X
সোমবার, ০৪ জুলাই ২০২২
১৯ আষাঢ় ১৪২৯

বিবিজান এখন কোথায় যাবেন?

আপডেট : ২৯ এপ্রিল ২০২২, ০৯:৪৭

‌‘সরকার থাকি ঘর আইসপার নাগচে, তোমরা ঘর পাইবেন, এই জায়গাটা খালি করি দ্যাও—তহশিলদার আর ইউএনও এই কথা কয়া মোর ঘর ভাঙি নিয়া মোর জায়গাত ঘর করি আর একজনক দিছে। মুই এলা থাকিম কোটেই?’ 

ডুকরে কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বলছিলেন উপহারের ঘর না পাওয়া সত্তরোর্ধ্ব বিবিজান। মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে তিনি এখন যেন নিজ ভূমে পরবাসী।

বিবিজানের বাড়ি কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার পান্ডুল ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের আপুয়ারখাতা গ্রামে। ১৯৯৪ সালে তৎকালীন কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক কর্তৃক ২২ শতক জমি বন্দোবস্ত নিয়ে দুই মেয়েকে নিয়ে বসবাস করছিলেন বিবিজান। কিন্তু সম্প্রতি তার ঘর ভেঙে ওই জমিতে আশ্রয়ণ প্রকল্প-২ এর আওতায় ভূমিহীনদের জন্য ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। 

বন্দোবস্ত বাতিল করার কোনও নোটিশ বিবিজানকে দেওয়া হয়নি। তার দাবি, ঘরটি তাকে দেওয়ার কথা বলে নির্মাণ করা হলেও, হস্তান্তর করা হয়েছে ইমান হোসেন নামে আরেক ভূমিহীনকে।

বুধবার (২৭ এপ্রিল) বিবিজানের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, নতুন নির্মিত ঘরের বারান্দায় বসে ডুকরে ডুকরে কাঁদছেন তিনি। তার কান্না শুনে গ্রামের অনেকেই জড়ো হয়েছেন বাড়ির আঙিনায়। সবার উদ্দেশে বিবিজানের প্রশ্ন, ‘মুই এলা কোটাই থাকিম, কোটাই যাইম?’ 

তিনি বলেন, ‘মোরটেই বন্দোবস্তের কাগজ আছে। ইউএনও আর তহশিলদারক বারে বারে কাগজ দেখপার চাইছং, কিন্তু ওমরা (তারা) কাগজ দেখে নাই। মোক ঘর করি দিবার চায়া এলা অন্য মাইনষক ঘর দিছে।’

এ সময় বিবিজানের মেয়ে ছালেহা কাগজ বের করে দেখান। সেসব কাগজে বিবিজানকে দেওয়া সরকারি জমি বন্দোবস্তের সত্যতা পাওয়া যায়। 

দলিল ও অন্যান্য কাগজে দেখা গেছে, ১৯৯৪ সালে কুড়িগ্রামের তৎকালীন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আবদুল হক বিবিজানের নামে ৯৯ বছর মেয়াদে ২২ শতক জমি বন্দোবস্ত দেন। সেই বন্দোবস্তের মেয়াদ শেষ হবে ৫.০১.২০৯৩ সালে। 

ছালেহা বলেন, ‘নতুন ঘরের আশায় মা আগের ঘরের টিন ব্যাচে ঘর বানা মিস্ত্রি আর লেবারক ভাত খাওয়াইছে। এলা শুনি মার নামে ঘর না দিয়া অন্য মানুষক দিছে। এগুলা সউগ ইউএনও আর তহশিলদারের কারসাজি। হামরা ইয়ার বিহিত চাই।’ 

এদিকে এ ঘটনায় আপুয়ার থাতা গ্রামের বাসিন্দারা ক্ষুব্ধ হয়েছেন। বিবিজানের প্রতিবেশীরা বলছেন, তার সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছে। তার জায়গায় অন্য কাউকে ঘর দেওয়া অন্যায়। ওই ঘরে বিবিজান না থাকলে তিনি কোথায় যাবেন?

প্রতিবেশী আছির উদ্দিন (৭০) ও আফজাল হোসেন (৬৫) জানান, তারা অনেক বছর থেকে জেনে আসছেন, বিবিজানের জায়গাটি সরকারি বন্দোবস্তকৃত। এটি বিবিজানের একমাত্র অবলম্বন। বিধবা ও স্বামী পরিত্যাক্তা দুই মেয়েকে নিয়ে বিবিজান ওই জায়গায় বসবাস করছেন। সেখানে সরকার তাকে (বিবিজানকে) ঘর করে দেওয়ার খবরে তারাও খুশি হয়েছিলেন। কিন্তু তারা হঠাৎ জানতে পারলেন, ওই ঘরটি অন্য এক ভূমিহীনকে দেওয়া হয়েছে।

আফজাল হোসেন বলেন, ‘তহশিলদার আর ইউএনও বিবিজানকে ঠকালেন। আমরা এলাকাবাসী এটা মানবার পারতেছি না। আমরা চাই ঘরটি বিবিজান পাউক। না হলে এই বয়সে বেচারি কোথায় যাইবে!’

বিবিজানের জায়গায় নির্মিত ঘরের বরাদ্দ পাওয়া ইমান হোসেন ও তার স্ত্রী আলেয়া বেগম এ ঘটনায় বিব্রত হয়ে পড়েছেন। নিজেরা ভূমিহীন হলেও তারা চান না বিবিজানকে উচ্ছেদ করে তারা ঘরের মালিক হোন। 

আলেয়া বলেন, ‘আমারতো স্বামী আছে, বিবিজানের তাও নাই। বিবিজানের কান্না দেখে আমার স্বামী বলছে, ওই ঘরে কেমন করি যাই!’

ঘর পাওয়ার সনদ দেখিয়ে ইমান হোসেন বলেন, ‘উনি (বিবিজান) খুব কান্নাকাটি করতেছে। আমিতো নিঃস্ব, উনি আরও নিঃস্ব। ওই ঘরে কেমন করি যাই!’

তবে বিবিজানের উদ্বাস্তু হওয়ার দায় নিতে রাজি নন পান্ডল ইউনিয়নের তহশিলদার মোহন্ত কুমার সরকার এবং উলিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিপুল কুমার। তাদের দাবি, বিবিজানের জমিটি সরকারি বন্দোবস্তকৃত নয়।

তহশিলদার মোহন্ত কুমার সরকার বলেন, ‘আমার রেজিস্টারে বন্দোবস্তের কোনও রেকর্ড নেই। তারা আমাকে কোনও কাগজও দেখান নাই। আর ঘরের বরাদ্দ আমি দেই নাই। এটা ইউএনও স্যার ভালো বলতে পারবেন।’

ইউএনও বিপুল কুমার বলেন, ‘বিবিজানের বিষয়টি আমরা এখন জানতে পারছি। কিন্তু তারা আমাকে বন্দোবস্তের কোনও কাগজ দেখাননি। ওই জমিটি সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত। আর আমার ইউপি রেজিস্টারে বিবিজানের নামে বন্দোবস্তের কোনও তথ্যও নেই। আমরা বিষয়টি তদন্ত করে দেখবো।’

জায়গাটি যদি বন্দোবস্তো করা হয়ে থাকে তাহলে ঘরটি বিবিজান পাবেন কিনা—এমন প্রশ্নে ইউএনও বলেন, ‘সেটা তদন্ত করার আগে বলা যাচ্ছে না। আর ওই ঘরটি এখনও কাউকে দেওয়া হয়েছে এমনটাও বলা যাচ্ছে না। কারণ আমরা এখনও ঘরের নাম্বারিং করিনি এবং কাগজপত্র হস্তান্তর করিনি।’

একজনের অনুকূলে বন্দোবস্তকৃত জমিতে অন্য কাউকে ঘর করে দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে কুড়িগ্রাম পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আব্রাহাম লিংকন বলেন, ‘তেমনটা হয়ে থাকলে বন্দোবস্ত বাতিল না করে সেই জমিতে অন্যকে ঘর করে দেওয়া বিধি সম্মত নয়।’

বিবিজান এখন কোথায় যাবেন-জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, ‘আমাকে রেকর্ডটা দেখতে হবে। কাউকে বাস্তুচ্যুত করে অন্যকে বসার পক্ষপাতি আমি নই। যদি এমনটা হয়ে থাকে তাহলে প্রয়োজনে বিবিজানকে ঘর করে দেওয়া হবে। ’

/এসএইচ/
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
ফের হ্যাঙ্গারে সংঘর্ষ, বিমানের দুই উড়োজাহাজে ক্ষতিগ্রস্ত
ফের হ্যাঙ্গারে সংঘর্ষ, বিমানের দুই উড়োজাহাজে ক্ষতিগ্রস্ত
রেষারেষিতে চাপা দেওয়ার ঘটনায় বাসচালক আটক
রেষারেষিতে চাপা দেওয়ার ঘটনায় বাসচালক আটক
নারায়ণগঞ্জে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্নকালে হামলা, দোষীদের আইনের আওতায় আনা হবে
নারায়ণগঞ্জে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্নকালে হামলা, দোষীদের আইনের আওতায় আনা হবে
আগ্রাসী ব্যাটিংয়ে শুরু ওয়েস্ট ইন্ডিজের
আগ্রাসী ব্যাটিংয়ে শুরু ওয়েস্ট ইন্ডিজের
এ বিভাগের সর্বশেষ
বিএসএফের ধাওয়ায় নদীতে পড়ে নিখোঁজ, ৩৬ ঘণ্টা পর ভাই-বোনের লাশ উদ্ধার 
বিএসএফের ধাওয়ায় নদীতে পড়ে নিখোঁজ, ৩৬ ঘণ্টা পর ভাই-বোনের লাশ উদ্ধার 
ভয়াবহ লোডশেডিংয়ে বেচাকেনা নেই শপিং মলে 
ভয়াবহ লোডশেডিংয়ে বেচাকেনা নেই শপিং মলে 
রংপুরের পশুর হাটে ভিড় জমিয়েছেন ঢাকার পাইকাররা
রংপুরের পশুর হাটে ভিড় জমিয়েছেন ঢাকার পাইকাররা
হিলি বন্দর দিয়ে আমদানি-রফতানি বন্ধ থাকবে ৮ দিন 
হিলি বন্দর দিয়ে আমদানি-রফতানি বন্ধ থাকবে ৮ দিন 
মুহূর্তেই বিলীন ৩৫ লাখ টাকার বিদ্যালয় ভবন
মুহূর্তেই বিলীন ৩৫ লাখ টাকার বিদ্যালয় ভবন