X
রবিবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২২
১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

গ্রাম বিলীন হলেও রক্ষার উদ্যোগ নেই

আরিফুল ইসলাম রিগান, কুড়িগ্রাম
১০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৮:৫৯আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৮:৫৯

ব্রহ্মপুত্রের বুকে উত্তাল ঢেউ। তীব্র বেগে ঢেউগুলো আছড়ে পড়ছে তীরে। ঢেউয়ের আঘাতে কিছু সময় পরপর কূলের মাটি ধসে পড়ছে। সেইসঙ্গে নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতবাড়ি ও স্থাপনা এবং গ্রাম।

শুক্রবার (৯ সেপ্টেম্বর) বিকাল ৪টার দিকে কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের কড্ডার মোড় সংলগ্ন রসুলপুর গ্রামে ব্রহ্মপুত্রের তীরে এমন দৃশ্য দেখা গেছে। তখনও মোল্লারহাট বাজারের উত্তর পূর্ব কোণে দাঁড়িয়ে আছে চারটি পরিবার। বাস্তুভিটায় থাকার ঘর, সবজির মাচা, গোয়ালঘর ও গাছগাছালি রয়েছে। বাড়ির আঙিনার বেশিরভাগ ব্রহ্মপুত্রে বিলীন হয়ে গেছে। পরিবারগুলো ঘরবাড়ি সরিয়ে নেয়নি। কারণ তাদের যাওয়ার জায়গা নেই। ভাঙন প্রতিরোধের উদ্যোগ নেয়নি কেউ।

গ্রাম বিলীন হলেও রক্ষার উদ্যোগ নেই

‘বুকটা ফাইটা যাইতাছে। কী করমু, চিন্তায় খাওনও বাদ দিছি। ভাঙন দেইখা বাড়িওয়ালি কান্দন শুরু করছে। আমাদের যাওনের জায়গা নাই, কই যামু’ এভাবে নিজেদের অসহায়ত্বের বর্ণনা দেন ভাঙনে বাস্তুভিটা হারাতে বসা মোল্লারহাট বাজারের শওকত আলী। তার চোখেমুখে অস্থিরতা দেখা গেছে। পুঁজি না থাকায় ঘরবাড়ি সরিয়ে নিতে পারছেন না।

শওকত বলেন, ‘নদীতে মাছ মাইরা সংসার চালাই। অহন পানি বাড়ন্ত, মাছ পাওন যায় না। ঘর সরায় অন্যের জায়গায় নিতে ট্যাহা লাগে। বাড়িত তো কোনও ট্যাহা নাই। কই যামু, চিন্তায় বুক চাপায় আইতাছে।’

গ্রাম বিলীন হলেও রক্ষার উদ্যোগ নেই

বাড়ির আঙিনায় জ্বালানি কাঠ গোছাচ্ছিলেন শওকতের স্ত্রী মজিরণ। বসতভিটা হারোনোর আতঙ্কে ছাড়লেন দীর্ঘশ্বাস। স্বামীর বেকারত্ব আর অপারগতা তাকেও ছুঁয়েছে গভীরভাবে। কিন্তু তিনিও নিরুপায়।

মজিরণ বলেন, ‘একটা সংসার গোছাইতে কত কষ্ট সেটা যে সংসার সাজায় সে জানে। আমগো সব শ্যাষ হইয়া যাইতাছে। কই যামু, যাওনের তো জায়গা নাই। রাইতটা কাটামু ক্যামনে সেটাই কইতে পারতাছি না।’

শওকত-মজিরণ দম্পতির পাশাপাশি আরও তিনটি পরিবারের একই কাহিনি। ভাঙনে বাস্তুভিটা হারাতে বসা দিনমজুর শুকুরের স্ত্রী আছমা বেগম, তার প্রতিবেশী নওশাদ অসহায়ের মতো ভাঙন দেখছেন। তাদের চোখেমুখে নিজেদের গোছানো সংসার বিলীন হওয়ার আতঙ্ক। আরও কিছুটা উত্তরে বেশকিছু আবাদি জমিসহ ২০-২৫টি পরিবার ভাঙনের হুমকিতে। মোল্লারহাট বাজারের দক্ষিণেও তীব্র ভাঙন চলছে। কিন্তু ভাঙন ঠেকানোর কোনও উদ্যোগ নেই। নদী ভাঙনে বিলীন হওয়াই যেন নিয়তি। পুনর্বাসনের আশা নেই বললেই চলে।

গ্রাম বিলীন হলেও রক্ষার উদ্যোগ নেই

চলতি বছর ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে বেগমগঞ্জ ইউনিয়নে কয়েকশ বিঘা আবাদি জমিসহ অন্তত চারশ পরিবার বাস্তুভিটা হারিয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকে ইউনিয়ন ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে। জায়গা ভাড়া নেওয়ার সামর্থ্য না থাকায় অন্তত ৫০ পরিবার আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। কাজের অভাবে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছে শতাধিক পরিবার। কিন্তু তাদের পুনর্বাসনের কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এসব তথ্য জানিয়ে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বাবলু মিয়া বলেন, ‘ইউনিয়নে প্রায় ছয় হাজার পরিবারে ২৫ হাজার মানুষের বসবাস। বেশিরভাগ পরিবার ভাঙনে নিঃস্ব হয়ে গেছে। আবাদি জমি হারিয়ে মানুষের খাবার জোগান দেওয়া কষ্টকর হয়ে পড়েছে। গত কয়েক বছরের মধ্যে এখানের বাসিন্দাদের এত অভাব আর কষ্টের সম্মুখীন হতে হয়নি।’

ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোগের বিষয়ে জানতে চাইলে চেয়ারম্যান বলেন, ‘চেয়ারম্যানের দৌড় উপজেলা পর্যন্ত। আমাদের কথা কেউ শুনতে চায় না। আপনারা বাস্তব চিত্র দেখে যান। ইউনিয়নে কোনও প্রকল্প নেই। মানুষ অভাবে থাকলেও এখানে খোলা বাজারে চাল বিক্রির ব্যবস্থা নেই, রেশনের ব্যবস্থা নেই। খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিসহ ইউনিয়নে কোনও প্রকল্প নেই। মানুষ চলবে কেমন করে?’

তবে উপজেলা প্রশাসন বলছে, বেগমগঞ্জ ইউনিয়ন সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সেখানে সরকারি সহায়তার কোনও কমতি নেই। সরকারি যেকোনো সাহায্য বিতরণের ক্ষেত্রে ওই ইউনিয়নকে প্রাধান্য দেওয়া হয়।

চেয়ারম্যানের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে উলিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিপুল কুমার বলেন, ‘চেয়ারম্যান কেন এভাবে বলেছেন জানি না। সরকারি যেকোনো সহায়তা আগে বেগমগঞ্জ ইউনিয়নে দেওয়া হয়। চেয়ারম্যানের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী ওই ইউনিয়নের মানুষের খাদ্য ও অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তবে হ্যাঁ, ওই ইউনিয়ন সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত। সেজন্য আমরা সেখানে বেশি সহায়তা দিই।’

গ্রাম বিলীন হলেও রক্ষার উদ্যোগ নেই

ভাঙন প্রতিরোধে স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ডকে কয়েক দফা চিঠি দেওয়া হয়েছে জানিয়ে ইউএনও বলেন, ‘আমরা চিঠি পাঠিয়েছি। এখন তারা ব্যবস্থা নেবে।’

তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বলছে, চরাঞ্চলের ভাঙন প্রতিরোধে তাদের কোনও প্রকল্প নেই।

উপজেলা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘চরাঞ্চলের ভাঙন প্রতিরোধে আমাদের কোনও প্রকল্প নেই। তবে জরুরি কোনও ভাঙনের ক্ষেত্রে অনুমোদন সাপেক্ষে আমরা ব্যবস্থা নিয়ে থাকি।’

শনিবার বিকালে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ব্রহ্মপুত্র খানিকটা শান্ত হয়ে আসায় শওকত ও তার প্রতিবেশীদের ঘরগুলো এখনও টিকে আছে। বালুভর্তি কয়েকশ জিও ব্যাগ ফেললে হয়তো শেষরক্ষা হবে।

/এএম/
কর্মীদের অবহেলা পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি ডিএনসিসির
কর্মীদের অবহেলা পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি ডিএনসিসির
পাচারকালে মিয়ানমারের গরুর পাল আটক
পাচারকালে মিয়ানমারের গরুর পাল আটক
সশস্ত্র বাহিনীর তিন কর্মকর্তার রদবদল
সশস্ত্র বাহিনীর তিন কর্মকর্তার রদবদল
তারেক রহমানকে ‘কুলাঙ্গার’ বললেন শেখ হাসিনা
তারেক রহমানকে ‘কুলাঙ্গার’ বললেন শেখ হাসিনা
সর্বাধিক পঠিত
১১ মাসে নাগরিকত্ব ছাড়লেন ৪০১ বাংলাদেশি
১১ মাসে নাগরিকত্ব ছাড়লেন ৪০১ বাংলাদেশি
মেসি-আলভারেজের গোলে কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনা
মেসি-আলভারেজের গোলে কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনা
‘পুলিশ প্রটোকলে’ বিদায় নিলেন রাঙ্গাবালীর ইউএনও
‘পুলিশ প্রটোকলে’ বিদায় নিলেন রাঙ্গাবালীর ইউএনও
হাসপাতালে কী হয়েছিল মাইশার সঙ্গে?
আঙুলের অপারেশন করতে গিয়ে মৃত্যুহাসপাতালে কী হয়েছিল মাইশার সঙ্গে?
‘ঘটনার পেছনের ঘটনা’ জেনে ফারিণের দুঃখপ্রকাশ
‘ঘটনার পেছনের ঘটনা’ জেনে ফারিণের দুঃখপ্রকাশ