রংপুর বিভাগের আট জেলায় হাড় কাঁপানো শীত। শৈত্য প্রবাহ কমছেই না। ঘন কুয়াশা আর কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস শীতের প্রকোপকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। এদিকে শীত থেকে বাঁচার জন্য আগুন পোহাতে গিয়ে দগ্ধ হচ্ছেন সব বয়সী মানুষ। গত ২৪ ঘণ্টায় দুই শিশুসহ চার জন রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি হন। এদের মধ্যে তিনজনের শরীরের ৬০ থেকে ৭০ ভাগ দগ্ধ হয়েছে। তাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে বার্ন ইউনিট সূত্রে জানা গেছে। এছাড়া দগ্ধ হয়ে গত এক সপ্তাহে তিন জন মারা গেছেন। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন আগুনে পোড়া ২৭ রোগী।
এদিকে হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন রোগীদের জন্য স্যালাইন ছাড়া কোনও ওষুধ সরবরাহ না করার অভিযোগ উঠেছে। ফলে অসচ্ছল রোগীদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে দগ্ধ রোগী ও তাদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রংপুর বিভাগের আট জেলার মধ্যে একমাত্র বিশেষায়িত বার্ন ইউনিট রয়েছে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। এখানে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক-নার্সসহ সর্বাধুনিক চিকিৎসা সামগ্রী আছে। তবে দগ্ধ রোগীদের ওষধ সরবরাহ করার প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ থাকলেও রোগীরা ওষুধ পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেন কেউ কেউ।
অন্যদিকে প্রচণ্ড শীতে সহায়-সম্বলহীন দরিদ্র পরিবারগুলো, যাদের শীত নিবারনের প্রয়োজনীয় শীত বস্ত্র নেই, তারা খড়কুটো জ্বালিয়ে কিছুটা স্বস্তি পাওয়ার চেষ্টা করছে। আগুন পোহাতে গিয়ে অসাবধানতায় গায়ের কাপড়ে আগুন লেগে দগ্ধ হচ্ছেন তাদের অনেকে। বার্ন ইউনিটের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চিকিৎসক ও নার্সরা বলছেন, দগ্ধ রোগীদের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। যা হতদরিদ্র পরিবারগুলোর পক্ষে বহন করা কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না।
শনিবার রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে আগুন পোহাতে গিয়ে কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার শ্যামপুর গ্রামের মৃত নাসিতুল্লা মিয়ার স্ত্রী আয়েশা বেগম (৬৫) দগ্ধ হন। প্রথমে পেটিকোটের আগুন ধরে মুহূর্তে তা সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় প্রথমে কুড়িগ্রাম জেলা হাসপাতাল, পরে সেখান থেকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয় তাকে। চিকিৎসকরা জানান, তারা শ্বাসনালীসহ ৮০ ভাগ পুড়ে গেছে। তবে শনিবার মধ্যরাতে ভর্তির পর ২০ ঘণ্টায় দুটি স্যালাইন ছাড়া আর কোনও ওষুধ তাকে সরবরাহ করেনি বার্ন ইউনিট কর্তৃপক্ষ। আয়েশা বেগমের মেয়ে রমিছা জানান, ২০ ঘণ্টায় ২২ হাজার টাকার বিভিন্ন ধরনের ইনজেকশন ও ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হয়েছে। আসার সময় এক মাত্র ছাগল বিক্রি করে হাসপাতালে এনেছেন মাকে। আরও অনেক ওসুধ কেনার কথা বলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু টাকার অভাবে সেগুলো কিনতে পারছেন না তারা।
একই কথা জানালেন দিনাজপুর জেলার খানসামা উপজেলা সদর থেকে আসা রশিদুল ইসলামের ১৫ বছর বয়সী কিশোরী কন্যা রশিদা বেগম। রবিবার সকালে আগুন পোহাতে গিয়ে তার পরনের সালোয়ারে আগুন লেগে দগ্ধ হয়েছে শরীরের ৬০ শতাংশ। বার্ন ইউনিট থেকে স্যালাইন ছাড়া কোনও ওষুধ না দিয়ে প্রেসক্রিপশন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সবগুলো ওষুধ কিনতে ২৫ হাজার টাকা দরকার। কিন্তু টাকা আছে মাত্র ৮ হাজার। ফলে বেশিরভাগ ওষুধ কিনতে না পারায় একরকম বিনা চিকিৎসায় অবস্থান করছেন তারা। রাশেদা বলে, ডাক্তার আমাকে ঢাকায় নিয়ে যেতে বলেছে। কিন্তু রংপুরেই ওষুধ কিনতে পারছি না। ঢাকায় গিয়ে কী করবো?
পঞ্চগড় জেলার টুনিরহাট গ্রাম থেকে দগ্ধ হয়ে হাসপাতালে এসেছে মইনুল ইসলামের ১২ বছর বয়সী কন্যা মুন্নী আখতার। আগুন পোহাতে গিয়ে দগ্ধ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছে এবং দুই দিনে ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ধারদেনা করে এই টাকা নিয়ে এসেছেন বলে জানালেন বাবা ময়নুল ইসলাম। এখন টাকার অভাবে মেয়ের চিকিৎসা বন্ধ হওয়ার উপক্রম, একথা বলেই কান্না শুরু করেন তিনি।
নীলফামারী জেলার বাবড়িঝাড় গ্রাম থেকে এসেছে চার বছরের শিশু জান্নাতুল মুনতাহা। তার বাবার নাম নাজিমুর রহমান। শিশুটির শরীরের নিচের অংশ ৫০ ভাগ পুড়ে গেছে। তিন দিনে ৪০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে তাদের। এখন ওষুধ কেনার কোনও টাকা নেই। একই কথা জানালেন রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার নিশ্চিন্তপুর গ্রামের রাজিয়া সুলতানা (১৩)। ১৫ দিন আগে আগুন পোহাতে গিয়ে তার শরীরের ৬৫ ভাগ পুড়ে যায়। এ পর্যন্ত ৭০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে ওষুধ কিনতে। এখন আর কোনও অবলম্বন নেই যা দিয়ে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব।
হাসপাতালে ভর্তি থাকা প্রায় সব রোগীর অভিযোগই এক। হাসপাতাল থেকে স্যালাইন ছাড়া আর কোনও ওষুধ দেওয়া হয় না। বার্ন ইউনিটের রোগীদের জন্য বরাদ্দ করা ওষুধ গেলো কোথায়– এমন প্রশ্নের উত্তরে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চিকিৎসক জানান, বার্ন ইউনিটের রোগীদের জন্য স্পেশাল বরাদ্দ আছে। এছাড়া পরিচালকের কাছে গরীব রোগীদের চিকিৎসার জন্য অর্থ বরাদ্দ আছে। কেন সহায় সম্বলহীন রোগীদের পেছনে ব্যয় করা হচ্ছে না তা তার জানা নেই।
এ ব্যাপারে বার্ন ইউনিটের প্রধান সহকারী অধ্যাপক ডা. এম এ হামিদ পলাশ জানান ওষুধ বরাদ্দের বিষয়টি তিনি জানেন না। তারা রোগী দেখে ব্যবস্থাপত্র দেন। এর বাইরে তাদের কোনও কিছু করার নেই। তবে দগ্ধ রোগীর চিকিৎসা ব্যয়বহুল বলে স্বীকার করেন তিনি।
সার্বিক বিষয়ে জানতে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. রশিদুল হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আগুন পোহানোর ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। ওষুধ সংকটের ব্যাপারে কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।







