দুঃখ-কষ্টের দিন শেষ নাসিমার

হিমাদ্রি শেখর ভদ্র, সুনামগঞ্জ
২০ মার্চ ২০২৩, ১৯:৩৯ আপডেট : ২০ মার্চ ২০২৩, ১৯:৩৯

সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় মুজিব পল্লীতে মাথা গোঁজার ঠাঁই পেয়েছেন জীবন সংগ্রামী নাসিমা খাতুন। বছরের পর বছর দুঃখে-কষ্টে বসবাসের পর অবশেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া একখণ্ড জমি ও ঘর পেয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে কষ্টের দিন শেষ হলো তার।

আশির দশকের কথা। চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার পদ্মা তীরের বিষকাঠালী গ্রামের হাবিবুর রহমান ও পিয়ারা খাতুনের তিন সন্তানের মধ্যে নাসিমা খাতুন বড়। বাবা ছিলেন দিনমজুর আর মা গৃহিণী। হাইমচর থানার গন্ডামারা উচ্চবিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় ১৯৯৭ সালে সন্তোষপুর গ্রামের আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে তার বিয়ে হয়।

বিয়ের পর অষ্টম শ্রেণি পাস করেন। পরে আনোয়ার সৌদি আরব যাওয়ার কথা বলে নাসিমার মায়ের কাছ থেকে দুই লাখ টাকা নেন। সৌদি যাওয়ার পরে নাসিমার সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দেন আনোয়ার। ইতোমধ্যে পদ্মার ভাঙনে নাসিমাদের ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। 

২০০০ সালে নাসিমার পরিবার চলে আসে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার বাদাঘাট ইউনিয়নের জগন্নাথপুর গ্রামে। সেখানে থিতু হয়। ২০০৫ সালে পোশাক কারখানায় কাজের জন্য নাসিমাকে ঢাকায় নিয়ে যান তার বাবা। মগবাজারে একটি পোশাক কারখানায় কাজ শুরু করেন নাসিমা। শুরু হয় জীবন সংগ্রাম।

পোশাক কারখানায় চাকরির সময় ২০০৫ সালে ফরিদপুরের ইয়াদ আলীকে বিয়ে করেন। বিয়ের আগে নাসিমা জানতেন না ইয়াদ মাদকাসক্ত। তার বেতন মদ ও জুয়া খেলে শেষ করতেন ইয়াদ। প্রতিবাদ করলে নির্যাতন করতেন। তবু সব সহ্য করেছেন। এরই মধ্যে দুই সন্তানের মা হন। শুরু হয় সংসারে টানাপোড়েন। মাদকাসক্ত স্বামী ও দুই সন্তানকে নিয়ে সংসার চালাতে গিয়ে বিপাকে পড়েন নাসিমা। একপর্যায়ে স্বামীকে টাকা দেওয়া বন্ধ করে দেন। তখন আবারও শুরু হয় স্বামীর নির্যাতন। এ অবস্থায় নারায়ণগঞ্জে গিয়ে একটি পোশাক কারখানায় কাজ শুরু করেন। পরে জানতে পারেন ইয়াদ আবারও বিয়ে করেছেন। সেইসঙ্গে নাসিমার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন।

নাসিমা খাতুন জানিয়েছেন, বিয়ের পর নাসিমা ও তার ছেলেমেয়ের খোঁজ নেননি ইয়াদ। ছেলেমেয়েকে মানুষ করার জন্য নিজেই চেষ্টা চালিয়ে যান। নারায়ণগঞ্জের তারাব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণিতে মেয়ে সুরমা আক্তার মুন্নিকে ভর্তি করে দেন। মেধাবী হওয়ায় কষ্ট করে মেয়ের লেখাপড়ার খরচ চালিয়ে যান। এমনও দিন গেছে, সকাল ৮টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত কারখানায় কাজ করে বাসায় এসে দেখেছেন ছেলেমেয়ে রান্নাঘরের চুলার পাশে ঘুমিয়ে আছে। শেষমেশ নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে ছয় বছরের মুন্নি ও আড়াই বছরের ছেলে মিঠুকে নানার বাড়ি জগন্নাথপুরে পাঠিয়ে দেন। নানার বাড়িতেও দুই সন্তান নির্যাতন এবং অবহেলার শিকার হন।

তিনি আরও জানিয়েছেন, সন্তানদের কথা ভেবে চলে আসেন বিশ্বম্ভরপুরে। সেখানে একটি ঘর ভাড়া নিয়ে দর্জির কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। পাশাপাশি মেয়ে মুন্নিকে বিশ্বম্ভরপুরের দুর্গাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দেন। পরে সবুজ কুড়ি বিদ্যালয়ে ভর্তি করেন। ওই বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে বৃত্তি পায় মুন্নি। এরপর কাটাখালী উচ্চ বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি করেন। ২০২৩ সালে এই বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেবে মুন্নি।

সুরমা আক্তার মুন্নি জানায়, প্রতিদিন ভোর ৫টায় ঘুম থেকে উঠে সকাল ৭টা পর্যন্ত লেখাপড়া করে স্কুলে যাই। বাড়ি ফিরে বিকালে তিন ঘণ্টা সেলাইয়ের কাজ করে আবার পড়তে বসি। সেলাইয়ের সব কাজ জানি। সেলাইয়ের কাজ করে যা আয় তা দিয়ে কোনোমতে সংসার চালান মা। তবে ঘর ভাড়া নিয়ে সবসময় আমাদের ঝামেলায় পড়তে হতো। ঘর ভাড়া দিলে আর সংসার চালানোর খরচ থাকতো না মায়ের কাছে। বছরের পর বছর এভাবে কেটেছে আমাদের। অবশেষে সরকারি ঘর পাওয়ায় সেই কষ্ট দূর হয়েছে। 

মুন্নি আরও জানায়, ছোট ভাই সোহরাব হোসেন মিঠু কাটাখালী উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। তার ও আমার স্কুলের শিক্ষকরা সবসময় বইখাতা ও কলম দিয়ে আমাদের সহযোগিতা করেন। কেউ কেউ অর্থ-সহায়তাও দিয়েছেন। এজন্য এতদূর আসতে পেরেছি আমরা।

কাটাখালী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বেনজির আহমদ মানিক বলেন, ‘মুন্নিকে আমরা বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করি। ভবিষ্যতেও সহায়তা করবো। স্কুলে আসা-যাওয়ার জন্য তাকে বাইসাইকেল কিনে দেওয়া হয়েছে।’

চার বছর ধরে মুন্নিকে বিনা খরচে প্রাইভেট পড়াচ্ছেন বলে জানালেন একই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হাসনাত কবীর স্বপন। তিনি বলেন, ‘বিদ্যালয় থেকে মুন্নির বেতন মওকুফ করা হয়েছে। আমার বিশ্বাস, মুন্নি আরও অনেক দূর এগিয়ে যাবে।’  

/এসএন/এএম/
সম্পর্কিত
ফেনীতে নিহত যুবদল নেতার পরিবারকে নতুন বাড়ি উপহার দেবেন প্রধানমন্ত্রী
বিক্রি হচ্ছে উপহারের ঘর
আশ্রয়ণের ঘর জীবন বদলে দিয়েছে: প্রধানমন্ত্রী
সর্বশেষ খবর
আশুলিয়ায় কারখানায় নারী শ্রমিকের মৃত্যু, হাসপাতালে লাশ নিয়ে মারামারি
আশুলিয়ায় কারখানায় নারী শ্রমিকের মৃত্যু, হাসপাতালে লাশ নিয়ে মারামারি
উত্তরায় মিনিসোর ফ্ল্যাগশিপ স্টোরের যাত্রা শুরু
উত্তরায় মিনিসোর ফ্ল্যাগশিপ স্টোরের যাত্রা শুরু
শনিবার জবিতে আবারও গরুভোজের আয়োজন, থাকছে কাওয়ালি সন্ধ্যা
শনিবার জবিতে আবারও গরুভোজের আয়োজন, থাকছে কাওয়ালি সন্ধ্যা
পূজামণ্ডপে কিশোর গ্যাংয়ের সংঘর্ষ রোধ, আনসার সদস্যদের হাতে আটক ৭
পূজামণ্ডপে কিশোর গ্যাংয়ের সংঘর্ষ রোধ, আনসার সদস্যদের হাতে আটক ৭
সর্বাধিক পঠিত
মৃত্যুর ৪ দিন পর দাফন, নাসিমা খানের জানাজায় ছিলেন না বড় কোনও তারকা
মৃত্যুর ৪ দিন পর দাফন, নাসিমা খানের জানাজায় ছিলেন না বড় কোনও তারকা
ডিসির নির্দেশে রাতারাতি বদলে গেলো দেশলাই কাঠির প্রতিমা
ডিসির নির্দেশে রাতারাতি বদলে গেলো দেশলাই কাঠির প্রতিমা
সরকারি মাঠ দখলের অভিযোগ জামায়াত নেতার বিরুদ্ধে, বললেন ‘এখন আমাদের সময়’
সরকারি মাঠ দখলের অভিযোগ জামায়াত নেতার বিরুদ্ধে, বললেন ‘এখন আমাদের সময়’
বিএসএফের ধরে নিয়ে যাওয়া ২ পুলিশ সদস্য কেমন আছেন, জানালেন বিজিবি পরিচালক 
বিএসএফের ধরে নিয়ে যাওয়া ২ পুলিশ সদস্য কেমন আছেন, জানালেন বিজিবি পরিচালক 
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রথম দিনেই সাজেক ভ্রমণে ৫ শতাধিক পর্যটক
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রথম দিনেই সাজেক ভ্রমণে ৫ শতাধিক পর্যটক