প্রায় ২০০টি বই, ইতিহাস কর্নারে আছে নয় হাজার ৫০০ বই, নজরুল কর্নারে আছে এক হাজার ১০০টি, রবীন্দ্র কর্নারে আছে এক হাজার ২০০টি, বঙ্গবন্ধু কর্নারে আছে দুই হাজার ২০০টি বই। মুক্তিযুদ্ধ কর্নারে আছে এক হাজার ৬০০টি বই। এছাড়া ধর্মীয়, আন্তর্জাতিক, ব্যক্তি সম্পর্কিত, আইন সম্পর্কিত, কুমিল্লা জেলা সম্পর্কিতসহ অন্যান্য বই আছে ২২ হাজারের বেশি। 

পাঠকের চাহিদা:
এখানকার বেশিরভাগ পাঠক তরুণ। সবাই চাকরিপ্রত্যাশী। যে কারণে সবচেয়ে বেশি পাঠ হয় জবস কর্নারের বই। এছাড়া ইতিহাস কর্নার, নজরুল কর্নার, রবীন্দ্র কর্নার, ধর্মীয় কর্নার, বঙ্গবন্ধু কর্নার, মুক্তিযুদ্ধ কর্নার ও আন্তর্জাতিক কর্নারের বইয়ের পাঠক চাহিদা ভালো।

 সদস্য হওয়ার প্রক্রিয়া:
গণগ্রন্থাগারের সাধারণ পাঠক হতে সদস্য পদের প্রয়োজন নেই। কিন্তু গণগ্রন্থাগারের বই বাসা-বাড়িতে নিয়ে পড়তে চাইলে সদস্য হতে হবে। প্রথম দিকে সদস্য হওয়ার নিয়ম না থাকলেও বর্তমানে সদস্যের বাইরে কাউকে বাড়িতে বই নিতে দেওয়া হয় না। সদস্য হতে পূরণ করতে হয় একটি সদস্য ফরম। এরপর তিনটি শ্রেণিতে পাঠককে ভাগ করে জামানত নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথম শ্রেণিতে শিশুরা, দ্বিতীয় শ্রেণিতে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী এবং তৃতীয় শ্রেণিতে সাধারণ পাঠক। শিশুদের জন্মসনদ ও বইয়ের মূল্যমান অনুযায়ী ২০০ টাকা জামানত জমা রাখতে হয়। স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ৩০০ টাকা জামানত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচয়পত্র ও জন্মসনদ বা জাতীয় পরিচয়পত্র জমা দিতে হয়। সাধারণ পাঠকের জন্য ৫০০ টাকা জামানত, জন্মসনদ বা জাতীয় পরিচয়পত্র জমা দিতে হয়। সদস্য হলেই কেবল নিয়ম মেনে বই বাড়িতে নেওয়া যায়। এছাড়া কেউ বই নিতে পারেন না। যদি কেউ সদস্য পদ বাতিল করতে চান তাহলে বই ফেরত দিয়ে জামানতের টাকা নিতে পারবেন। বর্তমানে সদস্য সংখ্যা ১৭০ জন। 

দুর্লভ সংগ্রহ:
গণগ্রন্থাগারে সংরক্ষিত আছে ১৯৯০ সাল থেকে দৈনিক  যুগান্তর, ইত্তেফাক ও সংবাদসহ একাধিক পত্রিকার পুরনো সংখ্যা। যা স্থানীয় ও দূরদূরান্তের পাঠকদের এই পাঠাগারে টেনে আনে। 

পাঠক বৃদ্ধিতে উদ্যোগ:
পাঠক বৃদ্ধিতে গণগ্রন্থাগারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন স্কুল-কলেজের জাতীয় দিবসে আয়োজন করা হয় সেমিনার ও অস্থায়ী বুক স্টল। এতে গ্রন্থাগারের প্রচার হয়। আয়োজন করা হয় মাসিক, ত্রৈমাসিক ও বার্ষিক বিভিন্ন প্রতিযোগিতা। ফলে এটি নিয়ে পাঠক সমাজে আলোচনা সৃষ্টি হয়। গ্রুপ স্টাডির জন্য পাঠাগারের সামনে রয়েছে চার আসন বিশিষ্ট একটি বসার স্থান।

শিশু শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করতে ২০১৯ সালে শুরু করা হয় টয় ব্রিকস। এছাড়া রচনা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। নারী পাঠকদের জন্য রয়েছে নামাজের ব্যবস্থা। দুপুরে খাবার খাওয়ার জন্য আছে আলাদা কর্নার। রয়েছে দৈনিক ও স্থানীয় পত্রিকা পড়ার সুযোগ। গণগ্রন্থাগারের হেল্প লাইন নম্বরে কল দিলেই বেজে উঠে একটি ওয়েলকামটোন। যেখানে গণগ্রন্থাগারের সেবাসমূহ বর্ণনা করা হয়। এতে ভোগান্তি ছাড়াই সেবা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পান পাঠকরা। 

যেসব অসুবিধা:
১৯৮২ সালে প্রতিষ্ঠার পর কোনও বছর দুই আবার কোনও বছর তিন জন জনবলের বেশি এই গ্রন্থাগারে ছিল না। যে কারণে শুরু থেকেই রয়েছে সংকট। তবে এর বাইরেও রয়েছে নানা সংকট। নেই পর্যাপ্ত আসন। এতে পাঠকদের এসে ফিরে যেতে হয়। আলোর স্বল্পতায় অনেক পাঠক এসে ফিরে যান। এত পাঠকের জন্য দুটি মাত্র টয়লেট থাকায় সমস্যায় পড়তে হয়। নেই পুরুষ পাঠকদের নামাজের স্থান। যার কারণে দূরের একটি মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ে আবার ফিরে এসে পড়তে বসতে অনেকেই বিরক্তবোধ করেন এবং মনোযোগ হারিয়ে ফেলেন। খাবার খাওয়ার একটি কর্নার থাকলেও এটি সম্পূর্ণ অস্থায়ী ও খোলামেলা। 

পাঠকের মতামত:
গ্রন্থাগারের নিয়মিত পাঠক আবদুল কাদের বলেন, আমি সবসময় এখানে আসি। নিরিবিলি পরিবেশ, তাই ভালোভাবে পড়াশোনা করা যায়। এখানকার বেশিরভাগ পাঠক চাকরিপ্রত্যাশী। তারা এখানে চাকরির নিয়োগ পরীক্ষার পড়াশোনা করেন। তবে এখানে আমাদের বই খুঁজে দেওয়ার লোক নেই। তাই বই খুঁজতে অনেক সময় লাগে। এছাড়া নেই কোনও গার্ড। অনেক সময় আমাদের এসে দরজা খুলতে হয়। মাত্র দুই জন লোককে দেখি সারাক্ষণ কাজ করেন। জনবল সংকট দূর হলে সুবিধা হতো।

 দায়িত্বশীলদের বক্তব্য:
গ্রন্থাগারের ক্যাটালগার মো. ফারুক মিয়া জানিয়েছেন, সপ্তাহে শনিবার থেকে বুধবার সরকারি নিয়মানুযায়ী সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকে গণগ্রন্থাগার। লোকবল সংকটের কারণে দিনে যে পরিমাণ পাঠকের চাপ থাকে তা সামলাতে একরকম হিমশিম খেতে হয়। লোকবল ছাড়া আমরা একরকম বেসামাল হয়ে যাই। সব কাজ আমাদেরই করতে হয়। 

কুমিল্লা সরকারি গণগ্রন্থাগারের সহকারী গ্রন্থাগারিক মো. নাফিস সাদিক শিশির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, কুমিল্লার মানুষ বই প্রেমিক। প্রথম দিকে পাঠক কম ছিল। বর্তমানে পাঠকের স্রোত। এখানে বেশিরভাগ পাঠক তরুণ। তারা বেশিরভাগই চাকরির পড়াশোনা করতে আসেন। এই ধারাটা অব্যাহত রাখতে চাই। আমাদের পরিকল্পনা আছে বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন করবো, মানুষ যেন গ্রন্থাগার সম্পর্কে জানতে পারেন। তবে আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা জনবল সংকট। এত বড় গ্রন্থাগারে নয় জনের কাজ আমাদের দুই জনকে করতে হয়। যদিও একজন অস্থায়ী অফিস সহায়ক এনেছি। কিন্তু তিনি একা আমাদের সহযোগিতা করার পর ৩০০ পাঠককে সহায়তা করা হয়ে ওঠে না। এটা আমাদের স্বীকার করতেই হবে, আমরা পাঠকদের সর্বোচ্চ সহযোগিতা করতে পারছি না।

তিনি আরও বলেন, গ্রন্থাগার সম্প্রসারণ করা হবে। তখন গবেষণার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। আমরা জানতে পেরেছি দ্রুত এই কাজ শুরু হবে। সম্প্রসারণ কাজ শুরু হলে আমাদের সব সংকট কেটে যাবে। 

কুমিল্লার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামরুল হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, পাঠাগারের উন্নয়ন ও পাঠক বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এগুলো বাস্তবায়নের কাজ চলছে।

আরও পড়ুন:

ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে যশোর ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরি

রংপুর পাবলিক লাইব্রেরি ভবন পরিত্যক্ত, অধিকাংশ অংশ দখল

বগুড়ার উডবার্ণ সরকারি গণগ্রন্থাগারে লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া  

 

/এএম/টিটি/
টাইমলাইন: কেমন আছে গ্রন্থাগারগুলো
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১২:০০
১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০৯:৫৯
দুই কর্মীতে চলছে ৪০ বছরের পুরনো গ্রন্থাগার
০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১২:৩৮
সম্পর্কিত
৫ বছর পর চালু হলো নবীনগরের গণগ্রন্থাগার
৫ বছর পর চালু হলো নবীনগরের গণগ্রন্থাগার
আলো ছড়াচ্ছে সেলিম আল দীন পাঠাগার
আলো ছড়াচ্ছে সেলিম আল দীন পাঠাগার
সৈকতে পর্যটকদের নতুন বন্ধু ‘বিচ লাইব্রেরি’
সৈকতে পর্যটকদের নতুন বন্ধু ‘বিচ লাইব্রেরি’
প্রত্যন্ত অঞ্চলে সাড়া ফেলেছে ‘সেতুবন্ধন পাঠাগার’
প্রত্যন্ত অঞ্চলে সাড়া ফেলেছে ‘সেতুবন্ধন পাঠাগার’
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
রাতে ভক্তদের ভিড় পূজামণ্ডপে
রাতে ভক্তদের ভিড় পূজামণ্ডপে
৭ ম্যাচের সিরিজ ইংল্যান্ডের
৭ ম্যাচের সিরিজ ইংল্যান্ডের
ঘটনাবহুল ম্যাচ জিতে সিরিজ ভারতের
ঘটনাবহুল ম্যাচ জিতে সিরিজ ভারতের
জমিদারপুত্র থেকে সংগীত সাধক
বারীণ মজুমদারের প্রয়াণদিনজমিদারপুত্র থেকে সংগীত সাধক
এ বিভাগের সর্বশেষ
৫ বছর পর চালু হলো নবীনগরের গণগ্রন্থাগার
৫ বছর পর চালু হলো নবীনগরের গণগ্রন্থাগার
আলো ছড়াচ্ছে সেলিম আল দীন পাঠাগার
আলো ছড়াচ্ছে সেলিম আল দীন পাঠাগার
সৈকতে পর্যটকদের নতুন বন্ধু ‘বিচ লাইব্রেরি’
সৈকতে পর্যটকদের নতুন বন্ধু ‘বিচ লাইব্রেরি’
প্রত্যন্ত অঞ্চলে সাড়া ফেলেছে ‘সেতুবন্ধন পাঠাগার’
প্রত্যন্ত অঞ্চলে সাড়া ফেলেছে ‘সেতুবন্ধন পাঠাগার’
স্মার্টফোনে ব্যস্ত পাঠক, একের পর এক বন্ধ হচ্ছে গ্রন্থাগার
স্মার্টফোনে ব্যস্ত পাঠক, একের পর এক বন্ধ হচ্ছে গ্রন্থাগার