X
সোমবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২
১১ আশ্বিন ১৪২৯

ঘরে-বাইরে পানি, খাবারও নেই কুড়িগ্রামের বানভাসি মানুষের 

আরিফুল ইসলাম রিগান, কুড়িগ্রাম
১৮ জুন ২০২২, ০৪:২৮আপডেট : ১৮ জুন ২০২২, ০৪:২৮

‘আইজ ৭-৮ দিন থাইকা চারদিকে পানি। পোলাডার কাজকাম নাই, কামলা চলে না। একবেলা খাইতে পারলেও আরেক বেলা জোটে না। কোনও সাহায্যও পাই নাই। আমগো খুব কষ্টে দিন কাটতাছে।’ এভাবেই নিজের কষ্টের কথাগুলো বলছিলেন কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার যাদুরচর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের চর লালকুড়ার পানিবন্দি বৃদ্ধা আছিয়া খাতুন। গত তিনমাস আগে ঝড়ে আছিয়া খাতুনের বসতবাড়ির ঘর উড়ে যায়। সেই থেকে সরকার থেকে পাওয়া তাবুতে বসবাস করছেন আছিয়া খাতুন। কিন্তু এখন বন্যা পরিস্থিতিতে বিড়ম্বনা বেড়েছে এই বৃদ্ধার। 

পানিবন্দি দশায় ছেলে নুর হোসেন কর্মহীন হয়ে পড়ায় আছিয়া খাতুনের ঘরে খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। শুধু আছিয়া খাতুন নন, সপ্তাহকাল ধরে পানিবন্দি থাকা জেলা সদর থেকে নদী দ্বারা বিচ্ছিন্ন রৌমারীর অনেক পরিবারে এখন খাদ্য সংকট। 

শুধু পানিবন্দি মানুষ নয়, খাদ্য সংকটে পড়েছে ওই এলাকার গবাদিপশু। দুর্গত এলাকার অনেকের কাছেই পৌঁছেনি সরকারি কিংবা বেসরকারি ত্রাণ সহায়তা। এমন অভিযোগ ওই এলাকার ভুক্তভোগীদের।

ঘরে-বাইরে পানি, খাবারও নেই কুড়িগ্রামের বানভাসি মানুষের  স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জিঞ্জিরাম, কালোর নদী ও ধরণী নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে গত আট দিন ধরে পানিবন্দি থাকা উপজেলার নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এছাড়া ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় নতুন করে উপজেলার চরশৌলমারী, যাদুরচর ও বন্দবেড়ে ইউনিয়নের আরও ১৬টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। 

যাদুরচর ইউনিয়নের ধনারচর নতুনগ্রাম, যাদুরচর নতুনগ্রাম, ধনারচর আকন্দ পাড়া, ধনারচর চরেরগ্রাম, যাদুরচর চাক্তাবাড়ি, ধনারচর টাংড়াপাড়া, কোমরভাঙ্গি পাখিউড়া; রৌমারী সদর ইউনিয়নের চাক্তাবাড়ি, কান্দাপাড়া; চরশৌলমারী ইউনিয়নের ঘুঘুমারী, সুখেরবাতি, চরগেন্দার আলগা, খেদাইমারী, পশ্চিম খেদাইমারী, সোনাপুর, চরঘুঘুমারীসহ উপজেলার ৬০ গ্রামের অর্ধলক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। 

বানের পানিতে ভেসে গেছে এসব এলাকার মাছের ঘের। তলিয়ে গেছে কৃষকের ধান, পাটসহ নানা ফসলি জমি। বানের পানিতে তলিয়েছে চারণ ভূমি, ভেসে গেছে জমিতে থাকা খড়। এছাড়া রৌমারীর নতুনবন্দর স্থলবন্দর ও বালিয়ামারী সীমান্ত (বাংলাদেশ-ভারত) হাঁটু পানিতে প্লাবিত হয়েছে।

যাদুরচর ইউনিয়নের ধনারচর আকন্দপাড়ার কৃষক জুয়েল মিয়া বলেন, পরিবারের লোকজনের পাশাপাশি বাড়িতে থাকা গবাদি পশুরও খাদ্য সংকটে পড়েছি। বন্যার পানিতে জমিতে স্তূপ করে রাখা খড় ভেসে গেছে। আশপাশের জমি পানিতে ডুবে যাওয়ায় গবাদিপশুর জন্য ঘাস সংগ্রহ করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে এমন দুর্গতি চললেও কোনও সহায়তা পাননি বলে অভিযোগ করেন এই কৃষক।

জুয়েল মিয়া বলেন, ‘খড় শুকায় জমিতে রাখছি। ঢলে সব ভাইসা গেছে। ঘাসও নাই। অবলা পশু (গরু) গুলারে নিয়া বিপাকে পড়ছি।’ এলাকায় পানিবন্দি থাকা প্রায় ঘরে একই অবস্থা বলে জানান এই কৃষক।

যাদুরচর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান সরবেশ আলী বলেন, পাহাড়ি ঢলের পাশাপাশি ব্রহ্মপুত্রের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় আমার ইউনিয়নের নতুন করে আরও সাতটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে ইউনিয়নের প্রায় ২৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। দুর্গতদের জন্য ছয়শ’ প্যাকেট শুকনো খবার বরাদ্দ পাওয়া গেলেও তা অপ্রতুল হওয়ায় অধিকাংশ দুর্গত মানুষের মধ্যে কোনও ত্রাণ পৌঁছাতে পারিনি।  

বন্যার পানিতে ফসলের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, বন্যার পানিতে এ পর্যন্ত (শুক্রবার) উপজেলার দুই হাজার ২৯০ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে। জলাবদ্ধতায় বেশিরভাগ ফসল নষ্ট হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন এই কৃষি কর্মকর্তা।

ঘরে-বাইরে পানি, খাবারও নেই কুড়িগ্রামের বানভাসি মানুষের  এদিকে অতিবৃষ্টি আর বন্যার কারণে চলতি মৌসুমে উপজেলায় গোখাদ্য সংকটের বিষয়ে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘দুর্গত এলাকায় গো খাদ্যের সংকট তৈরি হয়েছে। এ বছর খড়ের সংকট তীব্র হতে পারে।’

অপর এক প্রশ্নের জবাবে এ কর্মকর্তা বলেন, ‘গো খাদ্য বাবদ এখন পর্যন্ত কোনও বরাদ্দ পাওয়া যায়নি।’

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) আজিজুর রহমান জানান, উপজেলার ৬০টি গ্রামের অর্ধ লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। দুর্গতদের জন্য তিন লাখ টাকার শুকনো খাবার কেনা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার যাদুরচর ইউনিয়নে ছয়শ’ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। নতুন করে জিআরের ১০ মেট্রিক টন চালসহ এক লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে।

গবাদি পশুর খাদ্য সরবরাহের বিষয়ে পিআইও বলেন, ‘গো খাদ্যের জন্য আমাদের দেড় লাখ টাকা বরাদ্দ রয়েছে। তবে আমরা এখনও গোখাদ্য কিনতে পারিনি।’

উপজেলায় দুর্গতদের সহায়তার বিষয়ে জানতে ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আশরাফুল আলম রাসেলের ফোনে একাধিকবার কল করেও কথা বলা সম্ভব হয়নি।  

 

/টিটি/
সম্পর্কিত
বন্যায় মৃত্যু ১২৬৫, আরও বেশি সহায়তা চায় পাকিস্তান
বন্যায় মৃত্যু ১২৬৫, আরও বেশি সহায়তা চায় পাকিস্তান
বিপৎসীমার ওপরে তিস্তার পানি, আতঙ্কে কৃষক
বিপৎসীমার ওপরে তিস্তার পানি, আতঙ্কে কৃষক
পাকিস্তানে বন্যা: দুর্গতদের জন্য ত্রাণ পাঠালো আমিরাত-তুরস্ক
পাকিস্তানে বন্যা: দুর্গতদের জন্য ত্রাণ পাঠালো আমিরাত-তুরস্ক
পাকিস্তানে বন্যায় হাজারো প্রাণহানি, ক্ষতিগ্রস্ত ৩ কোটি মানুষ
পাকিস্তানে বন্যায় হাজারো প্রাণহানি, ক্ষতিগ্রস্ত ৩ কোটি মানুষ
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
উ.কোরিয়ার হুমকির মধ্যেই যৌথ মহড়ায় দ.কোরিয়া-যুক্তরাষ্ট্র
উ.কোরিয়ার হুমকির মধ্যেই যৌথ মহড়ায় দ.কোরিয়া-যুক্তরাষ্ট্র
অতিরিক্ত যাত্রী ওঠায় নৌকাডুবি: তদন্ত কমিটির প্রধান
অতিরিক্ত যাত্রী ওঠায় নৌকাডুবি: তদন্ত কমিটির প্রধান
রণেশ মৈত্র আর নেই
রণেশ মৈত্র আর নেই
আকস্মিক পদত্যাগের ঘোষণা পাকিস্তানের অর্থমন্ত্রীর
আকস্মিক পদত্যাগের ঘোষণা পাকিস্তানের অর্থমন্ত্রীর
এ বিভাগের সর্বশেষ
বিপৎসীমার ওপরে তিস্তার পানি, আতঙ্কে কৃষক
বিপৎসীমার ওপরে তিস্তার পানি, আতঙ্কে কৃষক
উপকূলে বাড়ছে জোয়ারের পানি, নাজুক বাঁধ নিয়ে দুশ্চিন্তা
উপকূলে বাড়ছে জোয়ারের পানি, নাজুক বাঁধ নিয়ে দুশ্চিন্তা
নেত্রকোনায় বন্যা, ১৪২ কোটি টাকার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত
নেত্রকোনায় বন্যা, ১৪২ কোটি টাকার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত
শ্যামনগরে বাঁধ ধসে কয়েক গ্রাম প্লাবিত
শ্যামনগরে বাঁধ ধসে কয়েক গ্রাম প্লাবিত
পটুয়াখালীতে বাড়ছে নদ-নদীর পানি, ৩০ গ্রাম প্লাবিত
পটুয়াখালীতে বাড়ছে নদ-নদীর পানি, ৩০ গ্রাম প্লাবিত