মামলার তারিখ পড়তে পড়তে গরু-ছাগল-হাঁস-মুরগি সব গেলো, কিন্তু বিচারই শেষ হচ্ছে না

লিয়াকত আলী বাদল, রংপুর
২৭ অক্টোবর ২০২৬, ২৩:১৩ আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ২৩:১৩

রংপুরে নারী ও শিশু নির্যাতন দমনের তিনটি ট্রাইব্যুনালে ছয় হাজারের বেশি মামলার বিচার শেষ হচ্ছে না। পাঁচ থেকে ১৮ বছর ধরে আদালতের বারান্দায় ঘুরছেন বিচারপ্রার্থীরা। এসব মামলার মধ্যে দুই হাজারের বেশি ধর্ষণের ঘটনার। আর ধর্ষণ ও যৌতুকসহ বিভিন্ন অভিযোগে করা ৩০০টির বেশি মামলা ১৫ থেকে ১৮ বছর ধরে বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে বলে আদালত সূত্রে জানা গেছে।

দীর্ঘদিনেও বিচার শেষ না হওয়ার পেছনে আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাব, আদালতে সাক্ষী হাজির করতে পুলিশের দায়িত্বহীনতা এবং রাষ্ট্রপক্ষের মামলা পরিচালনাকারীদের গাফিলতিকে দায়ী করছেন মানবাধিকারকর্মী, আইন বিশেষজ্ঞ ও বিচারপ্রার্থীরা।

সরেজমিনে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ঘুরে বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগের চিত্র পাওয়া গেছে। ট্রাইব্যুনাল-২-এর সামনে কান্নায় ভেঙে পড়েন পীরগাছা উপজেলার আনন্দনগর গ্রামের শরীফা ইয়াসমিন। তার অভিযোগ, দুই লাখ টাকা যৌতুক দিতে না পারায় স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছেন। এ ঘটনায় যৌতুকের মামলা করার পর ছয় বছর ধরে আদালতে ঘুরছেন তিনি। কিন্তু এখনও বিচার শুরু হয়নি। কবে বিচার পাবেন, তা-ও জানেন না।

শরীফা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দুই মাস পরপর খালি মামলার তারিখ পড়ে। প্রতিবার আদালতে আসা-যাওয়া, আইনজীবী ও মুহুরির খরচ এবং মামলার কাগজপত্র সংগ্রহ করতে গিয়ে আমাকে গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি বিক্রি করতে হয়েছে। কিন্তু আমার সব শেষ হয়ে গেলেও বিচারই শেষ হচ্ছে না।’

একই ধরনের অভিযোগ পীরগাছার আসমা বেগম ও রংপুর সদরের মরিয়ম বেগমের। তাদের অভিযোগ, তাদের অনেকেই ধর্ষণসহ নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। কিন্তু ছয় থেকে ১৮ বছরেও মামলার বিচারকাজ শেষ হয়নি। সহায়-সম্বল বিক্রি করে প্রতিবার আদালতে আসতে হয়। আইনজীবী, মুহুরি ও পেশকারের খরচ মিটিয়ে বাড়ি ফিরতে হয় তাদের। কবে নাগাদ বিচার শেষ হবে, তা জানেন না তারা।

মিঠাপুকুর উপজেলার হতদরিদ্র আসমা বেগম জানান, প্রায় আট মাস আগে তার মেয়েকে তুলে নিয়ে ধর্ষণ করা হয়েছিল। এ ঘটনায় মামলা হলেও আট বছরেও বিচার শুরু হয়নি।

অন্যদিকে, পীরগাছার ভেন্ডাবাড়ি গ্রামের সোহরাব হোসেনের অভিযোগ, তার বিরুদ্ধে ধর্ষণের একটি মামলা হয়েছে, যার কারণে ১৮ বছর ধরে আদালতে ঘুরছেন তিনি। ঢাকায় রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন সোহরাব। দুই মাস পরপর রংপুরে আদালতে এসে হাজিরা দিয়ে আবার ঢাকায় ফিরে যান।

সোহরাব বলেন, মামলার ধার্য তারিখে আদালতে হাজির না হলে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। তাই বাধ্য হয়ে ঢাকায় রিকশা চালানোর কাজ ফেলে আদালতে আসতে হয়। তার অভিযোগ, এতে আইনজীবী, মুহুরি ও আদালতের পেশকারের আয় হলেও তিনি বিচার পাচ্ছেন না।

বিচারপ্রার্থীদের অভিযোগ, তাদের মতো আরও অনেক নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হলেও দীর্ঘসূত্রতার কারণে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

দ্রুত বিচার নিশ্চিতের দাবি

মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, রংপুরে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা আগের তুলনায় বেড়েছে। এখন শিশুরাও নিরাপদ নয়। আইন যথাযথভাবে কার্যকর না হলে এবং ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার না পেলে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে।

রংপুর জেলা মহিলা পরিষদের সভাপতি রুমানা জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা নিষ্পত্তির নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকলেও বিচারপ্রার্থীদের মাসের পর মাস, বছরের পর বছর আদালতের বারান্দায় ঘুরতে হচ্ছে। মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আরও বিচারক নিয়োগ করা প্রয়োজন।’

নারীনেত্রী মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘রংপুরে নারী নির্যাতনের মামলাগুলোর বিচার না হওয়া এবং অপরাধীরা শাস্তির আওতায় না আসায় নারী নির্যাতন, ধর্ষণ ও যৌতুকের কারণে নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বিচারকের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে।’

সাক্ষী ও বাদীর অনুপস্থিতিতে বাড়ছে জট

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা দীর্ঘদিন ধরে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তাদের ভাষ্যমতে, মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বাদীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে। তারাও চেষ্টা করছেন, তবে বিচারপ্রার্থীরা কাঙ্ক্ষিত সুফল পাচ্ছেন না।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এর সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) শফি কামাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই আদালতে প্রায় দুই হাজার মামলা বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে। মামলার ধার্য তারিখে সাক্ষীরা আদালতে আসেন না। অনেক সময় বাদীও নিয়মিত হাজির হন না। এসব কারণে মামলার জট বাড়ছে। তবে বিচারক ও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা বিচারপ্রার্থীদের ন্যায়বিচার দিতে চেষ্টা করছি আমরা।’

একই কথা বলেছেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২-এর পিপি মোকসেদুল হক। তিনি বলেন, ‘বিচারপ্রার্থীদের দ্রুত সেবা দিতে আমরা চেষ্টা করছি। নানা কারণে বিচারকাজ শেষ হতে সময় লাগছে।’

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রংপুরে নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য পৃথক সেল গঠন করা প্রয়োজন। পাশাপাশি মামলার অগ্রগতি নিশ্চিত করতে উচ্চ আদালতের কঠোর তদারকিও জরুরি।

/এএম/ 
সম্পর্কিত
মাকসুদ কামাল-জাফর ইকবালসহ ৫ জনকে আত্মসমর্পণে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ
পিতাকে হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পুত্র হাইকোর্টে খালাস
রুমি দেশেই আছেন, হাইকোর্টে আগাম জামিনের আবেদন
সর্বশেষ খবর
নেশার কারণে গান ছাড়িনি: আনুশেহ আনাদিল
নেশার কারণে গান ছাড়িনি: আনুশেহ আনাদিল
সরকারের ‘সমালোচনা’ করলেই গ্রেফতার: প্রশ্নের মুখে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা
সরকারের ‘সমালোচনা’ করলেই গ্রেফতার: প্রশ্নের মুখে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা
কক্সবাজারে ১৪ ঘণ্টা ধরে জ্বলছে গ্যাসের আগুন, ১৫ কিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ বন্ধ
কক্সবাজারে ১৪ ঘণ্টা ধরে জ্বলছে গ্যাসের আগুন, ১৫ কিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ বন্ধ
প্রধানমন্ত্রী বললেন, ‘তুমি আবার যাবা আমার সঙ্গে’: আমজনতার তারেক
প্রধানমন্ত্রী বললেন, ‘তুমি আবার যাবা আমার সঙ্গে’: আমজনতার তারেক
সর্বাধিক পঠিত
এ বছর শীতের তীব্রতা কেমন হবে
এ বছর শীতের তীব্রতা কেমন হবে
২১ লাখ ফলোয়ার, ভোট পেলেন মাত্র ৩৩টি
২১ লাখ ফলোয়ার, ভোট পেলেন মাত্র ৩৩টি
প্রথম স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে শ্যালিকাকে বিয়ে, এরপর যা ঘটলো মাসুদের সঙ্গে
প্রথম স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে শ্যালিকাকে বিয়ে, এরপর যা ঘটলো মাসুদের সঙ্গে
জেলেদের কাছ থেকে উদ্ধার ৯০ কেজি ইলিশ এতিমখানায় বিতরণ
জেলেদের কাছ থেকে উদ্ধার ৯০ কেজি ইলিশ এতিমখানায় বিতরণ
‘আপনাদের সম্মানি দিচ্ছি, ভিডিওগুলো ডিলিট করে দেন’
‘আপনাদের সম্মানি দিচ্ছি, ভিডিওগুলো ডিলিট করে দেন’