কাজে যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘরে এলো লাশ, কান্না থামছে না পরিবারের

বিপুল সরকার সানি, দিনাজপুর
০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৯:১২আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৯:১২

কান্না আর আহাজারি যেন থামছেই না বিআরটিসি বাসের চাপায় নিহত ভ্যানচালক আব্দুল মজিদের পরিবারের। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ সবাই। বাবাকে হারিয়ে এখন পড়ালেখা কীভাবে করবেন এটাও দুশ্চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে নিহতের ছেলে ও মেয়ের।

মঙ্গলবার (৬ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে নিহত খানসামা উপজেলার গোয়ালডিহি বটতলী এলাকার আজিম উদ্দীনের ছেলে আব্দুল মজিদের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, বারান্দায় বসে আহাজারি করছেন তার স্ত্রী ফিরোজা বেগম।

তিনি বলেন, ‘সকালে বাড়ি থেকে বের হয়েছেন কাজে। এরপর আমরা এলাকাবাসীর মাধ্যমে দুর্ঘটনার সংবাদ জানতে পারি। ঘটনার পর পুলিশের কাছ থেকে লাশ নিয়ে আসি। এভাবে আমার স্বামী মারা যাবে কোনোভাবেই চিন্তা করতে পারিনি। আমি নিজেও অন্যের বাড়িতে কাজ করি। সে থাকতেই অভাব ছিল। ছেলে এবারে এসএসসি দিয়ে মাধ্যমিকে উঠেছে, আর মেয়েটি নবম শ্রেণিতে পড়ছে। স্বপ্ন ছিল ছেলে-মেয়েকে পড়ালেখা শিখিয়ে মানুষ করবো, চাকরি করে সংসার একটু সচ্ছলতা ফিরবে। কিন্তু এখন আমার সব স্বপ্ন দুঃস্বপ্ন হয়ে গেলো। এখন কীভাবে আমার এই সংসার চালাবো, কীভাবে ছেলেমেয়েকে পড়ালেখা করাবো?’

ছেলে ফেরদৌস রহমান বলেন, ‘আমি পড়ালেখার পাশাপাশি একটি ছোট প্রতিষ্ঠানে চাকরি করি। বাবাই সংসার চালাতো, এভাবেই পড়ালেখা ও সংসার চলতো। এখন আমি কী করবো? আমাদের দুজনেরই পড়ালেখার সমস্যা হয়ে যাবে। কী করবো বুঝতে পারছি না।’

বাবাকে হারিয়ে এক প্রকার বাকরুদ্ধ নবম শ্রেণি পড়ুয়া মেয়ে মারুফা। সে বলে, ‘আমার ইচ্ছা ছিল পড়ালেখা শিখে বড় হবো। বাবা-মায়ের মুখ উজ্জ্বল করবো। বাবা আমাকে খুব ভালোবাসতো। স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াবো। এখন পড়ালেখা শেষ করতে পারবো কি না বুঝতে পারছি না। সহযোগিতা পেলে পড়ালেখা করে মাকে সাহায্য করতে চাই।’

স্থানীয় শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘বাবাই মূলত এই সংসার পরিচালনা করতো। ছেলে ও মেয়ে দুটি অত্যন্ত ভদ্র। পড়ালেখাতেও ভালো। তারা বড় হবে, মানুষের মতো মানুষ হবে এজন্য বাবা ভ্যান চালাতো আর মা অন্যের বাড়িতে কাজ করতো। যাতে করে পড়ালেখায় কোনও ব্যাঘাত না ঘটে। ছেলেটিও একটি ছোট প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে।’

প্রতিবেশী সাঈদা আক্তার বলেন, ‘তারা খুবই গরিব। আগে অন্যের জমিতে কাজ করতেন, এখন ভ্যান চালাতেন। ছেলে ও মেয়ে দুটি ছোট। এখন কেমন করে এই সংসার চলবে? এ জন্য সরকার যাতে এগিয়ে আসে ও সহযোগিতা করে এটিই আমাদের চাওয়া।’

কাজে যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘরে এলো লাশ, কান্না থামছে না পরিবারের

মঙ্গলবার (৬ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৭টার দিকে দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার রানীরবন্দর বাজারের পূর্বদিকে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন চার জন। ঘটনার পরপরই স্থানীয়রা সড়ক অবরোধ করে সব যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেন। এতে রাস্তার দুই পাশে আটকা পড়ে অর্ধশতাধিক যানবাহন।

নিহতরা হলেন- খানসামা উপজেলার গোয়ালডিহি প্লানের বাজারের ইসমাইল হোসেনের ছেলে নজরুল ইসলাম নজু (৪৫), গোয়ালডিহি বটতলী এলাকার আজিম উদ্দীনের ছেলে আব্দুল মজিদ (৫০), টেকনাফের হরিখোলা গ্রামের মৃত মংসু চাকমার ছেলে নত্তা ইয়াং চকমা (৫২) ও একই এলাকার মৃত ইশ এসং চাকমার ছেলে সাইঙ্গো চাকমা (৪৫)।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, সকালে রানীরবন্দর বাজারে দিনাজপুর থেকে রংপুরগামী একটি বিআরটিসির বাস (ঢাকা মেট্রো-ব-১৫-৫৪৯৩) রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা একটি বাসকে ভুল দিক দিয়ে ওভারটেক করার চেষ্টা করে। এতে বাসটি দাঁড়িয়ে থাকা ভ্যানচালকসহ চার জনকে চাপা দিয়ে রাস্তার পার্শ্বে একটি অস্থায়ী দোকানকে তছনছ করে। এতে ঘটনাস্থলেই দুই ভ্যানচালক ও দুই আদিবাসী মধু ব্যবসায়ী মারা যান। গুরুতর আহত হন এক আদিবাসীসহ কমপক্ষে চার জন। 

খবর পেয়ে দিনাজপুর হাইওয়ে থানা পুলিশ, চিরিরবন্দর থানা পুলিশ, ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। চার জনের লাশ উদ্ধার করা হয় যার মধ্যে দুই জনকে তাদের পরিবারের সদস্যরা সঙ্গে সঙ্গেই বাড়িতে নিয়ে যান। অপর দুই চাকমা মধু ব্যবসায়ীর লাশ নিয়ে যায় হাইওয়ে থানা পুলিশ।

তিন চাকমা মধু ব্যবসায়ীর মধ্যে গুরুতরভাবে আহত কক্সবাজার জেলার টেকনাফ থানার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের হরিখোলা গ্রামের প্রদীপ চাকমা। তিনি বলেন, ‘আমরা দিনাজপুরে মধু বিক্রি করার আসছি। দিনাজপুর থেকে গেটলকে উঠে রানীরবন্দর নামি। একটি ভ্যান নেওয়ার জন্য দরদাম করছিলাম, এ সময় বাসটি আমাদেরকে ধাক্কা দেয়। দুর্ঘটনার পর আমি কিছুই বলতে পারি না। পরে একটু হুঁশ এলে জানতে পারি, আমার সঙ্গে থাকা দুই জন নিহত হয়েছেন। নিহতের মধ্যে একজন মামাতো ভাই ও একজন ফুফুতো ভাই।’

স্থানীয় মাজেদুল ইসলাম বলেন, ‘বিআরটিসি বাসটি সম্পূর্ণ রং সাইডে গিয়ে ভ্যানসহ কয়েকজনকে চাপা দেয়। এতে চার জন নিহত হন, আহত হন আরও চার জন। এর মধ্যে একজনের অবস্থা গুরুতর। ঘটনার পর চালককে আটকের চেষ্টা করা হলেও পালিয়ে যান।’

হাইওয়ে থানার রংপুর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হরেশ্বর রায় বলেন, ‘বিআরটিসি বাস বেপোরোয়াভাবে চালানোর কারণে দুর্ঘটনা ঘটেছে। রাস্তা অবরোধ তুলে ফেলা হয়েছে। বিআরটিসির চালক সতর্ক ছিল না, যার কারণে এই দুর্ঘটনা এবং রাস্তায় একটি বাস দাঁড়িয়ে থাকার কারণে দুর্ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত চালককে গ্রেফতারের আওতায় আনার জন্য অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এই ঘটনায় সব প্রকার আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।’

/এফআর/
সম্পর্কিত
৩০০ ফিটে প্রাইভেটকারের ধাক্কায় চীনা নাগরিকের মৃত্যু
বাবা-মেয়েসহ ইজিবাইকের ৩ যাত্রী নিহত
ঈদুল আজহা: ১৩ দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ২৮১
সর্বশেষ খবর
কুমিরের আক্রমণে সন্তানের মৃত্যুর পর ফজিলাকে খুঁজে পেলো পরিবার
কুমিরের আক্রমণে সন্তানের মৃত্যুর পর ফজিলাকে খুঁজে পেলো পরিবার
ট্রাফিক আইন সবার জন্য সমান, পুলিশ সদস্য হলেও ব্যবস্থা: ডিএমপি কমিশনার
ট্রাফিক আইন সবার জন্য সমান, পুলিশ সদস্য হলেও ব্যবস্থা: ডিএমপি কমিশনার
ফ্রিল্যান্সারদের আয় থেকে সাড়ে ৭ শতাংশ কর কাটা নিয়ে যা বলছে এনবিআর 
ফ্রিল্যান্সারদের আয় থেকে সাড়ে ৭ শতাংশ কর কাটা নিয়ে যা বলছে এনবিআর 
কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয়ে ৭.৫% কর নেওয়ার অভিযোগ, স্পষ্ট করার দাবি সারজিসের
কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয়ে ৭.৫% কর নেওয়ার অভিযোগ, স্পষ্ট করার দাবি সারজিসের
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে