X
বুধবার, ১৭ জুলাই ২০২৪
২ শ্রাবণ ১৪৩১

সড়ক সম্প্রসারণকাজে ৩৪৩ গাছের মৃত্যু, জনমনে ক্ষোভ

বিপুল সরকার সানি, দিনাজপুর
০৭ মে ২০২৪, ১০:০০আপডেট : ০৭ মে ২০২৪, ১০:০০

প্রচণ্ড গরমে কাহিল দিনাজপুরের মানুষ। বৃষ্টির দেখা নেই, সেই সঙ্গে প্রখর রোদ। তাপমাত্রার পারদ ওপরে উঠছে। এমন সময় সবাই যখন বলছে বৃক্ষরোপণের কথা, তখন জেলার বোচাগঞ্জ-কাহারোল সড়ক সম্প্রসারণের জন্য কাটা হচ্ছে ৩৪৩টি গাছ! এর মধ্যে রয়েছে মেহগনি, জারুল, কৃষ্ণচূড়া, বকুলফুল, পাকুড়সহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ। বাদ যাচ্ছে না মৌসুমে ফল ধরা আম, জাম, কাঁঠাল, খেজুরগাছও।

অসহনীয় গরমের এই অবস্থায় গাছ কাটায় ক্ষোভ জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যক্তিরা। তারা অভিযোগ করে জানিয়েছেন, সম্প্রসারণের জন্যই শুধু নয়, আওতার বাইরেও কাটা হচ্ছে গাছ।

তবে গাছ কাটার বিষয়ে সড়ক বিভাগ বলছে, সড়ক সম্প্রসারণের জন্য চিঠি দেওয়ার পর জেলা পরিষদ থেকে গাছগুলো দরপত্রের মাধ্যমে কাটা হচ্ছে। আর জেলা পরিষদ বলছে, রিকুইজেশনের ভিত্তিতে গাছ কাটা হচ্ছে। তবে প্রয়োজন ছাড়া যেসব গাছ কাটা হচ্ছে, এ ব্যাপারে প্রকৌশলীরা সদুত্তর দিতে পারেননি বলে জানান জেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তা।

দিনাজপুর জেলা পরিষদ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বোচাগঞ্জ ও কাহারোল উপজেলার বিভিন্ন সড়কের পাশে ১৯৯০ সালে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদফতরের রাস্তার দুই ধারে অব্যবহৃত জায়গায় আম, জাম, কাঁঠাল, মেহগনি, বকাইল, পাকুড়, কদম, কৃষ্ণচূড়া, কামরাঙ্গাসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ রোপণ করেছিল জেলা পরিষদ। ৩৪ বছর ধরে সেসব গাছ মানুষকে দিয়েছে অক্সিজেন, ছায়া ও ফল। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঠেকাতেও ভূমিকা রেখেছে ভীষণ। কিন্তু সড়কগুলোর বাজার এলাকা ও আশপাশের রাস্তা প্রশস্তকরণের জন্য গাছগুলো কাটার জন্য চিঠি দেয় সওজ।

সম্প্রসারণের জন্যই শুধু নয়, আওতার বাইরেও কাটা হচ্ছে গাছ

চিঠি অনুযায়ী, গত ৪ ফেব্রুয়ারি জেলা পরিষদ বোচাগঞ্জ উপজেলার জালগাঁও মোড় থেকে ডাকবাংলো অডিটরিয়াম মোড় পর্যন্ত ১৪টি আম, ১৮টি কাঠাল, ৮৭টি মেহগনি, ১৪টি কৃষ্ণচূড়া, ৫টি কড়াই, ৪টি রেইনট্রি, ২টি বট, একটি পাকুড়সহ বিভিন্ন প্রজাতির ১৮৮টি গাছ, পুলেরহাট বাজার এলাকায় ১৭টি আম, ৪টি জাম, ৫টি কাঁঠাল, ৭টি মেহগনি, ৯টি জারুলসহ বিভিন্ন প্রজাতির ৫৬টি গাছ, মাধবপুর বাজার এলাকায় ফলজসহ বিভিন্ন প্রজাতির ৩২টি, এবং বকুলতলা বাজার এলাকায় ২৩টি গাছ মিলে ২৯৯টি গাছ বিক্রির দরপত্র দেয়। এগুলোর মধ্যে ৪৯টি আম, ২৭ টি কাঁঠাল, ৭টি জামগাছ রয়েছে, যেগুলোতে এই মৌসুমে ফল ধরেছে।

এ ছাড়া ১০১টি মেহগনিসহ জারুল, কৃষ্ণচূড়া, খেজুর, পাকুড়, বকুল ফুল, রেইনট্রি, কদমসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ রয়েছে। জেলার কাহারোল উপজেলার জয়নন্দ হাটবাজার পর্যন্ত ৬টি আম, ২০টি আকাশমণি, ৪টি কড়ই, ৩টি মেহগনি, ৫টি কদম, ২টি শিমুলসহ বিভিন্ন প্রজাতির ৪১টি গাছ এবং বীরগঞ্জ ডাকবাংলায় একটি কৃষ্ণচূড়াগাছের ১১টি খণ্ড ও খানসামায় একটি আমগাছ কাটার দরপত্র হয়। মোট ১০টি লটে গাছগুলো দরপত্র দিয়ে গত ১৬ এপ্রিল কাটার কার্যাদেশ দেয় জেলা পরিষদ। কার্যাদেশে ১০ কার্যদিবসের গাছ অপসারণের জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশনা দেওয়া হয়। কার্যাদেশ পাওয়ার পর কয়েক দিন ধরে গাছ কাটা শুরু করে দরপত্রপ্রাপ্ত ঠিকাদাররা।

সরেজমিনে বোচাগঞ্জ উপজেলা এলাকায় দেখা যায়, দ্রুততার সঙ্গেই চলছে গাছ কাটা। যেসব গাছ কাটা হয়ে গেছে, সেগুলো ট্রাক্টরে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে করাত কলে। একসময়ে যে গাছগুলো ছায়া দিতো, সেগুলোকে কেটে ফেলায় এখন খাঁ খাঁ করছে পুরো এলাকা। এতে জনমনে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

গরমের সময়ে গাছ না কেটে শীতের সময়ে গাছ কাটারও অনুরোধ জানান জনগণ

সংবাদকর্মীদের ছবি তুলতে দেখে এগিয়ে আসেন এলাকার জনগণ। তারা ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, এ ব্যাপারে প্রতিবাদ করেও কোনও লাভ হয়নি। তাদের অভিযোগ, সড়ক সম্প্রসারণের জন্য গাছ কাটা বলা হলেও, এমন কিছু গাছ কাটা হচ্ছে, যা সড়ক থেকে অনেক দূরে। প্রয়োজন ছাড়াই এসব গাছ কাটা হচ্ছে এবং গরমের সময়ে গাছ না কেটে শীতের সময়ে গাছ কাটারও অনুরোধ জানান তারা।

স্থানীয় বাসিন্দা আজাহার উদ্দিন বলেন, প্রচণ্ড গরম, এখন তাপমাত্রা অনেক বেশি। এই গরমের গাছের ছায়া দিয়ে হাঁটতাম, ছায়া পেতাম। কিন্তু এখন গাছগুলো কাটা হচ্ছে। সরকার তো গাছ কাটবে, সমস্যা নাই। কিন্তু হিসেবমতো কাটতো, শীতের সময়ে কাটতো, তাহলে আমাদের উপকার হতো। আমাদের তো ক্ষমতা নেই গাছ কাটা বন্ধ করার।

রিকশাচালক আলী হোসেন বলেন, এই যে রাস্তার গাছগুলো কেটে দিচ্ছে, আমাদের চলাচলে খুব অসুবিধা হচ্ছে। কোথাও আমরা আশ্রয় নিতে পারছি না। গাছ থাকলে রাস্তার পাশে দাঁড়াতে পারতাম, যাত্রীদের পার্কিং দিতে পারতাম। আমাদের অনেক সমস্যা হচ্ছে। এমনিতেই এখন রোদের অনেক তাপ, শরীরের জন্য অনেক কষ্ট হচ্ছে। এ সময় গাছ কাটা ঠিক না।

আটগাঁও ইউনিয়নের হাট মাধবপুর এলাকার আরমান আলী বলেন, গাছগুলো আনুমানিক ’৯০ থেকে ’৯১ সালে রোপণ করা হয়েছিল। এই গাছগুলো দেশের জন্য উপকারই ছিল। বর্তমান গাছগুলো কাটা হলে আবহাওয়ার ক্ষতি, আমাদের শ্বাস নেওয়ার জন্য ক্ষতি হবে। রাস্তা দিয়ে হাঁটাও যাবে না। যে তাপমাত্রা তাতে গাছগুলো থাকলে খুব ভালো হতো। পরিবেশ ভালো থাকতো। সরকার কেটে ফেললে আমাদের করার কিছু নাই। তবে গাছ মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে।

মফিজুল ইসলাম বলেন, এমনিতেই বৃষ্টি নেই, রোদের তাপে মানুষ দাঁড়াতে পারছে না। যেখানে রাস্তা বানাবে, সেখানে গাছগুলো কাটতো, রাস্তা থেকে ১০ ফুট দূরে গাছ কাটা হচ্ছে। আমরা প্রতিবাদ করেছি, ঠিকাদার বলছে টেন্ডার নিয়ে গাছ কাটছে। রাস্তা প্রসার হবে ৩ ও ৬ ফুট। কিন্তু এই মাপের চেয়ে দূরে রয়েছে, এমন গাছ কাটা হচ্ছে। কিছু জায়গায় দেখলাম গাছ কাটার প্রয়োজন নাই, তবু কাটা হচ্ছে। আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।

এ বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স আনোয়ার এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আনোয়ার হোসেন বলেন, গাছগুলো জেলা পরিষদ থেকে টেন্ডারের মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে। আমরা টেন্ডার নিয়েছি সরকারি নিয়ম অনুযায়ী। অফিস অর্ডারের ভিত্তিতে গাছগুলো কাটছি। ১০ কার্যদিবসের মধ্যে গাছগুলো অপসারণের আদেশ আছে। সে অনুযায়ী গাছগুলো কাটছি।

সড়কের জায়গার ভেতরে যতটুকু পড়বে, ততটুকু গাছ কাটবে বলে জানায় সওজ

দিনাজপুর সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের উপবিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী রইচ উদ্দিন বলেন, এ নিয়ে জেলা পরিষদকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। জেলা পরিষদ টেন্ডারের মাধ্যমে গাছ কাটছে। গাছ কাটার সব দায়িত্ব জেলা পরিষদের। আওতার বাইরে গাছ কাটার ব্যাপারে তিনি বলেন, সড়কের জায়গার ভেতরে যতটুকু পড়বে, ততটুকু গাছ কাটবে। যদি অতিরিক্ত গাছ কাটে, তাহলে সেটি জেলা পরিষদ বলতে পারবে। আমাদের ১৮টি রাস্তা, সেখানে ২৪ ফুট হবে।

দিনাজপুর জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোকলেসুর রহমান বলেন, আমি যোগদানের আগে সড়ক বিভাগ থেকে একটি রিকুইজেশন এসেছিল যে রাস্তার উন্নয়ন করা হবে। তাই এই গাছগুলো সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তাদের রিকুইজেশন মোতাবেক বন বিভাগ থেকে মূল্য সংগ্রহ করে জেলা প্রশাসন এবং বিভাগীয় কমিশনার অফিসে অনুমোদন নেওয়া হয়েছে। এরপর আমরা টেন্ডার দিয়েছি। এখন আমার কাছে অভিযোগ আসছে যে কিছু গাছ আছে দূরে, সেগুলো কাটার দরকার কী। এ বিষয়ে আমি ইঞ্জিনিয়ারদের সঙ্গে কথা বলেছি যে যেগুলো কার্পেটিং থেকে দূরে, সেগুলো কাটার বিষয়ে তারা আমাকে কোনও সঠিক উত্তর দিতে পারেনি। এটি আমারও কৌতূহল যে কার্পেটিংয়ে সমস্যা না হলে সেসব গাছ কাটবো কেন?

তিনি আরও বলেন, আমি মিটিংয়ে জোর দাবি করেছি যে রাস্তার কাজ করতে গিয়ে তাড়াহুড়া করা যাবে না। যেটা নিট বেইস, কার্পেটিংয়ে সমস্যা হবে, ওইটুকু জায়গার মধ্যে যেসব গাছ কাটা দরকার, শুধু সেগুলো কাটতে হবে। অন্য গাছ কাটা যাবে না।

/এনএআর/
সম্পর্কিত
জাতীয় বায়ুমান ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হচ্ছে
পুলিশি বাধা উপেক্ষা করে শিক্ষার্থীদের ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ
বন্যার পানি কমেছে কুড়িগ্রামে, ভোগান্তির সঙ্গে বেড়েছে অভাব
সর্বশেষ খবর
কাল সারা দেশে বিক্ষোভ ডেকেছেন চরমোনাই পীর
কোটা-সংস্কার আন্দোলনকাল সারা দেশে বিক্ষোভ ডেকেছেন চরমোনাই পীর
হল ছাড়ছেন ঢাবি শিক্ষার্থীরা
হল ছাড়ছেন ঢাবি শিক্ষার্থীরা
কোটা আন্দোলনকারীদের কর্মসূচি দেখে সিদ্ধান্ত জানাবে বিএনপি ও যুগপৎ দলগুলো
কোটা আন্দোলনকারীদের কর্মসূচি দেখে সিদ্ধান্ত জানাবে বিএনপি ও যুগপৎ দলগুলো
রাজপথে সব ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করবো: সাঈদ খোকন
রাজপথে সব ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করবো: সাঈদ খোকন
সর্বাধিক পঠিত
সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা
সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা
কী আছে ড. জাফর ইকবালের মূল লেখায়
কী আছে ড. জাফর ইকবালের মূল লেখায়
ছাত্রলীগের ১৫ কর্মীকে ছয়তলা থেকে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ
ছাত্রলীগের ১৫ কর্মীকে ছয়তলা থেকে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ
রোকেয়া হল ছাত্রলীগের নেত্রীর কক্ষে হামলা, মারধর
রোকেয়া হল ছাত্রলীগের নেত্রীর কক্ষে হামলা, মারধর
ছাত্রলীগ থেকে পদত্যাগ করলেন আরেক নেতা, লিখলেন ‘আর পারলাম না’
ছাত্রলীগ থেকে পদত্যাগ করলেন আরেক নেতা, লিখলেন ‘আর পারলাম না’