শিক্ষকেরা মানুষ গড়ার কারিগর। কথাটা আমরা ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বুঝেছি, এটি শুধু একটি কথা নয়। একজন শিক্ষক আমাদের জীবনে কতটা গভীরভাবে থেকে যান, তা অনেক সময় বুঝতে পারি অনেক পরে।
বাবা-মায়ের পর ছোটবেলায় যাদের কাছে আমরা যাই, তারা শিক্ষক। তারা শুধু বই পড়ান না, আমাদের শেখান কীভাবে মানুষ হতে হয়। তারা স্নেহ করেন, ভালোবাসেন, অনুপ্রেরণা দেন। জীবন কীভাবে চলবে, কেমন মানুষ হওয়া দরকার, কাজকর্মে কীভাবে সবার প্রশংসা পাওয়া যায়; এসবও আমরা তাদের কাছ থেকেই শিখি। জীবনের অনেক দীক্ষা বইয়ের পাতায় লেখা থাকে না। সেসব আমরা পাই শিক্ষকদের কাছ থেকে।
আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবসে সেই শিক্ষকদেরই শ্রদ্ধাবনত চিত্তে স্মরণ করছি। ইউনেস্কো ঘোষিত এই দিনটি আমার কাছে, আমাদের সবার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যারা শিক্ষা লাভ করেছি, যারা এখনো শিক্ষা লাভ করছি এবং যারা শিক্ষকতা করছেন, তাদের প্রতি এই দিনে আমাদের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সুযোগ তৈরি হয়।
আমি বিশ্বাস করি, আজ এবং আগামীর নাগরিক গড়ে তোলার পেছনে শিক্ষকদের ভূমিকা অগ্রণী। তাদের হাত ধরেই আমরা ভালো মানুষ, ভালো নাগরিক হওয়ার শিক্ষা পাই। আর সেই ভালো মানুষ ও ভালো নাগরিকরাই দেশ ও জাতির অগ্রগতির পথ তৈরি করবে।
আজ আমরা কিশোর গ্যাংয়ের কথা বলি। নানা ধরনের সামাজিক সমস্যার কথা বলি। এসব সমস্যার দিকে তাকালে আমার মনে হয়, শিক্ষকদের প্রতি আমাদের আস্থা ফিরিয়ে আনা দরকার। একই সঙ্গে শিক্ষকদেরও নিজেদের দায়িত্বের জায়গাটি নতুন করে ভাবতে হবে। তাদেরও ভালো শিক্ষক হিসেবে গড়ে উঠতে হবে।
বাস্তবতার নিরিখে শিক্ষক ও ছাত্র; দুই পক্ষকেই এমন একটি জায়গায় দাঁড়াতে হবে, যেখানে প্রত্যেকে অন্যের কাছ থেকে তার প্রাপ্যটি পায়। শিক্ষা প্রদান যেমন গুরুত্বপূর্ণ, শিক্ষা গ্রহণও তেমনই গুরুত্বপূর্ণ। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে শিক্ষা তার কাঙ্ক্ষিত জায়গায় পৌঁছাবে না। আমার বিশ্বাস, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর এই সম্পর্কটি যত ভালো হবে, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তত ভালো দিকনির্দেশনা পাবে। সেই দিকনির্দেশনার আলোকে আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ বাংলাদেশকে সুন্দর ও সুচারুভাবে গড়ে তুলতে পারব।
আমার নিজের স্কুলজীবনের দিকে ফিরে তাকালে কিছু মুখ খুব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কিছু নামও মনে পড়ে যায়। আমি বিশ্বাস করি, সেই শিক্ষকরা শুধু আমাদের পড়াননি, আমাদের জীবনবোধ তৈরি করেছেন। তাদের অবদান ও গুরুত্ব আমাদের জীবনে অনেক গভীর। নরসিংদীর সাটিরপাড়া কালিকুমার ইনস্টিটিউটের হেডমাস্টার ছিলেন খন্দকার আব্দুর রহিম। তিনি একজন বিশিষ্ট শিক্ষক ছিলেন, বিশিষ্ট বোদ্ধা ছিলেন। কিন্তু আমার কাছে তার সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল; তিনি ছাত্রদের ভালোবাসতেন। ছাত্রদের প্রতি তার স্নেহ-মমতা এবং তাদের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার যে চেষ্টা, তা আমি কখনো ভুলতে পারব না।
সঞ্জিত পাল নামে আমাদের একজন শিক্ষক ছিলেন। তিনি আমাদের সাইন্স পড়াতেন। হীরালাল দাস নামে আরেকজন শিক্ষক ছিলেন, যিনি আমাদের সাইন্স ও অংক পড়াতেন। ইউনুস সাহেব, আমাদের ইউনুস স্যার, ইংরেজি পড়াতেন। আজ এত বছর পরও তাদের নামগুলো মনে আছে। কারণ তারা শুধু আমাদের ক্লাস নেননি। তারা আমাদের জীবনের একটি সময়কে গড়ে দিয়েছেন। আমাদের সময়কালে যারা ওই স্কুলের ছাত্র ছিল, তাদের অনেকের জীবনেই তাদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কখনো কখনো মানুষের চলে যাওয়ার পর তার রেখে যাওয়া প্রভাবটিই সবচেয়ে বেশি অনুভব করা যায়। আমার প্রিয় সেই শিক্ষকদের কথা মনে পড়লে আজ সেই অনুভূতিই হয়।
উনারা কেউ এখন পৃথিবীতে নেই। এই কথাটি বলতে গিয়ে মনটা ভার হয়ে আসে। যাদের কাছ থেকে জীবনের এত কিছু শিখেছি, আজ তাদের কাউকেই সামনে গিয়ে সালাম করতে পারি না। তাদের কণ্ঠ শুনতে পারি না, তাদের স্নেহ পাওয়ার সুযোগ নেই। আছে শুধু স্মৃতি, কিছু নাম আর তাদের কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষা।
বিশ্ব শিক্ষক দিবসে তাই আমার প্রিয় সেই শিক্ষকদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। তাদের জন্য দোয়া করি; তারা যেন ওপারে ভালো থাকেন।
—উপাচার্য, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ